ব্যাংক ও বাণিজ্য খাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি
jugantor
ব্যাংক ও বাণিজ্য খাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি

  ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী  

০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৮ নভেম্বরের গণমাধ্যম সূত্রমতে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক পরিদর্শনে ইসলামি ধারায় পরিচালিত একটি বেসরকারি ব্যাংকের নন ফান্ডেড বিনিয়োগে (ঋণ প্রদানে) ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে, যা পূর্বের আলোচিত কেলেঙ্কারিকেও হার মানিয়েছে।

ব্যাংকটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজের লাইসেন্সবিহীন দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫৯ কোটি ১৩ লাখ ৭৪ হাজার ৩৯২ ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৬ হাজার ৬৩০ কোটি টাকার ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধা দিয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিধিমোতাবেক একক গ্রাহকের সীমা লঙ্ঘনেরও অভিযোগ রয়েছে। শুল্ক সুবিধাভুক্ত ব্যাক টু ব্যাক এলসির ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানির বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি। এমনকি কারখানায় পাওয়া যায়নি আমদানিকৃত কাঁচামাল কিংবা কাঁচামাল থেকে প্রস্তুত কোনো পণ্যের মজুত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ না থাকলে এত বড় অনিয়ম সম্ভব নয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান দুটি বন্ধ থাকায় এ অর্থ আদায়ে মারাত্মক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রতিষ্ঠান দুটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি সরকারি সুবিধায় শুল্কছাড়ের অপব্যবহার করেও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বড় অঙ্কের এ টাকার একটা অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন সাবেক চেয়ারম্যান গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘ব্যাংক এলসির মাধ্যমে আমদানির দায়িত্ব নিয়ে থাকে। তবে এজন্য আইন ও শর্ত মানতে হয়। ব্যাংকের প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব হলো কোনো প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলার আগে তার লাইসেন্স, লাইসেন্স নবায়ন ও মেয়াদ হালনাগাদ আছে কি না, তা যাচাই করা। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর-ভ্যাট ও ব্যবসা সনদ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জেনে নেওয়া। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ হলে সে সংক্রান্ত সনদ ও মেয়াদ, কারখানার অবস্থানের খোঁজ নেওয়া এবং উৎপাদিত পণ্য নিয়মিত তদারকি করা। পেমেন্ট করার আগে ব্যাংককে অবশ্যই দেখতে হবে এলসির পণ্য দেশে আসছে কি না, নাকি শুধু শুধু টাকা বিদেশে যাচ্ছে। আর ব্যাংক টাকা দেয় বলে সেটা দেখার দায়িত্ব ব্যাংকেরই। এলসিতে অনিয়ম হলে বা পাচারের মাধ্যমে টাকা বিদেশে গেলে সে দায় ব্যাংক এড়াতে পারে না। পরের দায়িত্ব হলো, লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠান এনবিআরের। তাদের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়ে কী করছে, তা তদারকি করা।’ বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) অডিট রিপোর্টের তথ্যমতে, সরকারি অর্থের অনিয়মের অর্ধেকই হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৩১ হাজার কোটি টাকাই রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের। অর্থাৎ আর্থিক অনিয়মের ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশ হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে। বিগত ৯ বছরে ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের পরিমাণ বেড়েছে ১৬ গুণ।

এছাড়া ইসলামি ধারার তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোপাটের সংবাদ প্রকাশে ব্যাংকের গ্রাহকসহ দেশের আপামর জনগণ যারপরনাই উদ্বিগ্ন। শুধু একটি ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ যাচাই-বাছাই না করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহীভিত্তিক একটি গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে অন্য কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এ ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দ্রুত সময়ে এসব অর্থায়নের মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। বিপুল অঙ্কের ঋণ প্রদানে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ায় ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, পরিচালনা পর্ষদ বা মালিকানার সঙ্গে যুক্ত কারও সম্পৃক্ততা ছাড়া বিপুল অর্থের এ ঋণ সৃষ্টি সম্ভব নয়। ২৪ নভেম্বর ২০২২ গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গত এক দশকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া করা হয়েছে বিভিন্ন স্বল্প পরিচিত ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে, যা ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা যোগসাজশ করে নিজেরা অথবা এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। এমনকি বেনামি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যাংকের মালিকদের সংশ্লিষ্টতাও থাকতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক গভর্নর গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘যদি ঋণের প্রস্তাব আসে ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট সেটা যাচাই-বাছাই করে দেখে। এ সময় তাদের ব্যবসায়িক ইতিহাস, ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা, অতীত ঋণের ইতিহাস, খেলাপি বা বকেয়া ঋণ আছে কি না, প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ঋণটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তার প্রমাণ প্রভৃতি পরীক্ষা করে দেখা হয়। এরপর সবকিছু ঠিক থাকলে সেটি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা পরিচালনা পর্ষদে তোলা হয়। সেখানে অনুমোদন পাওয়া গেলে ঋণছাড় করা হয়। ঋণের আকার বড় হলে অনেক সময় একাধিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ঋণ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি ব্যাংক প্রধান ভূমিকা পালন করে। তবে এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রেও সব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বোর্ডের অনুমোদন থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সম্প্রতি আলোচিত একাধিক ঋণের ক্ষেত্রে এসব নিয়মনীতি অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে। যখন কোনো ঋণ নির্দেশে-সুপারিশে বা কোনো কারণে হয়, তখন এ নিয়মগুলো অনেক সময় ঠিকমতো পালন করা হয় না। হয়তো আগে ঋণ বিতরণ করে দেওয়া হয়, পরে প্রসেস করে বোর্ডে পাশ করানো হয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯২ কোটি টাকার ঋণস্থিতির বিপরীতে খেলাপি ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের স্থিতি ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা বিবেচনায় চলতি বছরে ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ১২২ কোটি টাকা। এছাড়া সেপ্টেম্বর ২০২২ পর্যন্ত নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, প্রকৃত খেলাপি ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খেলাপি ঋণ কমাতে ঢালাও সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনার কারণে গত বছরও ঋণ পরিশোধে ঋণ পুনঃতফশিল, পুনর্গঠনসহ নানা ছাড়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার উচ্চ আদালতে অনেক ঋণ রিট করে নিয়মিত রাখা হয়েছে। এর বাইরে অবলোপন করা খেলাপি ঋণ রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

গণমাধ্যম মারফত আরও জানা যায়, কোনো ধরনের ঋণপত্র (এলসি) খোলা ছাড়াই ব্যবসায়ীরা জাপান থেকে বিপুলসংখ্যক গাড়ি বাংলাদেশে এনেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শিপিং এজেন্ট এনসিয়েন্ট স্টিমশিপ ‘মালয়েশিয়া স্টার’ নামক জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩২১টি এবং মোংলা বন্দরে ৫৫১টি গাড়ি এনেছে। ঋণপত্র ছাড়া গাড়ি আনার বিষয়ে জানতে চাইলে শিপিং এজেন্টের পরিচালক বলেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে টাকাটা পেমেন্ট হয়েছে। তবে ঋণপত্র ছিল কি না, তা যাচাইয়ের দায়িত্ব শিপিং এজেন্টের নয়। এটি কাস্টমস, ব্যাংকের মতো রেগুলেটরি বডি নিশ্চিত করবে। আর আমি অনুমতি পেয়েছি বলেই জাপান থেকে গাড়ি বোঝাই করেছি আর চট্টগ্রাম ও মোংলায় নামিয়েছি।’ উল্লেখ্য, আমদানিনীতি আদেশ অনুযায়ী, ঋণপত্র ছাড়া একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুমোদিত পণ্য দেশে আনতে পারবে। কিন্তু বড় আকারের আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র ছাড়া পণ্য আমদানি সম্ভব নয়। তাই অনেক গাড়ি আমদানি হলে কোনোভাবেই ঋণপত্র না খুলে জাহাজীকরণের সুযোগ নেই।

গত ২৭ নভেম্বর ঋণ জালিয়াতির মামলায় এক ব্যাংক কর্মকর্তার জামিন বাতিল আবেদনের শুনানিকালে সম্মানিত বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের মহামান্য হাইকোর্ট বেঞ্চ দুদকের উদ্দেশে বলেন, ‘ঋণখেলাপিরা আইনের চেয়ে শক্তিশালী নয়। তাহলে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? হাজার হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে খেলাপি হচ্ছে। আপনারা ধরছেন না কেন? যারা বড় বড় ঋণখেলাপি, তারা কি বিচারের ঊর্ধ্বে থাকবে? যারা অর্থশালী, তারা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে?’ ২৯ নভেম্বর বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে করা পৃথক তিন মামলায় আসামির জামিন প্রশ্নে রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালত বলেন, ‘আইনানুযায়ী ১২০ দিনের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দুদক এ সময়ের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সময়মতো তদন্ত শেষ না হলে মামলার অনেক আলামত নষ্ট হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত সংস্থা তদন্ত শেষ করতে না পারলে তাদের পদত্যাগের নজির অনেক দেশে আছে। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগের নজির নেই। বরং যেসব কর্মকর্তা সফলভাবে তদন্ত করবে, তাদের হয়রানি-চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে।’

আদালত আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা থেকে দুর্নীতি নির্মূল করাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের লড়াইটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে। যত প্রভাবশালী এবং যত বড় দুর্নীতিবাজ হোক না কেন, আমরা দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলে যাব। ব্যক্তিগতভাবে আমরা কারও বিরুদ্ধে কথা বলি না। কেউ আমাদের শত্রু নয়। দেশ ও জনগণের স্বার্থে কথা বলি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলাই আমাদের উদ্দেশ্য।’ বেসিক ব্যাংকে লুটপাট ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলার শুনানিতে গত ৯ নভেম্বর উচ্চ আদালতে যারা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে তাদের ‘শুটডাউন’ করা উচিত বলেও মন্তব্য করা হয়েছিল। অতিসম্প্রতি ধারাবাহিকতায় তিনটি বেসরকারি ব্যাংকের একই ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন উল্লিখিত সম্মানিত বিচারপতিদের নজরে এলে ৪ ডিসেম্বর স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ ওই ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন। চার মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে এবং অনুসন্ধানে কিছু পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা-ও জানাতে বলা হয়েছে। দেশবাসীর জন্য সৌভাগ্যের বার্তা হচ্ছে, ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সচিব সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়গুলো আমলে নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার আলোচনার প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানোর জন্য ব্যাংকিং বিভাগকে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের নির্দেশনা লক্ষ-কোটি সাধারণ আমানতকারীর হৃদয়ে আশার সঞ্চার করেছে।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

ব্যাংক ও বাণিজ্য খাতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা জরুরি

 ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী 
০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গত ২৮ নভেম্বরের গণমাধ্যম সূত্রমতে, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের পৃথক পরিদর্শনে ইসলামি ধারায় পরিচালিত একটি বেসরকারি ব্যাংকের নন ফান্ডেড বিনিয়োগে (ঋণ প্রদানে) ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে, যা পূর্বের আলোচিত কেলেঙ্কারিকেও হার মানিয়েছে।

ব্যাংকটি বন্ডেড ওয়্যারহাউজের লাইসেন্সবিহীন দুটি প্রতিষ্ঠানকে ১৫৯ কোটি ১৩ লাখ ৭৪ হাজার ৩৯২ ডলার বা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৬ হাজার ৬৩০ কোটি টাকার ব্যাক টু ব্যাক এলসি সুবিধা দিয়েছে। এর মধ্যে একটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিধিমোতাবেক একক গ্রাহকের সীমা লঙ্ঘনেরও অভিযোগ রয়েছে। শুল্ক সুবিধাভুক্ত ব্যাক টু ব্যাক এলসির ক্ষেত্রে পণ্য রপ্তানির বাধ্যবাধকতা থাকলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কোনো পণ্য রপ্তানি হয়নি। এমনকি কারখানায় পাওয়া যায়নি আমদানিকৃত কাঁচামাল কিংবা কাঁচামাল থেকে প্রস্তুত কোনো পণ্যের মজুত। কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের কর্মকর্তাদের যোগসাজশ না থাকলে এত বড় অনিয়ম সম্ভব নয়। বর্তমানে প্রতিষ্ঠান দুটি বন্ধ থাকায় এ অর্থ আদায়ে মারাত্মক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিদর্শন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, প্রতিষ্ঠান দুটি শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি করে খোলাবাজারে বিক্রির মাধ্যমে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাতের পাশাপাশি সরকারি সুবিধায় শুল্কছাড়ের অপব্যবহার করেও বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বড় অঙ্কের এ টাকার একটা অংশ বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।

প্রসঙ্গত, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন সাবেক চেয়ারম্যান গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘ব্যাংক এলসির মাধ্যমে আমদানির দায়িত্ব নিয়ে থাকে। তবে এজন্য আইন ও শর্ত মানতে হয়। ব্যাংকের প্রথম ও মৌলিক দায়িত্ব হলো কোনো প্রতিষ্ঠানের এলসি খোলার আগে তার লাইসেন্স, লাইসেন্স নবায়ন ও মেয়াদ হালনাগাদ আছে কি না, তা যাচাই করা। সেই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের কর-ভ্যাট ও ব্যবসা সনদ সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য জেনে নেওয়া। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ হলে সে সংক্রান্ত সনদ ও মেয়াদ, কারখানার অবস্থানের খোঁজ নেওয়া এবং উৎপাদিত পণ্য নিয়মিত তদারকি করা। পেমেন্ট করার আগে ব্যাংককে অবশ্যই দেখতে হবে এলসির পণ্য দেশে আসছে কি না, নাকি শুধু শুধু টাকা বিদেশে যাচ্ছে। আর ব্যাংক টাকা দেয় বলে সেটা দেখার দায়িত্ব ব্যাংকেরই। এলসিতে অনিয়ম হলে বা পাচারের মাধ্যমে টাকা বিদেশে গেলে সে দায় ব্যাংক এড়াতে পারে না। পরের দায়িত্ব হলো, লাইসেন্সদাতা প্রতিষ্ঠান এনবিআরের। তাদের দায়িত্ব কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স নিয়ে কী করছে, তা তদারকি করা।’ বাংলাদেশ কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) অডিট রিপোর্টের তথ্যমতে, সরকারি অর্থের অনিয়মের অর্ধেকই হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে। ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ৫৯ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকার অনিয়ম চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে ৩১ হাজার কোটি টাকাই রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকের। অর্থাৎ আর্থিক অনিয়মের ৫২ দশমিক ১৮ শতাংশ হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে। বিগত ৯ বছরে ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের পরিমাণ বেড়েছে ১৬ গুণ।

এছাড়া ইসলামি ধারার তিনটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা লোপাটের সংবাদ প্রকাশে ব্যাংকের গ্রাহকসহ দেশের আপামর জনগণ যারপরনাই উদ্বিগ্ন। শুধু একটি ব্যাংক থেকে নেওয়া হয়েছে ৭ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো কর্তৃক প্রদত্ত ঋণ যাচাই-বাছাই না করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহীভিত্তিক একটি গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে অন্য কোনো পক্ষকে সুবিধা দেওয়ার জন্য এ ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দ্রুত সময়ে এসব অর্থায়নের মাধ্যমে বড় অঙ্কের টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। বিপুল অঙ্কের ঋণ প্রদানে অস্বাভাবিকতা ধরা পড়ায় ব্যাংকগুলোয় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন চলছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, পরিচালনা পর্ষদ বা মালিকানার সঙ্গে যুক্ত কারও সম্পৃক্ততা ছাড়া বিপুল অর্থের এ ঋণ সৃষ্টি সম্ভব নয়। ২৪ নভেম্বর ২০২২ গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, বিভিন্ন ব্যাংক থেকে গত এক দশকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার ঋণ দেওয়া করা হয়েছে বিভিন্ন স্বল্প পরিচিত ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে, যা ফেরত আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা যোগসাজশ করে নিজেরা অথবা এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। এমনকি বেনামি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ব্যাংকের মালিকদের সংশ্লিষ্টতাও থাকতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক গভর্নর গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘যদি ঋণের প্রস্তাব আসে ব্যাংকের ম্যানেজমেন্ট সেটা যাচাই-বাছাই করে দেখে। এ সময় তাদের ব্যবসায়িক ইতিহাস, ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা, অতীত ঋণের ইতিহাস, খেলাপি বা বকেয়া ঋণ আছে কি না, প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, ঋণটি কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তার প্রমাণ প্রভৃতি পরীক্ষা করে দেখা হয়। এরপর সবকিছু ঠিক থাকলে সেটি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বা পরিচালনা পর্ষদে তোলা হয়। সেখানে অনুমোদন পাওয়া গেলে ঋণছাড় করা হয়। ঋণের আকার বড় হলে অনেক সময় একাধিক ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ঋণ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে একটি ব্যাংক প্রধান ভূমিকা পালন করে। তবে এ ধরনের ঋণের ক্ষেত্রেও সব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বোর্ডের অনুমোদন থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সম্প্রতি আলোচিত একাধিক ঋণের ক্ষেত্রে এসব নিয়মনীতি অনুসরণ না করার অভিযোগ উঠেছে। যখন কোনো ঋণ নির্দেশে-সুপারিশে বা কোনো কারণে হয়, তখন এ নিয়মগুলো অনেক সময় ঠিকমতো পালন করা হয় না। হয়তো আগে ঋণ বিতরণ করে দেওয়া হয়, পরে প্রসেস করে বোর্ডে পাশ করানো হয়।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ব্যাংক খাতে ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা। এর মধ্যে খেলাপি হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ। পক্ষান্তরে চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক খাতে ১৩ লাখ ৯৮ হাজার ৫৯২ কোটি টাকার ঋণস্থিতির বিপরীতে খেলাপি ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৯ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। ২০২১ সালে ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের স্থিতি ১ লাখ ৩ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা বিবেচনায় চলতি বছরে ৯ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩১ হাজার ১২২ কোটি টাকা। এছাড়া সেপ্টেম্বর ২০২২ পর্যন্ত নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণ ১৭ হাজার কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্যমতে, প্রকৃত খেলাপি ৪ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। খেলাপি ঋণ কমাতে ঢালাও সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনার কারণে গত বছরও ঋণ পরিশোধে ঋণ পুনঃতফশিল, পুনর্গঠনসহ নানা ছাড়ে খেলাপি ঋণ কম দেখানোর সুযোগ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আবার উচ্চ আদালতে অনেক ঋণ রিট করে নিয়মিত রাখা হয়েছে। এর বাইরে অবলোপন করা খেলাপি ঋণ রয়েছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।

গণমাধ্যম মারফত আরও জানা যায়, কোনো ধরনের ঋণপত্র (এলসি) খোলা ছাড়াই ব্যবসায়ীরা জাপান থেকে বিপুলসংখ্যক গাড়ি বাংলাদেশে এনেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, শিপিং এজেন্ট এনসিয়েন্ট স্টিমশিপ ‘মালয়েশিয়া স্টার’ নামক জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরে ৩২১টি এবং মোংলা বন্দরে ৫৫১টি গাড়ি এনেছে। ঋণপত্র ছাড়া গাড়ি আনার বিষয়ে জানতে চাইলে শিপিং এজেন্টের পরিচালক বলেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো না কোনোভাবে টাকাটা পেমেন্ট হয়েছে। তবে ঋণপত্র ছিল কি না, তা যাচাইয়ের দায়িত্ব শিপিং এজেন্টের নয়। এটি কাস্টমস, ব্যাংকের মতো রেগুলেটরি বডি নিশ্চিত করবে। আর আমি অনুমতি পেয়েছি বলেই জাপান থেকে গাড়ি বোঝাই করেছি আর চট্টগ্রাম ও মোংলায় নামিয়েছি।’ উল্লেখ্য, আমদানিনীতি আদেশ অনুযায়ী, ঋণপত্র ছাড়া একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুমোদিত পণ্য দেশে আনতে পারবে। কিন্তু বড় আকারের আমদানির ক্ষেত্রে ঋণপত্র ছাড়া পণ্য আমদানি সম্ভব নয়। তাই অনেক গাড়ি আমদানি হলে কোনোভাবেই ঋণপত্র না খুলে জাহাজীকরণের সুযোগ নেই।

গত ২৭ নভেম্বর ঋণ জালিয়াতির মামলায় এক ব্যাংক কর্মকর্তার জামিন বাতিল আবেদনের শুনানিকালে সম্মানিত বিচারপতি নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি খিজির হায়াতের মহামান্য হাইকোর্ট বেঞ্চ দুদকের উদ্দেশে বলেন, ‘ঋণখেলাপিরা আইনের চেয়ে শক্তিশালী নয়। তাহলে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না কেন? হাজার হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে খেলাপি হচ্ছে। আপনারা ধরছেন না কেন? যারা বড় বড় ঋণখেলাপি, তারা কি বিচারের ঊর্ধ্বে থাকবে? যারা অর্থশালী, তারা কি ধরাছোঁয়ার বাইরে?’ ২৯ নভেম্বর বেসিক ব্যাংক ঋণ কেলেঙ্কারি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে করা পৃথক তিন মামলায় আসামির জামিন প্রশ্নে রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিজ্ঞ আদালত বলেন, ‘আইনানুযায়ী ১২০ দিনের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু দুদক এ সময়ের মধ্যে তদন্তকাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সময়মতো তদন্ত শেষ না হলে মামলার অনেক আলামত নষ্ট হয়ে যায়। নির্ধারিত সময়ে তদন্ত সংস্থা তদন্ত শেষ করতে না পারলে তাদের পদত্যাগের নজির অনেক দেশে আছে। কিন্তু আমাদের দেশে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগের নজির নেই। বরং যেসব কর্মকর্তা সফলভাবে তদন্ত করবে, তাদের হয়রানি-চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে।’

আদালত আরও বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা থেকে দুর্নীতি নির্মূল করাই আমাদের লক্ষ্য। আমাদের লড়াইটা দুর্নীতির বিরুদ্ধে। যত প্রভাবশালী এবং যত বড় দুর্নীতিবাজ হোক না কেন, আমরা দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কথা বলে যাব। ব্যক্তিগতভাবে আমরা কারও বিরুদ্ধে কথা বলি না। কেউ আমাদের শত্রু নয়। দেশ ও জনগণের স্বার্থে কথা বলি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলাই আমাদের উদ্দেশ্য।’ বেসিক ব্যাংকে লুটপাট ও অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে মামলার শুনানিতে গত ৯ নভেম্বর উচ্চ আদালতে যারা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করে তাদের ‘শুটডাউন’ করা উচিত বলেও মন্তব্য করা হয়েছিল। অতিসম্প্রতি ধারাবাহিকতায় তিনটি বেসরকারি ব্যাংকের একই ধরনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন উল্লিখিত সম্মানিত বিচারপতিদের নজরে এলে ৪ ডিসেম্বর স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ ওই ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন। চার মাসের মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে এ বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে এবং অনুসন্ধানে কিছু পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা-ও জানাতে বলা হয়েছে। দেশবাসীর জন্য সৌভাগ্যের বার্তা হচ্ছে, ২৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সচিব সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়গুলো আমলে নিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার আলোচনার প্রেক্ষাপটে দেশের ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানানোর জন্য ব্যাংকিং বিভাগকে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের নির্দেশনা লক্ষ-কোটি সাধারণ আমানতকারীর হৃদয়ে আশার সঞ্চার করেছে।

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন