একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি
jugantor
একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি

  বিমল সরকার  

০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নোয়াখালীতে দলের এক সম্মেলনে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথার সঙ্গে এ-ও বলেছেন, ‘মুজিব কোট পরলেই মুজিব সৈনিক হওয়া যায় না।

মুজিব সৈনিক হতে হলে মুজিবের আদর্শের সৈনিক হতে হবে, শেখ হাসিনার খাঁটি কর্মী হতে হবে।’ এমন কথা মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর আগেও বলেছেন এবং তিনি তা যথার্থই বলেছেন বলে মনে করি।

নিবন্ধটির শুরুটা দেখে যে কারও মনে হতে পারে, আমি রাজনীতি নিয়ে কিছু বলতে চাইছি। আসলে তা নয়। আমরা যেমন সামাজিক জীব, পাশাপাশি রাজনৈতিকও। বর্তমান জমানায় রাজনীতির বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে কোনোকিছু সহজে ভাবা যায় না।

কিশোরগঞ্জ জেলায় (তৎকালীন মহকুমা) আমাদের করিমগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের কমিটি হয় ১৯৭০ সালে। ওই কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হারুন অর রশিদ আর সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন চেনু। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আমার সরাসরি একজন শিক্ষক হন হারুন অর রশিদ। থানা ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার সময় হারুন স্যার গুরুদয়াল কলেজে বিকম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। একজন ভালো বক্তা তিনি। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং স্মৃতিতে অম্লান একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোয় নিজের থানা করিমগঞ্জসহ কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদসহ (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) বিভিন্ন নেতার সঙ্গে বা অনুসারী হিসাবে ব্যস্ত সময় কাটান তিনি। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন।

সাধারণ কৃষক পরিবারে তার জন্ম। এলাকায় একজন মেধাবী ছাত্র হিসাবে পরিচিত। ছাত্রনেতা ও মুক্তিযোদ্ধা; সর্বোপরি একাত্তরের কঠিন পরীক্ষার সময়টিতে ১১ মার্চ (১৯৭১) আমাদের করিমগঞ্জে অন্য নেতাদের উপস্থিতিতে হারুন স্যারের হাত দিয়ে উত্তোলিত হয় মানচিত্রখচিত গৌরবমণ্ডিত জাতীয় পতাকা। সে কী আবেগ আর গৌরব! স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর ডানদিক-বামদিক না তাকিয়ে ১৯৭২ সালে করিমগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবার সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি। মাত্র বাইশ বছরের টগবগে তরুণ। হলে কী হবে; কথাবার্তা, চলাফেরা, হাঁটা, বিনয়, সর্বোপরি ব্যক্তিত্ব-সবকিছুতেই যেন হারুন স্যার আলাদা। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সাল; সে কী গুরুত্বপূর্ণ সময়; আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সব ক্ষেত্রে! শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকলেও ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের আগ পর্যন্ত হারুন স্যারই থানা ছাত্রলীগের কার্যত সভাপতি। দৃশ্যটি আমার নিজের চোখে দেখা। বেশ স্পষ্ট মনে পড়ে, সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম (মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো করিমগঞ্জ এলে বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনামঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনন্দনপত্রটি পাঠ করেছিলেন হারুন স্যার। ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে হারুন স্যার তারই অনুজ (সহোদর) ছাত্রনেতা ও তুখোড় বক্তা মো. ইকবালের কাছে থানা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন। একই বছর (১৯৭৩) হারুন স্যার হলেন থানা যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, পরবর্তী সময়ে সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি হলেন সংগঠনের সভাপতি আর আবদুর রউফ একিন আলী (সাবেক বিডি মেম্বার ও আশুতিয়া পাড়া গ্রামে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী) সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় সর্বত্র ব্যাপক জল্পনাকল্পনা-আবুল হাশেম চৌধুরী ও আমাদের হারুন স্যারই হচ্ছেন থানা আওয়ামী লীগের যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু যুবলীগের সভাপতি হিসাবে নিয়মবিধি অনুযায়ী মূল দলের শীর্ষস্তরের (সাধারণ সম্পাদক) পদটি তার ভাগ্যে জোটেনি; যুবলীগের সভাপতি পদের পাশাপাশি হারুন স্যার হন করিমগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ কার্যকর কমিটির এক নম্বর সদস্য। সাধারণ সম্পাদক হন মো. রুস্তম আলী। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড ও পট পরিবর্তনের পর দেশে রাজনীতির ক্ষেত্রে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। আমাদের হারুন স্যারও অনেকটা হতোদ্যম হয়ে পড়েন। ১৯৮৩ সালে বাকশাল পুনর্গঠিত হলে স্যার হন থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। গত বিশ বছর ধরে তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে নেই, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-অনুসারী একজন সৈনিক হিসাবে সব সময় নিজেকে নিয়ে খুবই গর্ববোধ করেন তিনি।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্তরের ছাত্রনেতা, শীর্ষস্তরের যুবনেতা-রাজনীতিক, গর্বিত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অথচ তার কোনো বিকার নেই। অন্য সময় যেমনই হোক, সরাসরি একজন শিক্ষার্থী হিসাবে টানা চার বছর (১৯৭২-১৯৭৫) স্যারকে আমি লক্ষ করেছি। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর চামড়ার চটিজোড়া তার স্বাভাবিক পোশাক-পরিচ্ছদ। সময়মতো স্কুলে এসে ঘণ্টার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ এবং ক্লাস শেষে বের হওয়া ছিল স্যারের নিত্যদিনের চিত্র। আয়লা গ্রাম থেকে করিমগঞ্জ বাজার লাগোয়া স্কুলের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। তখন রাস্তা ছিল কাঁচা ও এবড়োখেবড়ো। কিন্তু শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা আজ পর্যন্ত স্যারকে কোনোদিন স্কুল বা করিমগঞ্জ বাজারে রিকশায় আসা-যাওয়া করতে আমরা দেখিনি।

আরও একটি কথা; আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে এবং এমন মনে হওয়াটা এখনকার যুগে অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। সদ্যস্বাধীন দেশ। মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি। চারদিকে অভাব-অনটন। বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতা; দেশ বিনির্মাণ ও ত্রাণ-তৎপরতা। দুর্ভিক্ষ। বিরোধীদের প্রতিবাদ ও আন্দোলন। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ। এতসব সত্ত্বেও হারুন স্যার কোনোদিন ব্যস্ত-ত্রস্ততার কারণে বা অজুহাতে স্কুলে তার দৈনন্দিন ক্লাস নিতে বিরত থেকেছেন-এমনটি আমাদের স্মৃতিতে নেই। রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রনেতা কিংবা এলাকার দু-চারজন লোক, এমনকি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব বিশেষ প্রয়োজনে দেখা করতে স্কুলে এসেছেন আর সে কারণে হারুন স্যার শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থেকেছেন-এমন বানোয়াট কথা বলা হলে আমাদের সমসাময়িক কেউ-ই বোধকরি বিশ্বাস করবেন না।

যার যার প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে এমন স্মৃতি সবারই থাকতে পারে এবং আছে। আমাদের হারুন স্যার করিমগঞ্জ হাইস্কুলে টানা ৩৮ বছর শিক্ষকতা করে ২০১০ সালে অবসর নেন। আমিও টানা ৩৬ বছর কলেজে শিক্ষকতা করে ২০১৯ সালে অবসর নিই। কাছাকাছি এলাকায় আমাদের জন্ম। স্যার বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শ সৈনিক, এখনো বেশ সুস্থদেহী। ফোনে ও সাক্ষাতে প্রায়ই নানা বিষয়ে স্যারের সঙ্গে কথা হয় আমার। সেদিন ফোন করে করিমগঞ্জ বাজারে গিয়ে দেখা করি। আমি কখনো দেখিনি এবং অন্যদের কাছেও শুনিনি, তবু আলাপের শুরুতেই স্যারের মুখ থেকে শুনতে চাই এ পর্যন্ত তিনি কখনো মুজিবকোট বানিয়েছেন কিংবা পরেছেন কিনা। হঠাৎ আমার এমন কৌতূহলে বোধকরি তিনি কিছুটা বিস্মিত হলেন। আমার মুখটি ভালো করে দেখে বললেন, ‘হঠাৎ আজ এমন প্রশ্ন?’

-‘আপনার কাছে আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না, তবে কারণ অবশ্যই আছে।’ এবার আমি স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তিনি মৃদুস্বরে বলে চলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার আদর্শ, তিনি ওই কোট পরতেন। ঐতিহ্যবাহী ওই কোট আমার মতো একজন ব্যক্তির দেহে পরতে হবে-একথা আমি কখনো ভাবিনি। দেহে নয়, আমি সব সময় আমার নেতাকে হৃদয়ে ধারণ করি।’

এ কোনো আত্মকথন নয়। রাজনীতি-রাজনীতিক, শিক্ষা-শিক্ষক; বিরাজমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি-পরিবেশ- অবসর সময়ে এমন সবকিছু নিয়ে ভাবতে গিয়েই এ নিবন্ধ লেখা। কারও ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করবেন।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি

 বিমল সরকার 
০৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নোয়াখালীতে দলের এক সম্মেলনে অন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথার সঙ্গে এ-ও বলেছেন, ‘মুজিব কোট পরলেই মুজিব সৈনিক হওয়া যায় না।

মুজিব সৈনিক হতে হলে মুজিবের আদর্শের সৈনিক হতে হবে, শেখ হাসিনার খাঁটি কর্মী হতে হবে।’ এমন কথা মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর আগেও বলেছেন এবং তিনি তা যথার্থই বলেছেন বলে মনে করি।

নিবন্ধটির শুরুটা দেখে যে কারও মনে হতে পারে, আমি রাজনীতি নিয়ে কিছু বলতে চাইছি। আসলে তা নয়। আমরা যেমন সামাজিক জীব, পাশাপাশি রাজনৈতিকও। বর্তমান জমানায় রাজনীতির বাইরে বিচ্ছিন্নভাবে কোনোকিছু সহজে ভাবা যায় না।

কিশোরগঞ্জ জেলায় (তৎকালীন মহকুমা) আমাদের করিমগঞ্জ থানা ছাত্রলীগের কমিটি হয় ১৯৭০ সালে। ওই কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হারুন অর রশিদ আর সাধারণ সম্পাদক আফতাব হোসেন চেনু। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে আমার সরাসরি একজন শিক্ষক হন হারুন অর রশিদ। থানা ছাত্রলীগের সভাপতি হওয়ার সময় হারুন স্যার গুরুদয়াল কলেজে বিকম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। একজন ভালো বক্তা তিনি। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং স্মৃতিতে অম্লান একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিঝরা দিনগুলোয় নিজের থানা করিমগঞ্জসহ কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের অ্যাডভোকেট মো. আবদুল হামিদসহ (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) বিভিন্ন নেতার সঙ্গে বা অনুসারী হিসাবে ব্যস্ত সময় কাটান তিনি। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশ নেন।

সাধারণ কৃষক পরিবারে তার জন্ম। এলাকায় একজন মেধাবী ছাত্র হিসাবে পরিচিত। ছাত্রনেতা ও মুক্তিযোদ্ধা; সর্বোপরি একাত্তরের কঠিন পরীক্ষার সময়টিতে ১১ মার্চ (১৯৭১) আমাদের করিমগঞ্জে অন্য নেতাদের উপস্থিতিতে হারুন স্যারের হাত দিয়ে উত্তোলিত হয় মানচিত্রখচিত গৌরবমণ্ডিত জাতীয় পতাকা। সে কী আবেগ আর গৌরব! স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর ডানদিক-বামদিক না তাকিয়ে ১৯৭২ সালে করিমগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেন তিনি। অল্প সময়ের মধ্যেই শিক্ষার্থী-শিক্ষক সবার সুদৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন একজন আদর্শ শিক্ষকের প্রতিকৃতি। মাত্র বাইশ বছরের টগবগে তরুণ। হলে কী হবে; কথাবার্তা, চলাফেরা, হাঁটা, বিনয়, সর্বোপরি ব্যক্তিত্ব-সবকিছুতেই যেন হারুন স্যার আলাদা। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সাল; সে কী গুরুত্বপূর্ণ সময়; আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-প্রশাসনিক সব ক্ষেত্রে! শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকলেও ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত সম্মেলনের আগ পর্যন্ত হারুন স্যারই থানা ছাত্রলীগের কার্যত সভাপতি। দৃশ্যটি আমার নিজের চোখে দেখা। বেশ স্পষ্ট মনে পড়ে, সরকারের শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী সৈয়দ নজরুল ইসলাম (মুক্তিযুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকারের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো করিমগঞ্জ এলে বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত সংবর্ধনামঞ্চে দাঁড়িয়ে অভিনন্দনপত্রটি পাঠ করেছিলেন হারুন স্যার। ১৯৭৩ সালে ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলে হারুন স্যার তারই অনুজ (সহোদর) ছাত্রনেতা ও তুখোড় বক্তা মো. ইকবালের কাছে থানা ছাত্রলীগের সভাপতির দায়িত্বভার হস্তান্তর করেন। একই বছর (১৯৭৩) হারুন স্যার হলেন থানা যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, পরবর্তী সময়ে সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি হলেন সংগঠনের সভাপতি আর আবদুর রউফ একিন আলী (সাবেক বিডি মেম্বার ও আশুতিয়া পাড়া গ্রামে আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী) সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭৪ সালে আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার সময় সর্বত্র ব্যাপক জল্পনাকল্পনা-আবুল হাশেম চৌধুরী ও আমাদের হারুন স্যারই হচ্ছেন থানা আওয়ামী লীগের যথাক্রমে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। কিন্তু যুবলীগের সভাপতি হিসাবে নিয়মবিধি অনুযায়ী মূল দলের শীর্ষস্তরের (সাধারণ সম্পাদক) পদটি তার ভাগ্যে জোটেনি; যুবলীগের সভাপতি পদের পাশাপাশি হারুন স্যার হন করিমগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ কার্যকর কমিটির এক নম্বর সদস্য। সাধারণ সম্পাদক হন মো. রুস্তম আলী। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ড ও পট পরিবর্তনের পর দেশে রাজনীতির ক্ষেত্রে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। আমাদের হারুন স্যারও অনেকটা হতোদ্যম হয়ে পড়েন। ১৯৮৩ সালে বাকশাল পুনর্গঠিত হলে স্যার হন থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক। গত বিশ বছর ধরে তিনি আর সক্রিয় রাজনীতিতে নেই, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ-অনুসারী একজন সৈনিক হিসাবে সব সময় নিজেকে নিয়ে খুবই গর্ববোধ করেন তিনি।

ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষস্তরের ছাত্রনেতা, শীর্ষস্তরের যুবনেতা-রাজনীতিক, গর্বিত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। অথচ তার কোনো বিকার নেই। অন্য সময় যেমনই হোক, সরাসরি একজন শিক্ষার্থী হিসাবে টানা চার বছর (১৯৭২-১৯৭৫) স্যারকে আমি লক্ষ করেছি। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি আর চামড়ার চটিজোড়া তার স্বাভাবিক পোশাক-পরিচ্ছদ। সময়মতো স্কুলে এসে ঘণ্টার সঙ্গে তাল মিলিয়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ এবং ক্লাস শেষে বের হওয়া ছিল স্যারের নিত্যদিনের চিত্র। আয়লা গ্রাম থেকে করিমগঞ্জ বাজার লাগোয়া স্কুলের দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। তখন রাস্তা ছিল কাঁচা ও এবড়োখেবড়ো। কিন্তু শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা আজ পর্যন্ত স্যারকে কোনোদিন স্কুল বা করিমগঞ্জ বাজারে রিকশায় আসা-যাওয়া করতে আমরা দেখিনি।

আরও একটি কথা; আপাতদৃষ্টিতে অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য বলে মনে হতে পারে এবং এমন মনে হওয়াটা এখনকার যুগে অস্বাভাবিক কোনো ব্যাপার নয়। সদ্যস্বাধীন দেশ। মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি। চারদিকে অভাব-অনটন। বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতা; দেশ বিনির্মাণ ও ত্রাণ-তৎপরতা। দুর্ভিক্ষ। বিরোধীদের প্রতিবাদ ও আন্দোলন। রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ। এতসব সত্ত্বেও হারুন স্যার কোনোদিন ব্যস্ত-ত্রস্ততার কারণে বা অজুহাতে স্কুলে তার দৈনন্দিন ক্লাস নিতে বিরত থেকেছেন-এমনটি আমাদের স্মৃতিতে নেই। রাজনৈতিক নেতা, ছাত্রনেতা কিংবা এলাকার দু-চারজন লোক, এমনকি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধব বিশেষ প্রয়োজনে দেখা করতে স্কুলে এসেছেন আর সে কারণে হারুন স্যার শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থেকেছেন-এমন বানোয়াট কথা বলা হলে আমাদের সমসাময়িক কেউ-ই বোধকরি বিশ্বাস করবেন না।

যার যার প্রিয় শিক্ষককে নিয়ে এমন স্মৃতি সবারই থাকতে পারে এবং আছে। আমাদের হারুন স্যার করিমগঞ্জ হাইস্কুলে টানা ৩৮ বছর শিক্ষকতা করে ২০১০ সালে অবসর নেন। আমিও টানা ৩৬ বছর কলেজে শিক্ষকতা করে ২০১৯ সালে অবসর নিই। কাছাকাছি এলাকায় আমাদের জন্ম। স্যার বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শ সৈনিক, এখনো বেশ সুস্থদেহী। ফোনে ও সাক্ষাতে প্রায়ই নানা বিষয়ে স্যারের সঙ্গে কথা হয় আমার। সেদিন ফোন করে করিমগঞ্জ বাজারে গিয়ে দেখা করি। আমি কখনো দেখিনি এবং অন্যদের কাছেও শুনিনি, তবু আলাপের শুরুতেই স্যারের মুখ থেকে শুনতে চাই এ পর্যন্ত তিনি কখনো মুজিবকোট বানিয়েছেন কিংবা পরেছেন কিনা। হঠাৎ আমার এমন কৌতূহলে বোধকরি তিনি কিছুটা বিস্মিত হলেন। আমার মুখটি ভালো করে দেখে বললেন, ‘হঠাৎ আজ এমন প্রশ্ন?’

-‘আপনার কাছে আমি ব্যাখ্যা করতে পারব না, তবে কারণ অবশ্যই আছে।’ এবার আমি স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

তিনি মৃদুস্বরে বলে চলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার আদর্শ, তিনি ওই কোট পরতেন। ঐতিহ্যবাহী ওই কোট আমার মতো একজন ব্যক্তির দেহে পরতে হবে-একথা আমি কখনো ভাবিনি। দেহে নয়, আমি সব সময় আমার নেতাকে হৃদয়ে ধারণ করি।’

এ কোনো আত্মকথন নয়। রাজনীতি-রাজনীতিক, শিক্ষা-শিক্ষক; বিরাজমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি-পরিবেশ- অবসর সময়ে এমন সবকিছু নিয়ে ভাবতে গিয়েই এ নিবন্ধ লেখা। কারও ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করবেন।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন