ফুটবলও পুতিনের কাছে রাষ্ট্রীয় বিষয়

  আন্দ্রেই কলেসনিকভ ২৭ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফুটবলও পুতিনের কাছে রাষ্ট্রীয় বিষয়
ফুটবলও পুতিনের কাছে রাষ্ট্রীয় বিষয়

১৯৭১ সালে ডেভিস কাপের সেমিফাইনাল কোনো সাধারণ টেনিস প্রতিযোগিতা ছিল না। তাতে চেকোস্লোভাকিয়ার ইয়ান কোদেসের ক্ষেত্রে পরাজয়ের কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি নিজ দেশের কোর্টে লড়াই করছিলেন আর প্রাগে প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে চেকোস্লোভাকিয়ার বৈঠক চলছিল।

সে সময় চেকোস্লোভাকিয়ার খেলোয়াড় ও কোচদের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের খেলোয়াড়দের বিপক্ষে যে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ছিল তিন বছর আগের ওয়ারশো চুক্তি অনুযায়ী সেনাদের প্রাগ আক্রমণ প্রতিরোধের মতোই একটি ব্যাপার। খেলার যে কোনো জয় বা পরাজয়কে সামরিক জয়-পরাজয়ের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হতো তখন।

সোভিয়েত খেলোয়াড় আলেকজান্দার মেত্রেভেলি পরে স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি বুঝতে পারতেন না কেন তাকে সোভিয়েত ট্যাঙ্কের মতো অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ওই পরিস্থিতিতেও প্রাগে কোর্টের বাইরে বোবার মতো নীরবতায় তিনি জয়ী হয়েছেন। ইয়ান কোদেসের ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিল একটা ট্রাজেডি। তিনি নিজেই কেবল ব্যর্থ হননি, তার দেশও ব্যর্থ হয়েছে; তাও এমন এক সময়ে যখন দেশটি ছিল দখলদারিত্বের মধ্যে।

সেটা ছিল কেবল টেনিসের বিষয়। দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘ আবেগ ও থমথমে অবস্থার মূল প্রতিযোগিতা ছিল হকিতে। ১৯৬৯ সালে স্টকহোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব আইস হকি চ্যাম্পিয়নশিপে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে চেকোস্লোভাকিয়ার ম্যাচে ৩৩তম মিনিটে চেকোস্লোভ ডিফেন্ডার ইয়ান সাচির স্টিকের (হকি খেলার রবারের চাকতি) আঘাতটির একটা প্রতীকী অর্থ ছিল। এটি ছিল উদ্বোধনী শট। রাজনৈতিকভাবে বললে, গোটা পরিবেশজুড়ে বা ওই বিশেষ ক্ষেত্রে দখলদারদের বিপক্ষে খেলার ফলাফল ছিল ১-০। এটি ছিল যে কোনো মূল্যের বিজয়। কারণ এ বিজয়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল। দেশটির ইমেজের জন্য এটি ছিল কোমল শক্তি।

সোভিয়েত ইউনিয়নে যে চেকোস্লোভাক খেলোয়াড়ের দক্ষতা কুখ্যাত ছিল- সেই ভাসলাভ নেদোমানস্কি সোভিয়েত গোলরক্ষক ভিক্তর জিঞ্জারের পোস্টে উৎফুল্লভাবে যথেষ্ট শক্তি নিয়ে আঘাত করেন এবং সোভিয়েত গোলবারে তীক্ষ্ণ চিৎকার-চেঁচামেচি করেন যাতে তাদের সরিয়ে দেয়া যায়। দুর্বল জিঞ্জার যেন সোভিয়েত ট্যাঙ্কের দায়ভার বহন করছিলেন এবং চেকোস্লোভাকদের অবমাননা সহ্য করছিলেন।

খেলাধুলাকে হাইব্রিড যুদ্ধের মতো দেখার ঐতিহ্য সোভিয়েত যুগের পরও চলে আসছে। এটি দেখতে ২০১৪ সালের ডোপিং কেলেঙ্কারির বাইরে না তাকালেও চলে। কোনো কিছুই পরিবর্তিত হয়নি। যে কোনো মূল্যে জিততে হবে। কারণ জয়ের রাজনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে। দেশের ইমেজের বেলায় এটি কোমল শক্তি- প্রাজ্ঞ একজন নেতার নেতৃত্বে শাসিত অজেয় একটি দেশের প্রতিচ্ছবি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের অলিম্পিক খেলোয়াড়রা অনেক বেশি শিক্ষা পেয়েছিলেন। কারণ, তাদের পদক সংখ্যার ওপর নির্ভর করত সোভিয়েত রাজত্বের মর্যাদা। এটিও কাকতালীয় ছিল না যে, ১৯৫২ সালের হেলসিঙ্কি গেমের আগ পর্যন্ত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে যোগদান করেনি সোভিয়েত টিম। তাদের নিশ্চিত হতে হয়েছিল যেন দলের পারফরম্যান্স মস্কোর ভাবমূর্তি ধুলায় মিশিয়ে না দেয়। একইভাবে শীতকালীন অলিম্পিকেও তারা অংশ নেয় ১৯৫৬ সালে। কারণ সোভিয়েত নেতৃত্ব যখন নিশ্চিত হয়েছিল তাদের হকি দল জিততে পারবে, তখনই তারা এটি করেছিল।

একই মনোভাব আবারও দেখা যায় ১৯৭২ সালে। তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন হকির সুপার সিরিজ এনএইচএলে কানাডা দলের বিরুদ্ধে খেলতে সম্মত হয়েছিল। এর আগ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন হারের আশঙ্কা করছিল। একই পরিস্থিতি ফিরে এসেছে ২০১৮ সালের শীতকালীন অলিম্পিকের ফাইনালে, যেখানে জার্মানির কাছে রাশিয়া প্রায় হারতে বসেছিল। বিষয়টি একসঙ্গে ভালোভাবে উঠে এসেছে একজন ব্লগারের কাজের মধ্যে। তিনি ১৯৪৫ সালে রাইখস্ট্যাগে সোভিয়েত সেনা কর্তৃক নিজেদের ব্যানার উত্তোলনের ঐতিহাসিক ছবির স্থানে হকি স্টিকসহ রাশিয়ার একটি পতাকা বসিয়ে দিয়েছিলেন।

খেলা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের একটি বিষয়। এটি হচ্ছে দেশপ্রেম মতবাদের একটি অঙ্গ। খেলাধুলার ইভেন্ট সংক্রান্ত দেশপ্রেমের সিনেমাগুলো রাশিয়াতে সব ধরনের উন্মত্ততা তৈরি করে। ১৯৭০-এর দশকের হকি আইডল ভালেরি খারলামভকে নিয়ে ‘লিজেন্ড নাম্বার ১৭’ এবং ১৯৭২ সালের অলিম্পিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বাস্কেটবল টিমের যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো নিয়ে ‘গোয়িং ভার্টিকাল’ উল্লেখযোগ্য দুটি সিনেমা। এ ধরনের সাধারণ মানোত্তীর্ণ অনেক সিনেমা তৈরি হয়েছে এবং সেগুলোতে বাস্তবতাকে বিকৃত করাও হয়েছে; কিন্তু সেগুলো রাশিয়ায় দেশপ্রেমের মনোভাব জাগ্রত করেছে।

বর্তমান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ২০১৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ দিয়ে কোমল শক্তি ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে রাশিয়ার ভাবমূর্তি উন্নত করতে চান। কিন্তু পশ্চিমাদের চোখে তার প্রশাসন এত বেশি বিষাক্ত যে ফুটবল টুর্নামেন্টটি দিয়ে দেশটির ভাবমূর্তির খুব একটা পরিবর্তন ঘটানো যাবে না।

পুতিন সবচেয়ে ভালো যেটা এখন করতে পারেন তা হল ত্রুটিহীন ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক সহায়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এটি করার জন্য তিনি নজিরবিহীন প্রচেষ্টা নিয়েছেন- অনেকটা ১৯৮০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভের অধীনে মস্কোতে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক আয়োজনের মতো। সর্বোপরি, সেটাও ছিল রাষ্ট্রীয় গুরুত্বের বিষয়।

দ্য মস্কো টাইমস থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম

আন্দ্রেই কলেসনিকভ : কার্নেগি মস্কো সেন্টারের জ্যেষ্ঠ সহযোগী ও রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান বিষয়ের চেয়ারম্যান

ঘটনাপ্রবাহ : বিশ্বকাপ ফুটবল ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter