মতিয়া চৌধুরীর জন্য শুভকামনা
jugantor
মতিয়া চৌধুরীর জন্য শুভকামনা

  মোনায়েম সরকার  

২১ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী সংসদের উপনেতা নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনীতিতে ত্যাগী মানুষদের সেভাবে মূল্যায়ন হয় না বলে একটা কথা চালু রয়েছে। মতিয়া চৌধুরী সংসদ উপনেতা হওয়ায় এটা বলা যায়, ব্যতিক্রমী ঘটনাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আছে। মতিয়া চৌধুরী দীর্ঘদিন থেকে ব্যক্তিগতভাবে শুধু আমার পরিচিত নন, তিনি দেশের অসংখ্য মানুষের কাছে পরিচিত নাম।

গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যে আন্দোলন-সংগ্রাম, তাতে মতিয়া চৌধুরী অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি আইয়ুব খানের আমলে চারবার কারাবরণ করেন। স্বাধীন দেশে জিয়া-এরশাদ আমলেও তাকে কারাগারে যেতে হয়। রাজপথে পুলিশের দ্বারা নির্যাতিত হন।

১৯৪২ সালের ৩০ জুন পিরোজপুর জেলায় মতিয়া চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন তিনি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে যে প্রবল ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তারও সম্মুখসারির সংগঠক ছিলেন মতিয়া চৌধুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে তিনি রোকেয়া হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর পরের বছরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়ন মতাদর্শিক কারণে বিভক্ত হলে মতিয়া চৌধুরী এক অংশের সভাপতি নির্বাচিত হন। অন্য অংশের সভাপতি হয়েছিলেন রাশেদ খান মেনন। সেই হিসাবে ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ নামে পরিচিতি পেয়েছিল।

মতিয়া চৌধুরী তার জ্বালাময়ী বক্তৃতার কারণে ‘অগ্নিকন্যা’ হিসাবে ছাত্র-জনতার কাছে পরিচিতি পেয়েছিলেন। সে সময়ে ছাত্র রাজনীতিতে একজন নারীর যুক্ত হওয়া সাধারণ ঘটনা ছিল না। পাকিস্তানি শাসকরা ছিল অত্যাচার-নিপীড়নে সিদ্ধহস্ত। রাজনৈতিক কর্মীদের ভাগ্যে জেল-জুলুম ছিল নিয়মিত ঘটনা। সে সময়ে শাসকগোষ্ঠীর অনুকূলে এনএসএফ নামে একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এনএসএফের কাজই ছিল গুণ্ডামি-মাস্তানি করা।

ওই সময়ে ছাত্র সমাজের মধ্যে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ ছিল জনপ্রিয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ অথবা ছাত্র ইউনিয়নের জয়লাভ ছিল নিয়মিত ঘটনা। সামরিক শাসনের কারণে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নামে সরাসরি নির্বাচন করা না গেলেও অন্য নামে সংগঠন গড়ে এ দুই ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করতেন।

মতিয়া চৌধুরীর ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সহজ ছিল না, সেটা আগেই উল্লেখ করেছি। তার বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তবে তিনি উদার ও গণতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন। তিনি তার কন্যা মতিয়া চৌধুরীর রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় আপত্তি করেননি।

কিন্তু মতিয়া চৌধুরী যখন আইয়ুব খান কিংবা তার অনুগত প্রাদেশিক গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতেন, সেটা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সহজ ছিল না। পুলিশ অফিসারের কন্যা দেশের প্রেসিডেন্ট ও গভর্নরকে হেয় করে বক্তৃতা দেবেন, এটি ছিল তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়। তাই মতিয়া চৌধুরীর বাবাকে বলা হয়েছিল নিজ কন্যাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতে।

সেই জটিল পরিস্থিতিতে মতিয়া চৌধুরী পিতার অভিভাবকত্ব থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পিতা অভিভাবক না হলে একজন নারী কাকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করবেন? স্বাভাবিকভাবে তখন বিয়ের প্রশ্নটি সামনে আসে এবং ১৯৬৪ সালের ১৮ জুন সাংবাদিক বজলুর রহমানের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বজলুর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে তার জানাশোনা ছিল। বজলুর রহমানের বাড়ি বর্তমান শেরপুর জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থনীতিতে এমএ পাশ করে দৈনিক সংবাদে সহকারী সম্পাদক হিসাবে কাজ করছিলেন।

মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হিসাবে আমার পরিচয়। আমরা একসঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে সহযোদ্ধা ছিলাম। এখন আমাদের দুজনেরই বয়স হয়েছে। আমি নিজে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকতে পারিনি। আমার এটি খুবই ভালো লাগে যে, মতিয়া চৌধুরী এখনো রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সততা ও আদর্শবাদিতার প্রতীক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার রাজনীতির চলার পথ নিষ্কণ্টক হয়েছিল রাজনীতিসচেতন একজন উদার ও প্রগতিশীল মানুষ বজলুর রহমানকে স্বামী হিসাবে পাওয়ায়। সাদাসিধা জীবনেও তিনি অভ্যস্ত।

ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পর ১৯৬৭ সালেই মতিয়া চৌধুরী যোগ দিয়েছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে। দ্রুতই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে খ্যাতি অর্জন করেন তার বক্তৃতার কারণে। আগেই উল্লেখ করেছি, দেশের মানুষের কাছে যতই তার জনপ্রিয়তা বাড়ছিল, ততই তিনি শাসকদের রোষানলে পড়ছিলেন। তাকে জেলে থাকতে হয়েছে।

জেলজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মতিয়া চৌধুরীর লেখা ‘দেওয়াল দিয়ে ঘেরা’ বইটি রাজনৈতিক মহলে এক সময়ে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব খানের পতন হলে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক রাজনৈতিক বন্দি কারাগার থেকে মুক্তি পান। মতিয়া চৌধুরীও তখন জেল থেকে বেরিয়ে এসে মাঠের রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মতিয়া চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনে তিনি একজন সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ন্যাপের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের রাজনীতি করেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি-গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ-এই ধারার রাজনীতি থেকে মতিয়া চৌধুরী কখনো বিচ্যুত হননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বামপন্থি রাজনীতিবিদদের ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় মতিয়া চৌধুরীও ছিলেন তার পছন্দের তালিকায়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠন করলে এর ১১৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মতিয়া চৌধুরীকেও রাখা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যেমন প্রতিবাদ-আন্দোলন হওয়া প্রত্যাশিত ছিল, বাস্তবে তা হয়নি। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন আওয়ামী লীগের যেমন চরম ব্যর্থতা আছে, তেমনি আওয়ামী লীগের মিত্র হিসাবে পরিচিত ন্যাপ-কমিউনিস্ট পাটিও ওই ব্যর্থতার ভাগীদার।

বিশেষ করে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর কিছু ক্ষেত্রে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ছিল বিভ্রান্তিকর। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ছাপিয়ে বিলি করেছেন আর কমিউনিস্ট পার্টি জিয়ার খাল কাটা কর্মসূচিতে অংশ নেয়। আওয়ামী লীগের জন্য ওই সময়টা মোটেও অনুকূল ছিল না।

বলা যায়, আওয়ামী লীগের ওই দুঃসময়ে মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে আমরা কয়েকজন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলাম। ১৯৭৯ সালের ১০ ডিসেম্বর মোট ১৭ জন কেন্দ্রীয় নেতা আওয়ামী লীগে যোগদান করি। মতিয়া চৌধুরী ছাড়াও যোগদানকারী দলে ছিলেন স্থপতি মাযহারুল ইসলাম, স্থপতি আলমগীর কবীর, স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, দবিরউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

মতিয়া চৌধুরী যখন আওয়ামী লীগে যোগ দেন, তখন কোনো প্রত্যাশা নিয়ে তা করেননি। তিনি বুঝেছিলেন, দেশের রাজনীতির চাকাকে যদি মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে তার জন্য উপযুক্ত দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল এবং গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে এ দলটি। সুবিধাবাদীরা আওয়ামী লীগে আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়নি, তা অবশ্য নয়। কিন্তু মোটা দাগে আমাদের দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক ধারা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিকল্প তৈরি হয়নি। তাই মতিয়া চৌধুরী ছোট দলের বড় নেতা হওয়ার মোহ ত্যাগ করে বরং বড় দলের কর্মী হয়ে দেশের জন্য কাজ করাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিচক্ষণ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যেমন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে, তেমনি রাজনীতিতে এসেছে পরিবর্তনের হাওয়া। শেখ হাসিনার এ নতুন পথযাত্রায় মতিয়া চৌধুরী অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে সঙ্গে আছেন। মতিয়া চৌধুরী আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়েছেন। আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের দুই মেয়াদে তিনি কৃষিমন্ত্রী হিসাবে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলাদেশের কৃষি খাতে যে বড় সাফল্য এসেছে, তা মতিয়া চৌধুরীর উদ্যোগ ও পরিকল্পনার ফল। মতিয়া চৌধুরী শেরপুর থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

আমাদের দেশে এমপি-মন্ত্রী হলে কেউ সৎ থাকেন না বলে ধারণা তৈরি হয়েছে; কিন্তু মতিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে অসততার কোনো অভিযোগ নেই। নিজের সুবিধার জন্য রাজনীতি যারা করেন, তাদের মধ্যে মতিয়া চৌধুরী এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়, তাই আওয়ামী লীগের দিকে এখন অনেকেই ঝুঁকছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সুসময়ে নয়, দুঃসময়ে সঙ্গী হয়েছিলেন মতিয়া চৌধুরী। সৎ-ত্যাগী-আদর্শবাদী নেতাদের দলে মূল্যায়ন হয় না বলে কারও কারও যে অভিমান রয়েছে, তা এখন হয়তো কিছুটা দূর হবে মতিয়া চৌধুরীকে সংসদের উপনেতার দায়িত্ব দেওয়ায়।

এক-এগারোর সময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা কারারুদ্ধ দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও মতিয়া চৌধুরী বিশ্বাসভঙ্গ না করে তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। এখন সংসদ উপনেতা হিসাবেও তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে শেখ হাসিনার পাশে থাকবেন বলে তার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা হিসাবে আমার বিশ্বাস।

মোনায়েম সরকার : রাজনীতিবিদ, লেখক ও মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ

মতিয়া চৌধুরীর জন্য শুভকামনা

 মোনায়েম সরকার 
২১ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মতিয়া চৌধুরী সংসদের উপনেতা নির্বাচিত হয়েছেন। রাজনীতিতে ত্যাগী মানুষদের সেভাবে মূল্যায়ন হয় না বলে একটা কথা চালু রয়েছে। মতিয়া চৌধুরী সংসদ উপনেতা হওয়ায় এটা বলা যায়, ব্যতিক্রমী ঘটনাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আছে। মতিয়া চৌধুরী দীর্ঘদিন থেকে ব্যক্তিগতভাবে শুধু আমার পরিচিত নন, তিনি দেশের অসংখ্য মানুষের কাছে পরিচিত নাম।

গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যে আন্দোলন-সংগ্রাম, তাতে মতিয়া চৌধুরী অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। তিনি আইয়ুব খানের আমলে চারবার কারাবরণ করেন। স্বাধীন দেশে জিয়া-এরশাদ আমলেও তাকে কারাগারে যেতে হয়। রাজপথে পুলিশের দ্বারা নির্যাতিত হন।

১৯৪২ সালের ৩০ জুন পিরোজপুর জেলায় মতিয়া চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন। ইডেন কলেজের ছাত্রী থাকাকালীন তিনি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে জড়িত হন। ১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে যে প্রবল ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তারও সম্মুখসারির সংগঠক ছিলেন মতিয়া চৌধুরী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ১৯৬৩ সালে তিনি রোকেয়া হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর পরের বছরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে ছাত্র ইউনিয়ন মতাদর্শিক কারণে বিভক্ত হলে মতিয়া চৌধুরী এক অংশের সভাপতি নির্বাচিত হন। অন্য অংশের সভাপতি হয়েছিলেন রাশেদ খান মেনন। সেই হিসাবে ছাত্র ইউনিয়ন মতিয়া গ্রুপ ও ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপ নামে পরিচিতি পেয়েছিল।

মতিয়া চৌধুরী তার জ্বালাময়ী বক্তৃতার কারণে ‘অগ্নিকন্যা’ হিসাবে ছাত্র-জনতার কাছে পরিচিতি পেয়েছিলেন। সে সময়ে ছাত্র রাজনীতিতে একজন নারীর যুক্ত হওয়া সাধারণ ঘটনা ছিল না। পাকিস্তানি শাসকরা ছিল অত্যাচার-নিপীড়নে সিদ্ধহস্ত। রাজনৈতিক কর্মীদের ভাগ্যে জেল-জুলুম ছিল নিয়মিত ঘটনা। সে সময়ে শাসকগোষ্ঠীর অনুকূলে এনএসএফ নামে একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এনএসএফের কাজই ছিল গুণ্ডামি-মাস্তানি করা।

ওই সময়ে ছাত্র সমাজের মধ্যে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ ছিল জনপ্রিয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ অথবা ছাত্র ইউনিয়নের জয়লাভ ছিল নিয়মিত ঘটনা। সামরিক শাসনের কারণে কোনো কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নামে সরাসরি নির্বাচন করা না গেলেও অন্য নামে সংগঠন গড়ে এ দুই ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করতেন।

মতিয়া চৌধুরীর ছাত্র রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি সহজ ছিল না, সেটা আগেই উল্লেখ করেছি। তার বাবা মহিউদ্দিন চৌধুরী ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তবে তিনি উদার ও গণতান্ত্রিক মানসিকতাসম্পন্ন একজন মানুষ ছিলেন। তিনি তার কন্যা মতিয়া চৌধুরীর রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় আপত্তি করেননি।

কিন্তু মতিয়া চৌধুরী যখন আইয়ুব খান কিংবা তার অনুগত প্রাদেশিক গভর্নর মোনায়েম খানের বিরুদ্ধে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতেন, সেটা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে সহজ ছিল না। পুলিশ অফিসারের কন্যা দেশের প্রেসিডেন্ট ও গভর্নরকে হেয় করে বক্তৃতা দেবেন, এটি ছিল তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য একটি বিষয়। তাই মতিয়া চৌধুরীর বাবাকে বলা হয়েছিল নিজ কন্যাকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করতে।

সেই জটিল পরিস্থিতিতে মতিয়া চৌধুরী পিতার অভিভাবকত্ব থেকে বেরিয়ে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পিতা অভিভাবক না হলে একজন নারী কাকে অভিভাবক হিসাবে গ্রহণ করবেন? স্বাভাবিকভাবে তখন বিয়ের প্রশ্নটি সামনে আসে এবং ১৯৬৪ সালের ১৮ জুন সাংবাদিক বজলুর রহমানের সঙ্গে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বজলুর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক কারণে তার জানাশোনা ছিল। বজলুর রহমানের বাড়ি বর্তমান শেরপুর জেলায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি অর্থনীতিতে এমএ পাশ করে দৈনিক সংবাদে সহকারী সম্পাদক হিসাবে কাজ করছিলেন।

মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে ছাত্র আন্দোলনের কর্মী হিসাবে আমার পরিচয়। আমরা একসঙ্গে রাজপথের আন্দোলনে সহযোদ্ধা ছিলাম। এখন আমাদের দুজনেরই বয়স হয়েছে। আমি নিজে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকতে পারিনি। আমার এটি খুবই ভালো লাগে যে, মতিয়া চৌধুরী এখনো রাজনীতিতে সক্রিয় আছেন। তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে সততা ও আদর্শবাদিতার প্রতীক হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছেন। তার রাজনীতির চলার পথ নিষ্কণ্টক হয়েছিল রাজনীতিসচেতন একজন উদার ও প্রগতিশীল মানুষ বজলুর রহমানকে স্বামী হিসাবে পাওয়ায়। সাদাসিধা জীবনেও তিনি অভ্যস্ত।

ছাত্রজীবন শেষ হওয়ার পর ১৯৬৭ সালেই মতিয়া চৌধুরী যোগ দিয়েছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে। দ্রুতই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে খ্যাতি অর্জন করেন তার বক্তৃতার কারণে। আগেই উল্লেখ করেছি, দেশের মানুষের কাছে যতই তার জনপ্রিয়তা বাড়ছিল, ততই তিনি শাসকদের রোষানলে পড়ছিলেন। তাকে জেলে থাকতে হয়েছে।

জেলজীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে মতিয়া চৌধুরীর লেখা ‘দেওয়াল দিয়ে ঘেরা’ বইটি রাজনৈতিক মহলে এক সময়ে যথেষ্ট জনপ্রিয় ছিল। ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব খানের পতন হলে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক রাজনৈতিক বন্দি কারাগার থেকে মুক্তি পান। মতিয়া চৌধুরীও তখন জেল থেকে বেরিয়ে এসে মাঠের রাজনীতিতে আবার সক্রিয় হন।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জীবনে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। মতিয়া চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনী গঠনে তিনি একজন সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি ন্যাপের মাধ্যমে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের রাজনীতি করেন।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি-গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ-এই ধারার রাজনীতি থেকে মতিয়া চৌধুরী কখনো বিচ্যুত হননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বামপন্থি রাজনীতিবিদদের ভালো সম্পর্ক ছিল। সেই ধারাবাহিকতায় মতিয়া চৌধুরীও ছিলেন তার পছন্দের তালিকায়। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল গঠন করলে এর ১১৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটিতে মতিয়া চৌধুরীকেও রাখা হয়।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যেমন প্রতিবাদ-আন্দোলন হওয়া প্রত্যাশিত ছিল, বাস্তবে তা হয়নি। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন আওয়ামী লীগের যেমন চরম ব্যর্থতা আছে, তেমনি আওয়ামী লীগের মিত্র হিসাবে পরিচিত ন্যাপ-কমিউনিস্ট পাটিও ওই ব্যর্থতার ভাগীদার।

বিশেষ করে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর কিছু ক্ষেত্রে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান ছিল বিভ্রান্তিকর। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা কর্মসূচি ছাপিয়ে বিলি করেছেন আর কমিউনিস্ট পার্টি জিয়ার খাল কাটা কর্মসূচিতে অংশ নেয়। আওয়ামী লীগের জন্য ওই সময়টা মোটেও অনুকূল ছিল না।

বলা যায়, আওয়ামী লীগের ওই দুঃসময়ে মতিয়া চৌধুরীর সঙ্গে আমরা কয়েকজন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলাম। ১৯৭৯ সালের ১০ ডিসেম্বর মোট ১৭ জন কেন্দ্রীয় নেতা আওয়ামী লীগে যোগদান করি। মতিয়া চৌধুরী ছাড়াও যোগদানকারী দলে ছিলেন স্থপতি মাযহারুল ইসলাম, স্থপতি আলমগীর কবীর, স্থপতি ইয়াফেস ওসমান, দবিরউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।

মতিয়া চৌধুরী যখন আওয়ামী লীগে যোগ দেন, তখন কোনো প্রত্যাশা নিয়ে তা করেননি। তিনি বুঝেছিলেন, দেশের রাজনীতির চাকাকে যদি মুক্তিযুদ্ধের ধারায় ফিরিয়ে আনতে হয়, তাহলে তার জন্য উপযুক্ত দল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দল এবং গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে এ দলটি। সুবিধাবাদীরা আওয়ামী লীগে আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়নি, তা অবশ্য নয়। কিন্তু মোটা দাগে আমাদের দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক ধারা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিকল্প তৈরি হয়নি। তাই মতিয়া চৌধুরী ছোট দলের বড় নেতা হওয়ার মোহ ত্যাগ করে বরং বড় দলের কর্মী হয়ে দেশের জন্য কাজ করাকে অগ্রাধিকার দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন।

১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তার বিচক্ষণ নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ যেমন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে, তেমনি রাজনীতিতে এসেছে পরিবর্তনের হাওয়া। শেখ হাসিনার এ নতুন পথযাত্রায় মতিয়া চৌধুরী অত্যন্ত বিশ্বস্তভাবে সঙ্গে আছেন। মতিয়া চৌধুরী আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ ফোরাম প্রেসিডিয়াম সদস্য হয়েছেন। আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত সরকারের দুই মেয়াদে তিনি কৃষিমন্ত্রী হিসাবে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বাংলাদেশের কৃষি খাতে যে বড় সাফল্য এসেছে, তা মতিয়া চৌধুরীর উদ্যোগ ও পরিকল্পনার ফল। মতিয়া চৌধুরী শেরপুর থেকে পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

আমাদের দেশে এমপি-মন্ত্রী হলে কেউ সৎ থাকেন না বলে ধারণা তৈরি হয়েছে; কিন্তু মতিয়া চৌধুরীর বিরুদ্ধে অসততার কোনো অভিযোগ নেই। নিজের সুবিধার জন্য রাজনীতি যারা করেন, তাদের মধ্যে মতিয়া চৌধুরী এক উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়, তাই আওয়ামী লীগের দিকে এখন অনেকেই ঝুঁকছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের সুসময়ে নয়, দুঃসময়ে সঙ্গী হয়েছিলেন মতিয়া চৌধুরী। সৎ-ত্যাগী-আদর্শবাদী নেতাদের দলে মূল্যায়ন হয় না বলে কারও কারও যে অভিমান রয়েছে, তা এখন হয়তো কিছুটা দূর হবে মতিয়া চৌধুরীকে সংসদের উপনেতার দায়িত্ব দেওয়ায়।

এক-এগারোর সময় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা কারারুদ্ধ দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেও মতিয়া চৌধুরী বিশ্বাসভঙ্গ না করে তার পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। এখন সংসদ উপনেতা হিসাবেও তিনি বিশ্বস্ততার সঙ্গে শেখ হাসিনার পাশে থাকবেন বলে তার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা হিসাবে আমার বিশ্বাস।

মোনায়েম সরকার : রাজনীতিবিদ, লেখক ও মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন