আসাদ আমাদেরও ভাই
jugantor
আসাদ আমাদেরও ভাই

  বিমল সরকার  

২১ জানুয়ারি ২০২৩, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মা-বাবার রাখা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নামটির চেয়ে ‘শহিদ আসাদ’ শব্দবন্ধটি গোটা বাঙালি জাতির কাছে সমধিক পরিচিত। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারী শহিদ আসাদের প্রকৃত নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (সংক্ষেপে এএম আসাদুজ্জামান)।

মা-বাবা ও পরিবার, শিক্ষা-দীক্ষা ও সংস্কার, চিন্তা-চেতনা ও বেড়ে ওঠা সবকিছুতেই যেন ভিন্নতা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মপ্রচারবিমুখতা। গতানুগতিকতার বাইরে অনেকটা ভিন্ন এক আদর্শ-বৈশিষ্ট্যের আবহে আবর্তিত হয় তাদের গোটা পরিবার।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ এলে সবার আগে মনে পড়ে শহিদ আসাদের কথা। ২০ জানুয়ারি শহিদ হন তিনি। ১৯৬৯ সালের ওই দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে স্বৈরাচারবিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আসাদের এ আত্মত্যাগ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে। ‘খুনের বদলে খুন চাই, আইয়ুব খানের রক্ত চাই’, ‘আসাদের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’, আসাদের মন্ত্র, জনগণতন্ত্র’, ‘আইয়ুব মোনেম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই’-এমন সব স্লোগানে মুখরিত হয় বাংলার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত; দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে আইয়ুববিরোধী ক্রোধের দাবানল।

আসাদ হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রদেশব্যাপী তিন দিনের শোক পালন শেষে ২৪ জানুয়ারি হরতালের ডাক দেয়। সেদিনের মিছিলে পুলিশ আবারও গুলি চালালে ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র মতিউর রহমান প্রাণ হারান। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা শহিদ হলে গণআন্দোলন সর্বাত্মক রূপ নেয়।

আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিদান ও তাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিতকরণ-এ সবকিছুই গণঅভ্যুত্থানপর্বের আবেগ-চেতনা ও বিজয়। ইতিহাসের কেমন বাস্তবতা; আসাদ হত্যার মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের ‘দণ্ডমুণ্ডের মালিক’ কথিত লৌহমানব প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

আসাদের জন্ম ও পৈতৃক ঠিকানা নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রাম। সামনে মসজিদ সুপরিসর বাড়িটি এলাকায় ‘মিয়াজিবাড়ি’ নামে পরিচিত। আসাদের বাবা এমএ তাহের ছিলেন খুবই পণ্ডিত ব্যক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে তিনি ইতিহাস বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে এমএ পাশ করেন।

ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার এক বিরল সমন্বয় ঘটেছিল এমএ তাহেরের মধ্যে। ‘তাহের মৌলভী সাহেব’ নামে তার ব্যাপক পরিচিতি। তিনি ছিলেন নরসিংদীর শিবপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পঞ্চাশের দশকে স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। আর মায়ের নাম মতিজাহান খাদিজা খাতুন। পরহেজগার মা নারায়ণগঞ্জের আইটি স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষিকা। মা-বাবার এমন আদর্শের ছোঁয়ায় এমন সন্তান গড়ে ওঠে।

তাহের-মতিজাহান দম্পতি এমনই পরম সৌভাগ্যবান যে, সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাশেষে ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে প্রত্যেককেই তারা যার যার কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হিসাবে দেখে যেতে পেরেছেন। শহিদ আসাদসহ তাদের দুই ছেলে (ইতিহাস বিভাগ) ও দুই মেয়ে (প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। দুই ছেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে পরবর্তীকালে বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। সবার বড় কেএম খুরশীদুজ্জামান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও তৃতীয় ছেলে এফএম রশীদুজ্জামান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। খুবই গৌরবের কথা যে, আমাদের জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও এর নকশা তৈরিতে বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের সহযোগী হিসাবে দেশীয় প্রকৌশলী রশীদুজ্জামানেরও (শহিদ আসাদের পিঠাপিঠি অগ্রজ) অংশগ্রহণ রয়েছে।

সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রেও যেন খুব যত্ন-মনোযোগ-গুরুত্ব আর স্বাতন্ত্র্য। তাহের-খাদিজা দম্পতি তাদের আটটি সন্তানের নাম রাখেন (ক্রমানুসারে) : কেএম খুরশীদুজ্জামান (খলিলুল্লাহ মোহাম্মদ খুরশীদুজ্জামান), এনএম মুরশীদুজ্জামান (নাসরুল্লাহ মোহাম্মদ মুরশীদুজ্জামান), এফএম রশীদুজ্জামান (ফয়জুল্লাহ মোহাম্মদ রশীদুজ্জামান), এএম আসাদুজ্জামান (আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান; গণঅভ্যুত্থানের বীর শহিদ), এইচএম মনিরুজ্জামান (হাবিবুল্লাহ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান), আনোয়ারা ফেরদৌসী, এএম নূরুজ্জামান (আজিজুল্লাহ মোহাম্মদ নূরুজ্জামান) ও দেলোয়ারা ফেরদৌসী।

শহিদ আসাদের বৃদ্ধ বাবা মারা যান ১৯৯৬ সালে আর রত্নগর্ভা মা আগের বছর ১৯৯৫ সালে। একমাত্র আসাদ ছাড়া সব সন্তানেরই লেখাপড়া, বেড়ে ওঠা ও কর্মোদ্যম সবকিছু স্বচক্ষে দেখে যান তারা। গর্বের কথা যে, তাদের একটি সন্তানের আত্মবলিদানের বিনিময়ে গণঅভ্যুত্থান সফল পরিণতির দিকে এগোয়। পুত্রশোকের দুঃসহ স্মৃতি বহন করে স্বাধীন দেশে আরও অন্তত সাতাশ বছর বেঁচেছিলেন আসাদের শোক-বিহ্বল বাবা-মা।

আট ভাইবোনের মধ্যে আসাদসহ বড় চার ভাই আজ লোকান্তরিত। বেঁচে রয়েছেন চারজন-প্রফেসর এইচএম মনিরুজ্জামান ও ডা. এনএম নূরুজ্জামান (উভয়ে সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত) এবং আনোয়ারা ফেরদৌসী ও দেলোয়ারা ফেরদৌসী (উভয়ে দেশে ও বিদেশে শিক্ষকতা করেছেন)।

শহিদ আসাদ জীবনের বিনিময়ে আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রইলেন। বরেণ্য কবি শামসুর রাহমান রচিত ‘আসাদের সার্ট’-আহা, সে কী কথামালা! আসাদের নামে ঢাকার আসাদ গেটের নামকরণ। নরসিংদীর শিবপুরে সরকারি শহিদ আসাদ কলেজ, শহিদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাইস্কুল, শহিদ আসাদ সরণিসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান-স্থাপনা আসাদের স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১৮ সালে আসাদকে স্বাধীনতা পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করেছে।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত গোটা বাংলায় কী সে উত্তাল দিনগুলো! শহর-বন্দর-গ্রাম সবখানে এক আওয়াজ : ‘আসাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’। এমন চেতনা আর আবেগ-সুখ-দুঃখের ঘটনা পরম্পরার মধ্য দিয়েই তো ১৯৭১ সালে আসে আমাদের স্বাধীনতা। পঞ্চান্ন বছর আগে শহিদ হন আসাদ। আসাদকে কি আমরা মনে রেখেছি আর রাখলে কতটুকু? দীর্ঘদিনের দাবি স্কুলের পাঠ্যসূচিতে শহিদ আসাদের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এতে নতুন প্রজন্ম ভালো করে গণঅভ্যুত্থান, শহিদ আসাদ ও তাদের আলোকিত পরিবারের কথা জেনে অনুপ্রেরণা পেতে পারে।

আসাদ আজ ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু আনোয়ারা ফেরদৌসী ও দেলোয়ারা ফেরদৌসী আর মনিরুজ্জামান ও নূরুজ্জামান নয়, আসাদ আমাদের সবার মাঝে ভাই হিসাবেই আছেন এবং থাকবেন।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

আসাদ আমাদেরও ভাই

 বিমল সরকার 
২১ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মা-বাবার রাখা আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নামটির চেয়ে ‘শহিদ আসাদ’ শব্দবন্ধটি গোটা বাঙালি জাতির কাছে সমধিক পরিচিত। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে আত্মদানকারী শহিদ আসাদের প্রকৃত নাম আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (সংক্ষেপে এএম আসাদুজ্জামান)।

মা-বাবা ও পরিবার, শিক্ষা-দীক্ষা ও সংস্কার, চিন্তা-চেতনা ও বেড়ে ওঠা সবকিছুতেই যেন ভিন্নতা। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আত্মপ্রচারবিমুখতা। গতানুগতিকতার বাইরে অনেকটা ভিন্ন এক আদর্শ-বৈশিষ্ট্যের আবহে আবর্তিত হয় তাদের গোটা পরিবার।

ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ এলে সবার আগে মনে পড়ে শহিদ আসাদের কথা। ২০ জানুয়ারি শহিদ হন তিনি। ১৯৬৯ সালের ওই দিনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে স্বৈরাচারবিরোধী বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আসাদের এ আত্মত্যাগ স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করে তোলে। ‘খুনের বদলে খুন চাই, আইয়ুব খানের রক্ত চাই’, ‘আসাদের রক্ত, বৃথা যেতে দেব না’, আসাদের মন্ত্র, জনগণতন্ত্র’, ‘আইয়ুব মোনেম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই’-এমন সব স্লোগানে মুখরিত হয় বাংলার এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত; দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে আইয়ুববিরোধী ক্রোধের দাবানল।

আসাদ হত্যার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ প্রদেশব্যাপী তিন দিনের শোক পালন শেষে ২৪ জানুয়ারি হরতালের ডাক দেয়। সেদিনের মিছিলে পুলিশ আবারও গুলি চালালে ঢাকার নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র মতিউর রহমান প্রাণ হারান। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা শহিদ হলে গণআন্দোলন সর্বাত্মক রূপ নেয়।

আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিদান ও তাকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিতকরণ-এ সবকিছুই গণঅভ্যুত্থানপর্বের আবেগ-চেতনা ও বিজয়। ইতিহাসের কেমন বাস্তবতা; আসাদ হত্যার মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের ‘দণ্ডমুণ্ডের মালিক’ কথিত লৌহমানব প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

আসাদের জন্ম ও পৈতৃক ঠিকানা নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রাম। সামনে মসজিদ সুপরিসর বাড়িটি এলাকায় ‘মিয়াজিবাড়ি’ নামে পরিচিত। আসাদের বাবা এমএ তাহের ছিলেন খুবই পণ্ডিত ব্যক্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৭ সালে তিনি ইতিহাস বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে এমএ পাশ করেন।

ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষার এক বিরল সমন্বয় ঘটেছিল এমএ তাহেরের মধ্যে। ‘তাহের মৌলভী সাহেব’ নামে তার ব্যাপক পরিচিতি। তিনি ছিলেন নরসিংদীর শিবপুর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পঞ্চাশের দশকে স্থানীয় ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। আর মায়ের নাম মতিজাহান খাদিজা খাতুন। পরহেজগার মা নারায়ণগঞ্জের আইটি স্কুলের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রধান শিক্ষিকা। মা-বাবার এমন আদর্শের ছোঁয়ায় এমন সন্তান গড়ে ওঠে।

তাহের-মতিজাহান দম্পতি এমনই পরম সৌভাগ্যবান যে, সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাশেষে ছয় ছেলে ও দুই মেয়ে প্রত্যেককেই তারা যার যার কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হিসাবে দেখে যেতে পেরেছেন। শহিদ আসাদসহ তাদের দুই ছেলে (ইতিহাস বিভাগ) ও দুই মেয়ে (প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগ) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। দুই ছেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে পরবর্তীকালে বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। সবার বড় কেএম খুরশীদুজ্জামান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও তৃতীয় ছেলে এফএম রশীদুজ্জামান প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। খুবই গৌরবের কথা যে, আমাদের জাতীয় স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও এর নকশা তৈরিতে বিশ্বখ্যাত স্থপতি লুই আই কানের সহযোগী হিসাবে দেশীয় প্রকৌশলী রশীদুজ্জামানেরও (শহিদ আসাদের পিঠাপিঠি অগ্রজ) অংশগ্রহণ রয়েছে।

সন্তানের নাম রাখার ক্ষেত্রেও যেন খুব যত্ন-মনোযোগ-গুরুত্ব আর স্বাতন্ত্র্য। তাহের-খাদিজা দম্পতি তাদের আটটি সন্তানের নাম রাখেন (ক্রমানুসারে) : কেএম খুরশীদুজ্জামান (খলিলুল্লাহ মোহাম্মদ খুরশীদুজ্জামান), এনএম মুরশীদুজ্জামান (নাসরুল্লাহ মোহাম্মদ মুরশীদুজ্জামান), এফএম রশীদুজ্জামান (ফয়জুল্লাহ মোহাম্মদ রশীদুজ্জামান), এএম আসাদুজ্জামান (আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান; গণঅভ্যুত্থানের বীর শহিদ), এইচএম মনিরুজ্জামান (হাবিবুল্লাহ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান), আনোয়ারা ফেরদৌসী, এএম নূরুজ্জামান (আজিজুল্লাহ মোহাম্মদ নূরুজ্জামান) ও দেলোয়ারা ফেরদৌসী।

শহিদ আসাদের বৃদ্ধ বাবা মারা যান ১৯৯৬ সালে আর রত্নগর্ভা মা আগের বছর ১৯৯৫ সালে। একমাত্র আসাদ ছাড়া সব সন্তানেরই লেখাপড়া, বেড়ে ওঠা ও কর্মোদ্যম সবকিছু স্বচক্ষে দেখে যান তারা। গর্বের কথা যে, তাদের একটি সন্তানের আত্মবলিদানের বিনিময়ে গণঅভ্যুত্থান সফল পরিণতির দিকে এগোয়। পুত্রশোকের দুঃসহ স্মৃতি বহন করে স্বাধীন দেশে আরও অন্তত সাতাশ বছর বেঁচেছিলেন আসাদের শোক-বিহ্বল বাবা-মা।

আট ভাইবোনের মধ্যে আসাদসহ বড় চার ভাই আজ লোকান্তরিত। বেঁচে রয়েছেন চারজন-প্রফেসর এইচএম মনিরুজ্জামান ও ডা. এনএম নূরুজ্জামান (উভয়ে সরকারি চাকরি থেকে অবসরপ্রাপ্ত) এবং আনোয়ারা ফেরদৌসী ও দেলোয়ারা ফেরদৌসী (উভয়ে দেশে ও বিদেশে শিক্ষকতা করেছেন)।

শহিদ আসাদ জীবনের বিনিময়ে আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রইলেন। বরেণ্য কবি শামসুর রাহমান রচিত ‘আসাদের সার্ট’-আহা, সে কী কথামালা! আসাদের নামে ঢাকার আসাদ গেটের নামকরণ। নরসিংদীর শিবপুরে সরকারি শহিদ আসাদ কলেজ, শহিদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস হাইস্কুল, শহিদ আসাদ সরণিসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান-স্থাপনা আসাদের স্মৃতি বহন করে দাঁড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১৮ সালে আসাদকে স্বাধীনতা পদকে (মরণোত্তর) ভূষিত করেছে।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা বিধৌত গোটা বাংলায় কী সে উত্তাল দিনগুলো! শহর-বন্দর-গ্রাম সবখানে এক আওয়াজ : ‘আসাদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’। এমন চেতনা আর আবেগ-সুখ-দুঃখের ঘটনা পরম্পরার মধ্য দিয়েই তো ১৯৭১ সালে আসে আমাদের স্বাধীনতা। পঞ্চান্ন বছর আগে শহিদ হন আসাদ। আসাদকে কি আমরা মনে রেখেছি আর রাখলে কতটুকু? দীর্ঘদিনের দাবি স্কুলের পাঠ্যসূচিতে শহিদ আসাদের জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এতে নতুন প্রজন্ম ভালো করে গণঅভ্যুত্থান, শহিদ আসাদ ও তাদের আলোকিত পরিবারের কথা জেনে অনুপ্রেরণা পেতে পারে।

আসাদ আজ ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। শুধু আনোয়ারা ফেরদৌসী ও দেলোয়ারা ফেরদৌসী আর মনিরুজ্জামান ও নূরুজ্জামান নয়, আসাদ আমাদের সবার মাঝে ভাই হিসাবেই আছেন এবং থাকবেন।

বিমল সরকার : অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন