বাংলাদেশের গরিব মানুষের প্রাণের কি কোনো মূল্য নেই?

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বদরুদ্দীন উমর

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বিগত ঈদে লোকজনের বাড়ি যাওয়া-আসার সময় ১৩ দিনে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১,২৬৫ জন আহত হয়েছেন।

অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন নিহত হয়েছেন ২৬ জন! শুধু জুন মাসের ২৩ তারিখেই নিহত হয়েছেন ৫২ জন! এ ছাড়া নৌপথে ১৮টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ২৫ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৫ জন।

ট্রেন দুর্ঘটনা অথবা ট্রেনের ছাদ থেকে পড়ে মৃত্যু হয়েছে ৪১ জনের (Daily Star, June 30, 2018)। লক্ষ করার বিষয়, এত দুর্ঘটনা-মৃত্যু সত্ত্বেও এগুলোতে মৃত্যু হয়নি কোনো বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, লেখক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বা সে ধরনের কোনো ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তির, যার জীবনের দাম আছে। যার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সংবাদপত্রের পাতায় হা-হুতাশ হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার, এভাবে ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনা ও তাতে মৃত্যুর হার প্রতিবছর বেড়েই চলেছে। ২০১৬ সালে নিহত হয়েছিলেন ১৮৬ জন, আহত হয়েছিলেন ৭৮৭ জন।

২০১৭ সালে নিহত হয়েছিলেন ২৭৪ জন, আহত হয়েছিলেন ৮৪৮ জন (Daily Star, June 30, 2018)। এর থেকে স্পষ্টই বোঝা যায়, বাংলাদেশে যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবনতি কী পরিমাণে হচ্ছে।

অথচ এবারের ঈদের আগে সড়ক পরিবহনমন্ত্রী অনেক লম্বা-চওড়া কথা বলে জনগণকে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, ঈদে যাতায়াতকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করার জন্য তারা সবরকম ব্যবস্থাই গ্রহণ করেছেন।

এদের কথাবার্তার অসারতা এ ক্ষেত্রেও উন্মোচিত হয়েছে, যেভাবে সর্বক্ষেত্রে তা হচ্ছে। বড় বড় কথা বলা, লম্বা-চওড়া প্রতিশ্রুতি দেয়ার ক্ষেত্রে এদের জুড়ি নেই। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এসব কথা ও প্রতিশ্রুতির কানাকড়ি দামও নেই।

সড়ক দুর্ঘটনার ব্যাপারটি যে শুধু ঈদের সময়েই দেখা গেল তা নয়। সারা বছর ধরে একই অবস্থা। এমন কোনো দিন নাই যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় ৪/৫ থেকে ৮/১০/১২ জনের মৃত্যু সংবাদ না পাওয়া যায়।

অথচ সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে কোনো কার্যকর পদক্ষেপই নেয় না। যেহেতু জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহিতার কোনো ব্যবস্থা বর্তমান শাসন ব্যবস্থা ও সরকারের আমলে নেই এবং সরকারের ভেতরেও তাদেরকে জবাবদিহি করতে হয় না, এ জন্য তারা বেপরোয়া।

সড়ক দুর্ঘটনার এই আতঙ্কজনক সংখ্যা দেখে সরকারের মধ্যে কোনো চাঞ্চল্য বা দায়িত্বজ্ঞানের সঞ্চার হয়েছে এটা বলা যাবে না, যদিও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দীর্ঘযাত্রায় প্রতিটি বাসে একাধিক চালকের ব্যবস্থা রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের ঘোষণা বিভিন্ন সংকটজনক পরিস্থিতিতে প্রায়ই দিয়ে থাকেন। তার জন্য তার প্রশংসা ও সুখ্যাতিও শোনা যায়। কিন্তু ঘোষণা দেয়ার পর সেটা কার্যকর হচ্ছে কিনা তার তদারকির কোনো ব্যাপার থাকে না।

ঘোষণাকে কথার কথা মনে করে কেউ কিছুই করে না, কোনো পদক্ষেপ নেয় না এবং অবস্থা শুধু আগের মতো চলে এমন নয়, তার আরও অবনতি ঘটে। সড়ক, নৌ ও রেলপথের যাতায়াত ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তা-ই হচ্ছে, যা জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রত্যেক ক্ষেত্রেই হয়ে থাকে।

আগেই বলেছি, ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় যে শত শত লোকের মৃত্যু হয়েছে তার মধ্যে কোনো সরকারি লোক, সরকারি দলের নেতা, সম্পদশালী লোক, বুদ্ধিজীবী, লেখক-সাহিত্যিক, সিনেমা অভিনেতা-অভিনেত্রী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি একজনও নেই।

যদি সে রকম কেউ এই নিহতদের মধ্যে থাকতেন তাহলে ভদ্রলোকদের মধ্যে উত্তেজনা ও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হতো, সংবাদপত্রের পাতা যেভাবে গরম হতো সেটা হয়নি। এ দেশের এটাই অবস্থা।

কাজেই যারা শত শত সংখ্যায় ঈদের সময় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন, তারা গরিব লোক ও প্রধানত শ্রমজীবী গরিব হওয়ার কারণে এই মৃত্যুতে শাসক শ্রেণীর ভদ্রলোকদের এবং সরকারি নেতানেত্রীদের কিছুই এসে যায় না।

এখানে মানুষের প্রাণের মূল্য নির্ধারিত হয় টাকা ও ধন-সম্পদের ভিত্তিতে। কাজেই বাংলাদেশে তাদেরই প্রাণের মূল্য আছে যারা এসবের মালিক। গরিবদের মৃত্যুতে তাদের পরিবার ছাড়া আর কার ক্ষতি?

এই ক্ষতি না থাকার কারণে বড় রকম কোনো ঘটনা ঘটার পর দু-একদিন কিছু কথাবার্তা হওয়ার পর সেদিকে তাকানোর কোনো প্রয়োজন কারও হয় না। মৃত্যু বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়া হয় না।

অথচ যারা বড়লোক, বড় বড় ব্যবসায়ী বা উচ্চপদস্থ লোক, তারা অথবা তাদের পরিবারের কেউ কোনো দুর্ঘটনা বা জঙ্গিদের আক্রমণের মুখে নিহত হলে বছরের পর বছর তা নিয়ে বিলাপ চলতে থাকে। এতে বিস্মিত হওয়ার কিছুই নেই। এটাই আজকের বাংলাদেশ।

যারা টাকা-পয়সাওয়ালা লোক তাদের মৃত্যু হলে তাদের পরিবার পথে বসে না। যে কোনো এ ধরনের মৃত্যু প্রত্যেকের পরিবারের জন্য ক্ষতি ও দুঃখের ব্যাপার। তবে যারা অর্থবান তাদের ক্ষতি এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

কিন্তু যারা গরিব ও শ্রমজীবী তাদের ক্ষতি শুধু এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে তাদের বিপুল অধিকাংশের অর্থনৈতিক জীবনই শেষ হয়ে যায়। তারা পথে বসে। এ কারণে এই গরিবদের প্রাণের দাম আরও বেশি হওয়া উচিত।

কিন্তু দেখা যায় তার উল্টোটাই। এই গরিবদের প্রাণের দাম তাদের পরিবার ছাড়া অন্য কারও কাছে নেই। সরকার বা শাসক শ্রেণী তো তাদের তোয়াক্কাই করে না। তোয়াক্কার কোনো প্রয়োজনই তাদের হয় না।

নির্বাচনের সময় এরা এই গরিবদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তাদের হাত-পা ধরে। নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর ক্ষমতায় বসে তাদেরকেই এরা বুড়ো আঙুল দেখায়।

এ সমাজে গরিব মানুষের প্রাণের কোনো দাম নেই। দাম আছে সেইসব প্রাণের যাদের আছে অর্থসম্পদ। কাজেই প্রকৃতপক্ষে দাম এখানে আছে মানুষের নয়, টাকা-পয়সা-অর্থসম্পদের।

যে মানুষের টাকা ও অর্থসম্পদ আছে, ক্ষমতা আছে, তাদেরই প্রাণ মূল্যবান। তাদের কারও প্রাণ দুর্ঘটনায় গেলে চারদিকে হাহাকার ধ্বনি ওঠে, সরকারের অন্যকিছু না হলেও কিছুটা টনক নড়ে এবং সংবাদপত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কথা শোনা যায়।

কিন্তু শুধু ঈদের সময় নয়, প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সড়ক দুর্ঘটনায় গরিবদের প্রাণ গেলেও এই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ব্যক্তিরা নীরব থাকেন।

তারা নীরব থাকেন গুমের ক্ষেত্রে, আইনবহির্ভূত নানাভাবে হত্যার ক্ষেত্রে, ক্রসফায়ার-এনকাউন্টার ইত্যাদির মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে মাদক ব্যবসার নায়কদের পরিবর্তে এই ব্যবসার মজুর হিসেবে যারা কাজ করে সেই গরিবদের নির্বিচার প্রাণহানির ব্যাপারে।

সমাজের এই ক্ষমতাবান শ্রেণীর লোকরাই হলেন আজকের বাংলাদেশের ভদ্দরলোক, সম্মানিত ব্যক্তি। এদের টাকাকড়ি আছে, ধনসম্পদ আছে, এদের প্রাণের মূল্য আছে।

ঠিক এ কারণেই সড়ক দুর্ঘটনায় বছরে হাজার হাজার গরিবের মৃত্যু হলেও সরকার ও তার সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় এবং তার মন্ত্রী-আমলারা এই মৃত্যু বন্ধের জন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয় না।

যে কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটে সেসব কারণ অতি সুপরিচিত এবং শত শতবার বিভিন্নভাবে আলোচিত। কাজেই এর প্রতিকারও জানা।

কিন্তু যাদের এই প্রতিকার করার কথা, যারা ক্ষমতায় বসে গরিবদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছে ইচ্ছামতো, নানা মিথ্যা কথাবার্তা ও আশ্বাস দিয়ে যেতে যাদের পরোয়া নেই, তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও মিথ্যাচারের শাস্তির কোনো ব্যবস্থা এই শাসন ব্যবস্থা ও সরকারি প্রশাসনে নেই।

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে গরিব শ্রমজীবী মানুষের জীবনের অবস্থার অবনতি ছাড়া অন্যকিছুর সম্ভাবনা নেই। শুধু তাই নয়, গরিব মানুষের প্রাণের কোনো মূল্যও আজ বাংলাদেশে নেই, যে মূল্য কম হলেও ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি আমলে ছিল। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের লেশমাত্র আছে এই দাবির থেকে হাস্যকর ও মিথ্যা আর কী হতে পারে?

০২.০৭.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল