গাজীপুর নির্বাচনের দেহ-ব্যবচ্ছেদ

প্রকাশ : ০৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এ কে এম শাহনাওয়াজ

ছবি: যুগান্তর

ভেবেছিলাম এ সপ্তাহে সদ্যসমাপ্ত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন নিয়ে কিছু লিখব। কিন্তু এর মধ্যে পত্রিকার পাতায় এ বিষয়ে প্রচুর লেখা হয়েছে, হচ্ছে, টিভি টকশোতে চুলচেরা বিচার করছেন অনেকে।

কেউ নিরপেক্ষ অবস্থানে দাঁড়িয়ে আলোচনা-সমালোচনা করছেন। আবার বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা শব্দবাণ ছুড়ছেন একে অন্যের ওপর। এতে পাঠক-দর্শকরা কখনও আলোকিত হচ্ছেন, আবার কখনও বা হচ্ছেন হতাশ অথবা মজা নিচ্ছেন।

এ কারণে আমি আমার লেখার বিষয় থেকে কিছুটা সরে এসেছি। নির্বাচনের আগে থেকে, নির্বাচনের দিনে এবং অধ্যাবধি দুই বিবদমান দল অর্থাৎ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতারা যেসব অভিযোগ করে যাচ্ছেন, অন্যপক্ষ পাল্টা জবাব দিচ্ছেন এসব আমাদের অনেকের জন্যই তাৎপর্যপূর্ণ নয়।

ক্ষমতায় থাকা পক্ষ কী বলবেন, নির্বাচনে কী আচরণ করবেন, সেসব ক্ষমতায় যাওয়া-আসা দলের জন্য নির্দিষ্ট ছকেই বন্দি হয়ে আছে। কৃতকর্মের আয়নায় নিজেদের ছবি দেখলে অযথা বাক্য ব্যয় করতেন না কোনো পক্ষ।

বিরোধী দল নির্বাচনের আগে থেকেই পাহাড়প্রমাণ আশঙ্কার কথা বলবেন, অভিযোগের পাহাড় বানাবেন। নির্বাচনে জিতে গেলে সুর পাল্টাবেন। আর হেরে গেলে কীসব শব্দে শোরগোল শুরু করবেন তা দেশবাসীর মোটের ওপর মুখস্থ। ফলে আজকের আলোচনায় অপ্রয়োজনীয় গৎবাঁধা সওয়াল-জবাব নিয়ে কথা তুলব না।

নানা সূত্রে গাজীপুরের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে। বিভিন্ন পেশার সচেতন মানুষের সঙ্গে রয়েছে বন্ধুত্ব। এদের মধ্যে ঘোরতর আওয়ামী লীগ ও ঘোরতর বিএনপি সমর্থক এবং স্থানীয় নেতাও রয়েছেন।

নির্বাচনী কাজে যুক্ত হওয়া অনেক শিক্ষককেও আমি কাছ থেকে জানি। তাই এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে আমার কৌতূহলও ছিল। আমার ভেতরের প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তির জন্য নিজের মতো করে বোঝার এবং তথ্য সংগ্রহেরও চেষ্টা করেছি।

বাইরের ছবিটি এমন, সরকারি দল চিরায়ত অভ্যাসের মতোই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেছে। বিরোধী দলের অনেক নেতাকর্মীর মনে ত্রাস সঞ্চার করেছে। সরকারি বাহিনী ধরপাকড় করেছে।

গণতন্ত্রের জন্য এসব শুভ নয়, তবু সব পক্ষের নেতারা যেহেতু এ সংস্কৃতি লালন করে এসেছেন তাই এ নিয়ে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ কেন করছেন আমরা বুঝতে পারি না। পৌরসভা অথবা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক কথা নয়।

এসব স্থানীয় নির্বাচনে মেয়র পদাধিকারীদের যতটা দায়বদ্ধতা থাকে, কাউন্সিলর প্রার্থীদের ততটা থাকে না। কাউন্সিলররা যার যার প্রভাব বলয়ের জায়গায় অনেক সময়ই অনাচার করেন। আর এর দায় পড়ে সবার ওপর।

দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন কতটা শক্ত থাকতে পারে তা কমবেশি সবারই জানা। তাই অনেক কেন্দ্রে দাপুটেরা সিল মারবেন এটুকু এখন গা সওয়াই মানতে হবে। তবে মানতে হবে বর্তমান সময়ের বাস্তবতায় পুকুর চুরির সুযোগ নেই।

১০-২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হলে অনেক সময় ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রশ্ন সামনে চলে আসতে পারে। আর যখন ভোটের ব্যবধান হয় লক্ষাধিক, তখন বুঝতে হবে বিজয়ী প্রার্থীর পক্ষে একটি জোয়ার তৈরি হয়েছিল।

২০০৮-এর জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগেই এমনি এক জোয়ার অনুভব করেছিল এ দেশের মানুষ। নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছিল বিএনপির।

দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া জাল ভোটের অভিযোগ ছিল না সেবার। দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া খুব কম ভোটারই ২০০১-এর মতো ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখেনি যে তার ভোট আগেই দেয়া হয়ে গেছে।

এমন ভোট দিতে পেরে মানুষ যখন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছে, তখন নির্বাচনে ধরাশায়ী বিএনপি নেত্রী এবং মুখপাত্ররা নির্বাচনে ‘কারচুপি’ ‘প্রাপ্ত ভোট ভোটারের ইচ্ছের প্রতিফলন নয়’ ইত্যাদি আগে থেকে তৈরি করা সাতপুরোন গৎ প্রচার করে গণতন্ত্র ও দেশবাসী উভয়কে অপমানিত করে যাচ্ছিলেন।

এতে করে দলটি কী কিছু অর্জন করতে পেরেছিল? সে পর্বে নির্বাচনের আগে থেকেই যথেষ্ট হাফহার্টেড ছিল বিএনপি। হারার পরে কী বলবে তার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই জ্যোতিষীর মতো বলে বেড়াচ্ছিল নির্বাচনে কারচুপি হবে।

আর ঠিক নির্বাচনে ধরাশায়ী হওয়ার পর কলের পুতুলের মতোই কারচুপির অভিযোগ করে বেড়াচ্ছিল। সাংবাদিকদের সামনে দু-চারটে ব্যালট পেপার আর ব্যালটের মুড়ি দেখিয়ে বিপুল ভোটে হারাকে ভিন্ন পথে নেয়ার মতো হাস্যকর প্রয়াস গ্রহণের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক মেধার পরিচয় রয়েছে বলে সচেতন মানুষের মনে হয়নি।

এবার গাজীপুরে প্রায় এক লাখ ভোটে হেরেও যখন একইভাবে ভোট জালিয়াতির কথা বলতে থাকে বিএনপি, তখন এ কথা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা কঠিন হয়েছে।

আমরা ক্রমাগত বলে আসছি বিএনপি মুখপাত্রের প্রতিদিনকার সাদা কাগজে লেখা অভিযোগের ফর্দ পড়ার চেয়ে দল গোছানোতে মনোযোগ দেয়া জরুরি ছিল। ঢাকা ও লন্ডনের দ্বৈত শাসনে ক্রমাগতভাবে পিষ্ট হয়ে পড়ছে বিএনপি।

ফলে দলের ভেতর হতাশা বাড়ছে। ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাচ্ছে দলটি। এতদিন বাস্তবতা দেখে বলতাম, বিএনপির বড় সম্পদ দেশজুড়ে অনেক কর্মী-সমর্থক। আর সংকট হচ্ছে দুর্বল নেতৃত্ব। আওয়ামী লীগ ও সরকার এখন শক্ত অবস্থানে।

এর মোকাবেলার জন্য দল শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দেননি বিএনপি নেতৃত্ব। অন্যদিকে দেশজুড়ে নানা তাপ ও চাপ কর্মীদেরও দুর্বল করে দিয়েছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় দেশজুড়ে বিএনপির অন্তঃপ্রাণ কর্মী সমর্থকদের অবস্থানও আর আগের মতো নেই।

এ বাস্তবতার কারণেই বিএনপি নেতারা চার দেয়ালের ভেতর স্যুট-কোট আর সফেদ পাঞ্জাবিতে কেতাদুরস্ত হয়ে কেবল ‘কঠোর আন্দোলনের’ কথা বলেই যাচ্ছেন; কিন্তু পথে নামার সাহস দেখাচ্ছেন না।

গাজীপুরে বিএনপির সংকট তো শুরু হয়েছিল হাসান সরকারকে মেয়র পদে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী করার পর থেকে। নির্বাচনের অনেক আগে থেকে গাজীপুরের অনেক ভোটার- বিশেষ করে বিএনপিপন্থীদের মধ্যে একটি কথাই ভেসে বেড়াচ্ছিল যে ‘বড় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল দল’।

তাদের কারণগুলো এমন : ক. বেশিরভাগ ভোটার মনে করে তরুণ জাহাঙ্গীর আলম গাজীপুরে হাসান সরকারের চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত। মানুষের সমস্যায় ও এলাকার উন্নয়নে তাকে সব সময় কাছে পেয়েছে।

অপরপক্ষে হাসান সরকার বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত। তাছাড়া টঙ্গী অঞ্চলের দিকে তার বাড়ি। অর্থাৎ সিটি কর্পোরেশনের একপ্রান্তে। গণসংযোগের অভাবে অপর প্রান্তের অনেক ভোটার তেমনভাবে হাসান সরকারকে চেনেনও না।

জয়দেবপুর রাজবাড়ীর মাঠ এ জেলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের কেন্দ্রভূমি। এ এলাকার একজন শিক্ষক জানালেন বিগত ৫-৭ বছরে রাজবাড়ীর মাঠে কোনো অনুষ্ঠানে হাসান সরকারকে দেখা যায়নি। খ. আগের বিএনপি প্রার্থী অধ্যাপক আবদুল মান্নান তার তুলনায় অনেক বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। অধ্যাপক মান্নানকে মনোনয়ন না দেয়ায় তার কর্মী-সমর্থকরা হতাশ হয়েছিল।

নির্বাচনেও হাসান সরকারের পক্ষে তেমন সক্রিয় হয়নি তারা। কেউ কেউ জানালেন এই ধারার বিএনপি সমর্থকদের অনেকে গোপনে জাহাঙ্গীর আলমকে সমর্থন দিয়েছিল। গ. এলাকার অনেক বিএনপি নেতারও বিশ্বাস হাসান সরকারের মনোনয়ন বিএনপির দ্বৈত শাসনের ফল।

তাদের অনেকের মতে ‘লন্ডন প্রশাসনের’ অনুকূলে বাণিজ্যের জোরে মনোনয়ন পেয়েছিলেন হাসান সরকার। সত্য-মিথ্যা যাই হোক-এর একটি বিরূপ প্রভাব পড়েছিল একাংশ ভোটারের মধ্যে।

ঘ. অভিজ্ঞতায় এবং সরকারি আচরণে দেশের সব অংশের মতো গাজীপুরবাসীও মনে করে সরকারের সদিচ্ছা না থাকায় আগের মেয়র কাজ করতে পারেননি। এখন সরকার আরও শক্তিশালী।

ফলে বিএনপি প্রার্থী পাস করলেও এলাকার উন্নয়ন তেমন হবে না। এ জায়গায় অনেকটা এগিয়ে ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। ঘ. অনেক কেন্দ্রে বিএনপির পক্ষে পোলিং এজেন্ট পাওয়া যায়নি। কথাটি অসত্য নয়।

কতগুলো কারণ এখানে কাজ করেছে। সরকারে থাকায় নৌকা পক্ষের শক্তি-সামর্থ্য বেশি। এজেন্ট না থাকার পেছনে পেশিশক্তির তাপ-চাপ ছিল। কিন্তু অধিকাংশের ক্ষেত্রে তা ছিল না। দায়সারা গোছের পোলিং এজেন্ট ছিল ধানের শীষের পক্ষে।

অনেক পোলিং এজেন্ট হাসান সরকারের মনোনয়নে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তারা শেষ পর্যন্ত ঝুঁকি নিতে চাননি। অনেকে জাহাঙ্গীর আলমের জয়ের ব্যাপারে যে জোয়ার চলছিল এর ওপর বিশ্বাস রেখে নিজেদের চাননি ঝামেলায় জড়াতে।

যদিও গণতান্ত্রিক পরিবেশ রক্ষার জন্য এর অনেক কিছুকেই অনুমোদন দেয়া যায় না, তবে এমনটিই হয়েছিল বলে গাজীপুরের অধিকাংশ মানুষ মনে করে। তবে অপর পিঠটি নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ পক্ষের একটি বড় ব্যর্থতাকে আড়াল করা যায় না। গাজীপুরবাসী যেখানে জাহাঙ্গীর আলমের বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার বিষয়ে নিশ্চিত ছিল এবং পরে তা সত্য প্রমাণিত হয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তা বুঝতে পারলেন না কেন?

যদি তা বুঝতেন তবে কৌশলে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং করার বিরোধীদলীয় অভিযোগ থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সমালোচনা তাদের হজম করতে হতো না। নির্ভার হওয়ায় তাদেরই তো উচিত ছিল সতর্ক দৃষ্টি রাখা যেন কোনো দুর্নাম না হয়।

নির্বাচন কমিশনকে সবুজ সংকেত দেয়া, যাতে কোথাও দলীয় কর্মী-সমর্থকরা উদ্ধত আচরণ করলে কার্যকর ভূমিকা রাখতে দ্বিধা না করে। কিন্তু এসব না করতে পারায় কিছুটা কন্টকমালা গলায় ঝুলাতেই হয়েছে। দলের ভেতর যতক্ষণ গণতান্ত্রিক আচরণ স্পষ্ট না হবে, ততক্ষণ আত্মবিশ্বাস তৈরি হতে পারবে না।

সবকিছুর পরও বিএনপির এ সময়ের সব রাজনৈতিক আচরণ ও সিদ্ধান্তের ক্রমাগত ব্যর্থতাকে আড়াল করা যাবে না। একটি প্রায় ঘরবন্দি দল খাঁচায় বন্দি তোতা পাখির মতো প্রতিদিন যেভাবে রেকর্ড করা অভিযোগবার্তা পড়ে যাচ্ছেন, তাতে বিভ্রান্ত হচ্ছেন হাজার হাজার নেতাকর্মী।

দলের ভেতর অন্তঃক্ষরণ চলছে। এ থেকে বেরোতে হলে প্রথম লন্ডন-বাংলাদেশ দ্বৈত শাসননীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। যত প্রতিকূলতাই থাক, মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় হতেই হবে। এখন দলের যে ছন্নছাড়া দশা, তাতে দেশজুড়ে দল পুনর্গঠন ছাড়া রাজনীতিতে বিএনপি এগিয়ে যাওয়ার শক্তি ক্রমেই হারাতে থাকবে।

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]