রোহিঙ্গা সংকট কি জটিল থেকে জটিলতর হতে যাচ্ছে?

প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  করীম রেজা

ফাইল ছবি

বাংলাদেশ বর্তমান বিশ্বে অনেক আলোচিত ও পরিচিত একটি দেশ। উন্নয়নের নানারকম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অন্য অনেক উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় ঈর্ষণীয়ভাবে ঊর্ধ্বগামী।

রাখাইন থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বিশ্বে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের ওপরে চাপিয়ে দেয়া এ পর্যন্ত মানুষের তৈরি সংকটের মধ্যে প্রধান ও নিকৃষ্টতম উদাহরণ।

এ সংকট সৃষ্টিতে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই বিষয়টি নিয়ে লড়াই করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সর্ববৃহৎ আশ্রয় শিবির তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে। দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের জেলা এখন প্রায় ১২ লাখ রাষ্ট্রহীন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আশ্রয়ের স্থান।

১১০০ হেক্টর জায়গা নিয়ে ৪০০০ একর সবুজ বনভূমি, টেকনাফ ও হিমছড়ির সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং জাতীয় উদ্যান সম্পূর্ণভাবে নষ্ট করে রোহিঙ্গাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এর মধ্যে ৫০-এর বেশি পাহাড় ধসের ঘটনায় এক শিশু নিহত হয়েছে, ৩০ জনের অধিক হয়েছে আহত। সম্প্রতি হঠাৎ দলবদ্ধ আক্রমণে ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে সক্ষম শিবিরের দায়িত্বে থাকা দু’জন মাঝি নিহত হয়েছেন।

রোহিঙ্গা শিবিরে এ সন্ত্রাস ও আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টির কারণ উদ্ঘাটনের জন্য তদন্ত জরুরি।

সম্প্রতি ভোলায় বাংলাদেশি পাসপোর্টসহ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ আটক হয়েছে। ভারতীয় ভিসায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে ভারতে যাওয়ার সময় কয়েকজন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ফাঁকি দিয়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ বাংলাদেশি পাসপোর্ট সংগ্রহ করে এর মধ্যে বিদেশে গিয়েছে। রোহিঙ্গাদের অবস্থান অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও দীর্ঘায়িত হবে।

স্থানীয় সামাজিক সমস্যা বেড়েছে, বাড়তে থাকবে। দরকার স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি আশু উদ্যোগ। এতে ভবিষ্যতে উদ্ভূত সংকট মোকাবেলা সহনীয় পর্যায়ে থাকবে।

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার অনুমান, শিবিরের পরিবেশ বাসযোগ্য করতে কমপক্ষে ৯৫১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান অর্থের প্রয়োজন। প্রতিদিন ১৬ মিলিয়ন লিটার পানি, প্রতি মাসে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার মেট্রিক টন খাদ্য, অর্ধ লাখের বেশি ল্যাট্রিন তৈরি এবং শিবিরে উৎপাদিত প্রায় সাড়ে চার লাখ টন বর্জ্য নিষ্কাশন ইত্যাদির প্রয়োজন রয়েছে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, এসব কাজে অর্থের সংস্থান রয়েছে ২১ জুন ২০১৮ পর্যন্ত মাত্র শতকরা ২২ ভাগ। বিশ্বব্যাংক ৪৮ কোটি এবং এডিবি ১০ কোটি ডলারের সাহায্য ঘোষণা দিয়েছে।

আরও আগেই জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা জানিয়েছিল, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সাহায্যপ্রাপ্তি অনিশ্চিত। সংকট দীর্ঘমেয়াদি হলে সমস্যার প্রতি আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই নিুগামী হতে বাধ্য।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বব্যাপী সুনাম অর্জন করেছে। তাদের জন্য যখন অন্যান্য রাষ্ট্রের সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া হচ্ছিল সেই সময় বাংলাদেশ তার সীমান্ত শর্তহীনভাবে খুলে দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।

এরকম মতপ্রকাশ করেছেন জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার ফিলিপ গ্রান্ডি। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংকের প্রধান জিম ইয়ং কিম এবং ইউএনএফপি’র এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নাতালিয়া কানেমের সঙ্গে তিনি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেন।

তাদের আগমন সমস্যার বহুমাত্রিক গুরুত্ব ও ভয়াবহতা প্রচারে বিশেষ মাত্রা ও মর্যাদা দিয়েছে।

কয়েকদিন আগে মানবাধিকার সংস্থার চিকিৎসক দল ফরেনসিক পরীক্ষায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের প্রমাণ হাজির করেছে। এর মধ্যে কানাডা ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সুনির্দিষ্টভাবে রোহিঙ্গা নির্যাতনের অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকা প্রকাশ এবং তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।

মিয়ানমার সরকার সেনাবাহিনীর কয়েকজনকে কোনো কারণ নির্দেশ ছাড়াই চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। পাশাপাশি মিয়ানমার শুরু থেকেই রাখাইনে অত্যাচার নির্যাতনের কথা আগাগোড়া অস্বীকার করে আসছে।

মিয়ানমার কখনই কোনো চুক্তির প্রতি অবিচল আস্থা রাখেনি। এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তিনটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাস্তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কোনো উদ্যোগ মিয়ানমার নেয়নি।

সম্প্রতি মিয়ানমার জাতিসংঘের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তিতে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং অবাধ চলাচলের বিধিনিষেধ নিরসনের কোনো বক্তব্য রাখা হয়নি। চুক্তিটি জনসমক্ষে প্রকাশও করা হয়নি।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ এখনও রাখাইনে তৈরি হয়নি।

রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেয়া হবে- মিয়ানমার মুখে এ কথা বললেও বাস্তবে এ ব্যাপারে তার আন্তরিকতা ও সদিচ্ছার অভাব আছে। প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের শূন্যরেখায় এখনও ৪ হাজারের অধিক রোহিঙ্গা নারী-শিশু-বৃদ্ধ অবস্থান করছে।

তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের কোনো আগ্রহ-উদ্যোগ নেই। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের পর তাদের অবশিষ্ট ঘরবাড়ি, জমিজমাসহ সবকিছু বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে।

উপরন্তু, রাখাইনে রয়টার্সের দু’জন সংবাদকর্মীকে আটক করা হয়েছে সংবাদ সংগ্রহের অপরাধে। সম্প্রতি তাদের বিচারকার্য শুরুর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার সদিচ্ছা থাকলে মিয়ানমার শূন্যরেখায় থাকা নাগরিকদের সর্বাগ্রে ফিরিয়ে নিতে পারত। রয়টার্সের সাংবাদিকদের মুক্তি দিত। শুধু এ দুটো ঘটনাই রোহিঙ্গাদের কখনই রাখাইনে ফিরিয়ে না নেয়ার আশঙ্কা স্পষ্ট করছে।

অনেকেই মনে করেন চীন, রাশিয়া ও ভারতের সহযোগিতার কারণেই মিয়ানমার সর্বকালের জঘন্য অপরাধ করেও অস্বীকার করার মতো সাহস ও স্পর্ধা দেখাতে পারছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উভয়ভাবেই সমস্যা সমাধানের কথা বলেছেন। এতদিন চীন একমাত্র দ্বিপাক্ষিক সমাধানের কথা বলেছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রথম যে চুক্তি হয় তার অন্তরালে চীনের বিশেষ ভূমিকা ছিল এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত। চীনা রাষ্ট্রদূতের এ কথা যদি মেনে নিতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতামত, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ প্রধানসহ বিভিন্ন প্রতিনিধিদলের সফর, বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান- সবকিছু মিলিয়ে চীন সরকারও উপলব্ধি করছে সমস্যাটি বিশ্ববাসীর কাছে ‘গায়ের জোরে’ খুব বেশিদিন লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।

চীন, সু চি এবং মিয়ানমারের সামরিক অধিকর্তারা তাদের অবস্থান বদলেছেন অথবা বদলানোর পাঁয়তারা করছেন।

বাংলাদেশের উচিত হবে পরিস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। সমগ্র বিশ্ব বাংলাদেশের পক্ষে। তবে এক বছর হতে চলল সমস্যার কোনো অগ্রগতি নেই।

ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমস্যা বিবেচনায় রেখে রোহিঙ্গাদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা দরকার। সবাই একবাক্যে স্বীকার করে, সমস্যাটি মিয়ানমার তৈরি করেছে, সমাধানের দায়িত্বও এককভাবে তাদের।

বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সমস্যার চিরস্থায়ী সমাধানের জন্য যা কিছু করা দরকার এর সবই আন্তর্জাতিক সমাজ ও জাতিসংঘকে সঙ্গে নিয়ে করতে হবে।

১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব রহিত করে। তখন কেউ সামান্যতম প্রতিবাদ করেনি। প্রতিবেশী বাংলাদেশ বিষয়টিকে গুরুত্বহীন মনে করায় আজ ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার বোঝা চেপেছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য এ বোঝা বয়ে চলতে হতে পারে বলেও অনুমান অনেকের।

মাটির অধিকার, জন্মের অধিকার কেউ, কোনো দেশ, কোনো রাষ্ট্র বা কোনো গোষ্ঠী কোনো আইনের মাধ্যমে কেড়ে নিতে পারে না। কেউ তা করলে সেই আচরণ বর্বর ও অমানবিক।

রোহিঙ্গাদের বেলায় তা-ই হয়েছে। কয়েক প্রজন্ম রাখাইনে জন্মগ্রহণ ও বসবাস করার পরও অন্যায়ভাবে তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর প্রতিবাদ করা উচিত ছিল সমগ্র বিশ্ববাসীর, কিন্তু তা করা হয়নি।

গেল সপ্তাহে জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘রোহিঙ্গা পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রতি সংহতি প্রকাশ যথেষ্ট নয়।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রকৃত সহযোগিতা দরকার। ...রাতারাতি এ সমস্যার সমাধান হবে না।’ তুরস্কে অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গাবিষয়ক আলোচনায় রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলা হয়েছে।

মিয়ানমারের সঙ্গে আঁতাত করে কয়েকটি দেশ বিশ্বমানবতার চরম ক্ষতিসাধনে তৎপর। একজোট হয়ে বিশ্ববাসীকে তা বন্ধ করতে হবে। কানাডার রোহিঙ্গাবিষয়ক দূত বাংলাদেশ সফর করছেন।

নিকট ভবিষ্যতে আরও অনেক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার সফরের কথা আছে। আইসিসি মিয়ানমারের জাতিগত নিধনের বিচার প্রক্রিয়ার প্রাথমিক কাজ শুরু করতে যাচ্ছে।

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের দুটো দিক স্পষ্টরূপে আলাদা গুরুত্ব বহন করে : ১. রোহিঙ্গা নাগরিকত্ব, ২. জাতিগত নিধনে জড়িতদের বিচার। দুটো বিষয়ের মীমাংসা ভিন্নভাবে হওয়া জরুরি।

দুটো দাবি একত্রে উত্থাপনের কারণে প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই গৌণ বলে বিবেচিত হয়। তাই মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে কৌশলের পর কৌশলের দ্বারা কালক্ষেপণ করছে এবং করবে।

সমস্যাটি বাংলাদেশের ওপর চেপেই থাকবে। ভোগান্তি একমাত্র বাংলাদেশেরই হবে। তাই বাংলাদেশকে প্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধানের ওপর জোর দিতে হবে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অচিরেই মিয়ানমার সফরে যাবেন। সফরে গিয়ে তিনি কী করবেন জানা না গেলেও নানারকম অনুমান করা যায়। সফররত ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে তারা প্রি-ফেব্রিকেট উপায়ে ঘরবাড়ি বানাচ্ছেন।

বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তাও অব্যাহত রাখবেন। চীনা রাষ্ট্রদূতের প্রত্যাবাসনবিষয়ক মন্তব্যের জের ধরে আমাদের এখন অপেক্ষার পালা।

প্রথম চুক্তির আগেও ভারতীয় ও চীনা কূটনীতিকদের ব্যস্ততা ছিল দেখার মতো। পরে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে মিয়ানমারের একান্ত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছিল। এবারও যদি সেরকম কিছু হয়, তাহলে তা বাংলাদেশ বা রোহিঙ্গা কারও জন্যই সুফল বয়ে আনবে না।

করীম রেজা : কবি, শিক্ষাবিদ

[email protected]