সফল হোক শিশু-কিশোর আন্দোলন

  স্বপ্না রেজা ০৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সড়কে অ্যাম্বুলেন্স যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে শিক্ষার্থীরা

শেষ পর্যন্ত শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামল। এ এক কঠিন সত্য। তারা উত্তাল প্রতিবাদে পুরো শহরকে অচল করে দিল। এ আন্দোলন বাসচাপায় সহপাঠীর মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে, হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে, নিরাপদ সড়কের দাবিতে।

কচি কচি প্রাণগুলো বুঝে গেছে, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য মুখ খুলতে হবে। শাসককে বুঝিয়ে দিতে হবে তারা ক্ষুব্ধ। অন্যায় সহ্য করার মতো মানসিকতা তাদের নেই।

তারা আরও বুঝিয়ে দিল, মন্ত্রী চাইলেই বিদ্রূপ করতে পারেন না। বাংলাদেশের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম এমন শিশু-কিশোর আন্দোলন, এই বয়সের জনগোষ্ঠীর আন্দোলন। বাংলাদেশের জন্মটাই তো পাকশাসকের বর্বরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।

সেই দেশের শিশু-কিশোররা তো এমন আন্দোলনের মানসিকতারই হবে। দেয়ালে পিঠ ঠেকলে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, তা তো তারা পূর্বসূরিদের দেখেই শিখেছে।

কিন্তু ভাবছি, এমন কোনো কথা ছিল কিনা, একটি স্বাধীন বাংলাদেশে এমন একটি আন্দোলন আমাদের দেখতে হবে, যে দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি রাজনৈতিক দল শাসন করে, যে দেশ দাবি করে শিশুবান্ধব একটি দেশ, নারীবান্ধব দেশ, যে দেশে শিশু-কিশোরদের নিয়ে ভাবনার অনেক বুদ্ধিওয়ালা ব্যক্তি-গোষ্ঠী আছেন, সংগঠন আছে ইত্যাদি। সবকিছুকে পেছনে ফেলে শিশু-কিশোররা বুঝিয়ে দিল, যা আছে বা ছিল, তা নেহায়েতই অপ্রতুল, প্রাণহীন আবর্জনা। ওসবে কচিপ্রাণ রক্ষা পায়নি, পায় না। কচিপ্রাণের আর্তচিৎকার কেউ শুনতে পায় না।

বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু নিয়ে কথা বলার সময় ‘নিজের অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের জন্য’ দুঃখ প্রকাশ করেছেন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। এই ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ ক্ষমাসুন্দরভাবে দেখতে সবার প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। নৌ মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ আর অনিচ্ছাকৃত ভুল এমন একটি মর্মান্তিক ঘটনায় একজন সুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তি, রাষ্ট্র্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে কীভাবে করেন, সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। আর তিনি তার এই আচরণকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ না করে যদি তিনি নিজেই জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতেন, তাহলেও একটা কথা থাকত। কারণ, মানুষই তো ভুল করে।

যেটুকু জেনেছি, মন্ত্রীর এমন অশোভন আচরণের জন্য এই দুঃখ প্রকাশের নেপথ্যে ছিল মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অসন্তোষ। ধন্যবাদ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। অন্তত বেফাঁস বক্তব্য, অশোভন আচরণের জন্য তিনি একজন বেপরোয়া মন্ত্রীকে সংযত হতে, দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য করেছেন।

শুধু এই মন্ত্রীই নয়, সরকারের ভেতর বেফাঁস, উদ্ভট কথা বলবার মতো অনেক মন্ত্রীই আছেন, যারা বেফাঁস, উদ্ভট কথা বলেন, বলেছেন। এরা মূলত ক্রমাগত সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করে চলেছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিরোধী দলের চেয়েও নিজেরাই নিজেদের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। সরকারের ক্ষতি ডেকে আনছেন।

সরকার যদি সাধারণ মানুষকে প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেন, দেখেন, তাহলে তার করুণ পরিণতি, পরিণাম শুধু সেই সরকারকে বিপর্যস্ত করে তা নয়, দেশকেও করে। ইতিহাসে অনেক নজির আছে তার।

দুভার্গ্য যে, এই সত্য অনুধাবন করার মতো বিবেকসম্পন্ন মাথার আকাল রয়েছে বর্তমান সরকারের ভেতর। অথচ এই সরকার বঙ্গবন্ধুর আদর্শে পরিচালিত বলে দাবি করছে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ছিটেফোঁটা ধারণ করার ক্ষমতা অনেকেরই নেই। কথাটা শুনতে খারাপ লাগলেও, সত্য। আবার রাজনীতিতে বেফাঁস মন্তব্য, মিথ্যেচারিতা ও পরিহাসের সংস্কৃতি কিন্তু নতুন নয়।

শুধু যে এই মন্ত্রী এমন বেফাঁস কথা বললেন, তা নয়। অতীতে অন্য রাজনৈতিক দল যখন ক্ষমতায় ছিল, সেখানেও এমন বেসামাল কথার দৃষ্টান্ত আছে। আর এসব কারণে বিভিন্ন সময়ে ফুঁসে উঠেছে সাধারণ মানুষ। আজকের যে শিশু-কিশোর আন্দোলন, তা তারই ধারাবাহিক ফল। এতদিন এই সেক্টরই বাদ ছিল আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে। আজ সেটা পূরণ হল ইতিহাসে। নতুন ইতিহাস বাংলাদেশের মানচিত্রে এঁকে দিল ওরা।

শিশু-কিশোর কী চায় বা চেয়েছিল, যদি হৃদয় দিয়ে তা অনুধাবন করত সরকার, তাহলে এই ছোট্ট ছোট্ট কচি হাত-পা, এত বড় বড় সড়ক অচল করে দিত না। আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন পুরো শহর অচলে দাঁড়িয়ে গেছে। শহরের প্রায় সব শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী রাস্তায় চার দিন অবস্থান নিয়েছে।

ভাবুন পাঠক, রাজনৈতিক ব্যানার ছাড়া, পিঠে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে ওরা কত পরিষ্কারভাবে ওদের কথা বলছে। একজন অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতাও তো এত পরিষ্কারভাবে দলের কথা বলতে পারেন না, দেশের কথা বললেন না।

যেদিন ওদের সহপাঠী বাসচাপায় মারা গেল, সেদিন তো সরকারের পক্ষ থেকে ওদের পাশে গিয়ে কেউ দাঁড়াতে পারতেন, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারতেন। ওদের বুকে জড়িয়ে নিতে পারতেন। ওরা তো এমন কাউকে পাশে পায়নি, কারোর বুকে মাথা রেখে কান্নার সুযোগ পায়নি।

ওদের কষ্টের ভাগাভাগি হয়নি। ওদের হাহাকার কাউকে কাঁদায়নি। উপরন্তু, বিদ্রূপের হাসি দেখেছে, মন্তব্য শুনেছে একজন মন্ত্রীর। আমরা যারা শাসন ব্যবস্থায় আছি, তারা এটুকুন বুঝিনি, কীভাবে ক্ষতকে সারিয়ে তুলতে হয়, ব্যথাকে ভুলিয়ে দিতে হয়। এসব সম্ভবত প্রমাণ করে দেয়, এই রাষ্ট্র বরাবরই রাজনৈতিক দলের, সাধারণ মানুষের নয়, এমন কী শিশুর নয়। এখনও নয়, কোনোদিনও নয়, ছিলও না।

রাষ্ট্র যদি শিশু-কিশোর-তরুণদের অভিভাবকের রূপে আত্মপ্রকাশ করতে না পারে, শাসকের মতো আচরণ করে, তাহলে নিঃসংকোচে বলতে পারি, ভবিষ্যৎ বলতে যে স্বপ্ন আমরা দেখছি, তা দুঃস্বপ্ন হয়েই থাকবে। কখনোই স্বপ্নপূরণ হবে না, হয়নি।

স্কুল-কলেজ ইউনিফর্ম পরে, পিঠে স্কুলব্যাগ ঝুলিয়ে সড়কে নেমে সহপাঠীর হত্যার বিচারের দাবি, নিরাপদ সড়কের দাবি নিছক দাবি নয়- এটা বিরাট কিছুর ইঙ্গিত দেয়। প্রশ্ন হল, আমরা সেটা বুঝি কিনা। হরলিকস খেয়ে মোটা তাজা হওয়ার বিজ্ঞাপন দেখাবার দিন বোধহয় শেষ। কিংবা মোবাইল ফোন কোম্পানির রাতের ফ্রি টকটাইমে আকৃষ্ট করার সময়ও বোধহয় শেষ।

ওরা চোখের সামনে দেখেছে সহপাঠীর মর্মান্তিক মৃত্যু, দেখেছে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, শুনেছে মন্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল বিদ্রূপ। ওদের ভেতরের কোমল প্রাণ কঠিন রূপ ধারণ করেছে। সেখানে বিলাসিতা নেই, বাস্তবতা আছে। হঠাৎ মনে হল ১৯৭১ সালে এই শিশু-কিশোররা থাকলে নির্ঘাত মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ত। আমরা পেতাম আরও শিশু-কিশোর মুক্তিযোদ্ধা।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি টিভি সংবাদের সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়েছে। বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার। আমরা আশা করব, এই শিশু-কিশোরদের দাবি পূরণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা নিশ্চিত হবে। আর যারা নির্বিচারে মানুষ হত্যায় লিপ্ত হন, যারা তাদের প্রশ্রয় দেন, সবার কঠিন শাস্তির বিধান কার্যকর হবে। এই দেশ হোক সবার, প্রতিটি শিশু-কিশোরের। একজন মা হিসেবেই বলছি।

স্বপ্না রেজা : প্রাবন্ধিক

ঘটনাপ্রবাহ : বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter