মিঠে কড়া সংলাপ

তাদের অবশ্যই ধন্যবাদ দেয়া উচিত

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন

ভেবেছিলাম সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে আর কিছু লিখব না। কারণ কাজটিকে একটি পণ্ডশ্রম হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম। আবার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে খোদ মন্ত্রী-মিনিস্টাররা যা বলা শুরু করেছিলেন তাতে করেও মনে হয়েছিল এসব নিয়ে আর না লেখাই ভালো। যেমন, যে কলেজছাত্রটি প্রথমে হাত হারিয়ে পরে প্রাণ হারিয়েছেন তার সম্বন্ধে বলা হয়েছিল, ‘বাসে উঠে যথাস্থানে হাত রাখা যাত্রীর দায়িত্ব।’

অর্থাৎ কোনো যাত্রী অসাবধানতাবশত একমুহূর্ত হাতটা একটু দরজা-জানালার বাইরে রাখলেই অন্য একটি বাস এসে তার হাতটি কেটে নিয়ে যাবে এবং তাতে করে ভুক্তভোগীরই দোষ হবে! বাস ঘেঁষে অন্য একটি বাসের ড্রাইভার যে ছোঁ মেরে হাত-পা নিয়ে যাবে, তাতে দোষের কিছুই নেই! মন্ত্রী-মিনিস্টারদের এসব কথা শুনে হতাশ হয়ে ভেবেছিলাম, অতঃপর এ দেশে পরিবহন শ্রমিকরাজ আরও দৃঢ়ভাবে জেঁকে বসল এবং এসবের প্রতিকার করার কেউ অবশিষ্ট থাকল না।

কিন্তু না, আমার সে ধারণা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে অপর একটি ঘটনায় একদল শিশু-কিশোর এগিয়ে এলেন। একটি বাসের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একদল শিক্ষার্থীর ওপর যখন এ কোম্পানির অন্য একটি বাস এসে অপর বাসটির কোলঘেঁষে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর বাজপাখির মতো আছড়ে পড়ে ওইসব শিক্ষার্থীর নরম দেহ পিষ্ট করে দিল এবং সেখানে দিয়া খানম মিম এবং আবদুল করিমকে নির্মমভাবে হত্যা করে আরও অনেককে গুরুতর আহত করল, তখন তাদের বয়সী শিশু-কিশোররাই একহাত দেখিয়ে দিলেন।

এরপর বাসের বাইরে হাত রাখার অজুহাতে প্রাণ হারানো কলেজছাত্রটিকে দোষারোপ করা মন্ত্রী মহোদয়েরও সুর পাল্টে গেল! শিশু-কিশোরদের আন্দোলনের প্রচণ্ডতায় তিনিও বলতে বাধ্য হলেন, ‘দুর্ঘটনার নামে এভাবে মশা-মাছির মতো মানুষ হত্যা চলতে দেয়া যায় না।’ এরই নাম বোধহয় ‘ঠেলার নাম বাবাজি’। অথচ তিতুমীর কলেজের ছাত্রটিকে হত্যার পর বা গোপালগঞ্জে অপর একটি ছাত্রের পা নেয়ার পর তার বক্তব্যে আমরা হতাশ হয়েছিলাম। কারণ সে সময় তার কথাবার্তা পরোক্ষভাবে নয় বরং প্রত্যক্ষভাবেই খুনি ড্রাইভারদের পক্ষে গিয়েছিল। যা হোক, অবশেষে আমাদের কিশোর সন্তানেরা এ ক্ষেত্রে যা দেখিয়ে দিলেন, তাও এ দেশে ইতিহাস হয়ে থাকবে।

রাস্তায় দাঁড়িয়ে তারা দেখিয়েছিলেন এ দেশের অর্ধেক ড্রাইভারেরও লাইসেন্স নেই, অর্ধেক গাড়িরও কাগজপত্র ঠিক নেই। সবই চলছিল টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে। যুগ যুগ ধরে ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করে এ দেশে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা যে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে রেখেছেন, আমার কিশোররা তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন। এ অবস্থায় আমার মনে নতুন করে আশার সঞ্চার হল। মনে হল, কিশোর বয়সী এই সন্তানরা যদি বৃষ্টিবাদল-দুর্যোগ উপেক্ষা করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে গাড়ির কাগজপত্র, ড্রাইভারের লাইসেন্স চেক করতে পারেন, তাহলে আমার মুরোদ হাতের কলমটি নিয়েই বা বসে থাকি কেন? আমারও তো কাজ, আমারও তো দায়িত্ব হল লেখালেখি করে দেশ ও জাতিকে জাগ্রত করা,

সরকারকে সতর্ক করা! তাই ওইসব শিশু-কিশোর যখন বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ট্রাফিক পুলিশের কাজ নিজেরা করতে থাকল, আর চিৎকার করে বলতে থাকল, ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, তখন তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে একটু আদর করে দিতে ইচ্ছা হয়েছিল। যদিও তা পারিনি, কিন্তু ১ আগস্ট পল্টনে গিয়ে কাজ শেষে ফেরার সময় যখন প্রচুর দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে এমন একদল শিক্ষার্থীর অবস্থানস্থল অতিক্রম করছিলাম, তখন মনেপ্রাণে তাদের আশীর্বাদ করেছিলাম।

ঘরে ফেরার শত দুঃখ-কষ্ট, যন্ত্রণা ভুলে কবির ভাষায় বলেছিলাম, ‘ওরে নবীন, ওরে সবুজ, ওরে কাঁচা, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাঁচা’। কারণ এ দেশে যারা পরিবহন শ্রমিকদের নেতৃত্ব দেন, পরিবহন সেক্টর থেকে চাঁদাবাজি-তোলাবাজি করেন, ঘুষ আদায় করেন, সেসব শ্রমিক, মালিক, নেতা, সরকারি কর্মকর্তাকে আধমরা বললেও কম বলা হবে। আসলে তো তারা গলে পচে নষ্ট হয়ে গেছেন। তারা প্রকাশ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজি করেন, ঘুষ আদায় করেন। একজন পরিবহন মালিক নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত অর্থে তার গাড়িটি

ড্রাইভারের কাছে লিজ দিয়ে দিচ্ছেন। আর ড্রাইভার সমিতির চাঁদা প্রদান, নেতাকে অর্থ প্রদান, ট্রাফিক পুলিশকে ঘুষ প্রদান ইত্যাদির মাধ্যমে বেপরোয়া গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে গাড়ি চালাতে ড্রাইভারের আইনানুগ লাইসেন্সের দরকার হচ্ছে না, গাড়ির কাগজপত্রের দরকার হচ্ছে না। কারণ সবই চলছে টোকেন বাণিজ্যের মাধ্যমে।

এভাবে যুগ যুগ ধরে ঘুঘুরা যখন ধান খেয়ে যাচ্ছিল, তখনই দেশের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে একদল কিশোর মাঠে নেমেছিলেন। যদিও শেষে আরও একদল ঘুঘু তাদের অপব্যবহারের চেষ্টা করেছিল, সে কথায় পরে আসছি, কিন্তু তাতে করে আশীর্বাদ হিসেবে নেমে আসা ওই কিশোরদের কৃতিত্ব এতটুকুও ম্লান হয়নি বা হবে না। তারা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন সেই ইতিহাস মুছে ফেলা যাবে না।

এ দেশের মেরুদণ্ডহীন ট্রাফিক পুলিশকে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর যে অনুপ্রেরণা তারা জুগিয়েছেন, একশ্রেণীর ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তার অপকর্ম তথা ঘুষ গ্রহণের বিনিময়ে পরিবহন শ্রমিকদের রাস্তাঘাটে যা খুশি তা-ই করতে দেয়ার যে চিত্রটি উন্মোচন করেছেন, মন্ত্রী-মিনিস্টার হওয়া পরিবহন শ্রমিক নেতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যেভাবে তুলে ধরেছেন, কোনো ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত দ্বারাই তা মুছে ফেলা যাবে না।

এই শ্রেণীর পরিবহন শ্রমিক নেতারা যাতে কারচুপি করে আবার এমপি, মন্ত্রী হতে না পারেন, তজ্জন্য ভবিষ্যতে যদি এই সন্তানরা নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে আসেন, তাহলেও আমরা অবাক হব না! কারণ তারা দেখিয়ে দিয়েছেন যে তারাও পারেন। আমরাও মনে করি, দেশের বর্তমান অবস্থায় একমাত্র তারাই পারেন। কারণ এক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা সব ক্ষেত্রের লোকেরাই মতলববাজ হয়ে গেছি। নিজ নিজ ক্ষেত্রে আমরা সবাই দুর্নীতিবাজ!

তাই এখন অবশিষ্ট বলতে ওই শিশু-কিশোর সমাজ। আমরা যতই তাদের অপব্যবহার করতে চাই, যতই তাদের অর্জনকে ছিনিয়ে নিয়ে মতলব হাসিলের জন্য নিজ ঝুলিতে ভরতে চাই, ওইসব শিশু-কিশোর কিন্তু সেসব মতলববাজিও মোকাবেলা করার শক্তি রাখেন। অতএব, সাধু সাবধান! রাজনীতিকদের উদ্দেশেও এ ক্ষেত্রে সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলতে চাই, এই কিশোরদের একটা বড় অংশই কিন্তু সামনের নির্বাচনে ভোটার। সাম্প্রতিক ঘটনায় তাদের যেভাবে সচেতন দেখলাম, তাতে করে কারচুপির মাধ্যমে তাদের ভোট চুরি করা যাবে বলে মনে হয় না। তাই ভোট ডাকাত, ভোট চোরদের জন্যও এটা একটা অশনিসংকেতই বটে।

আমরা যে যার অবস্থান থেকে সৎ হতে পারব না, বা হব না, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আমরা ছলচাতুরী, কূটকৌশল, অপকর্ম, ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে জনজীবনকে দুর্বিষহ করে তুলব, আর কোনোদিন কখনও এসবের প্রতিকার-প্রতিবাদ হবে না, সেদিন বোধহয় শেষ। রাস্তায় দাঁড়িয়ে পরিবহন শ্রমিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়, ঘুষ গ্রহণ বন্ধ করতে না পারলে জনতা যদি আরও একবার ফুঁসে ওঠেন, তাহলে সে সময় তা মোকাবেলা করা সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়টিও ভেবে দেখার সময় হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যমন্ত্রী যে কথাটি বলেছেন, তা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘সব দলেই পরিবহন শ্রমিক নেতাদের আধিপত্য আছে।’ কিন্তু সেই আধিপত্য যাতে সরিষায় ভূতের কারণ না হয় সেই বিষয়টিকেই এখন অ্যাড্রেস করা প্রয়োজন। কারণ সময়ে এসব কথা হারিয়ে যেতে পারে। তাই লোহা গরম থাকতেই সেখানে আঘাত করা দরকার। প্রয়োজনে এমন দু-একজনকে দল বা মন্ত্রিত্ব থেকে বের করে দিলেও মনে হয় দলের বা সরকারের কোনো ক্ষতি হবে না। আর যদি মনে করা হয়, পরিবহন শ্রমিক নেতাদের বাগে আনতে, বা তাদের ভোট টানতে ওইসব নেতা অপরিহার্য তাহলে আলাদা কথা।

সে ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মেরুদণ্ড সোজা করে তাদের দিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়টি ভেবে দেখা যেতে পারে। কারণ পরিবহন সেক্টরে আইনের শাসন বলতে অবশিষ্ট কিছু নেই। এ সেক্টরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে নীতি-নৈতিকতাহীন পরিবহন শ্রমিক নেতাদের হাত থেকে সরকারসহ সব দলই নিষ্কৃতি পাবে।

উপসংহারে অত্যন্ত জোরালোভাবে যে কথাটি উল্লেখ করতে চাই তা হল, শিশু-কিশোরদের সাম্প্রতিক আন্দোলনকে হাইজ্যাক করার অপচেষ্টা। একটি বড় রাজনৈতিক দলের বড় বড় নেতার মস্তিষ্কপ্রসূত এমন চিন্তা-চেতনা দেখে আমরা খুবই অবাক হয়েছি। আর সত্যি বলতে সেই সঙ্গে হতাশও হয়েছি। শিশু-কিশোরদের পরিবহন শ্রমিকবিরোধী একটি আন্দোলনকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপদান করার অপচেষ্টার মতো একটি স্থূল বুদ্ধির কাজ তারা কেন যে করতে গেলেন, তা সত্যিই দুর্বোধ্য।

তাহলে ওইসব দল, ওইসব নেতার মধ্যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, রাজনৈতিক দর্শন বা দূরদর্শিতা বলতে কিছু আছে বলে কি মনে করা যায়? আমি অন্তত এমনটি মনে করতে পারছি না। এখন পাঠকরা কী বলবেন তা তারা জানেন। তবে অনুপ্রবেশকারী ঢুকিয়ে শিশু-কিশোরদের আন্দোলন থেকে যারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চেয়েছিলেন, তারা শিশু-কিশোরদের কিছুটা ক্ষতি করতে পারলেও নিজেরা লজ্জা ছাড়া অন্য কিছু অর্জন করতে পারেননি।

আর এভাবে এবারও তারা রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রমাণ দিয়েছেন এবং প্রকারান্তরে সরকারের আরও একটি উপকার করেছেন। অর্থাৎ তাদের কর্মকাণ্ডে সরকার আরও একবার লাভবান হয়েছে। সে ক্ষেত্রে সরকারও মনে হয় তাদেরকে একটি ধন্যবাদ দিতেই পারে। আর শিশু-কিশোররা পরিবহন সেক্টরের যে অরাজক পরিস্থিতি দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরেছেন, সে কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের অবশ্যই ধন্যবাদ দেয়া উচিত।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট