আমাদের সন্তানদের মুক্তি দিন

  মইনুল হোসেন ১৪ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন
ছবি: সংগৃহীত

সরকারের কাছে আমাদের নিবেদন, ছাত্রদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো প্রত্যাহার করে তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করুন। তারা যেহেতু নিরপরাধ এবং বয়সে তরুণ, তাই তাদের অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হোক।

আমাদের সন্তানদের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত ফৌজদারি মামলা দুটির তুচ্ছ চরিত্র সম্পর্কে অবহিত থেকে প্রথম দফায়ই তাদের জামিন মঞ্জুর করা সঠিক হতো এবং সেটাই হতো সবার জন্য ভালো। আমাদের সন্তানরা তাদের অগ্রজদের কাছ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা প্রত্যাশা করে। ছাত্রদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ কোনো খুনখারাবি সংক্রান্ত নয় যে, তাদের জেলে পাঠাতে হবে।

ছাত্রদের বিরুদ্ধে আনীত পুলিশের ওপর আক্রমণের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা না গেলেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল সামনাসামনি। তাই কে কাকে আক্রমণ করেছে বলা সহজ নয়। পত্রপত্রিকার ছবি থেকে যা দেখা গেছে, তাতে তো পুলিশের আক্রমণাত্মক ভূমিকাই ফুটে উঠেছে।

সাধারণ মানুষের অভিমত হচ্ছে, ছাত্ররা সরকারের মারমুখী রাজনীতির শিকার। পুলিশও রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। ছাত্রদের মুক্তি দেয়া হলে তা রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমনে সহায়ক হবে।

ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কে বা কারা কী উদ্দেশ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের দিকে চালিত করতে চেয়েছে, তা বুঝে ওঠা মুশকিল। দুটি বাসের তুচ্ছ প্রতিযোগিতায় চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে দু’জন শিক্ষার্থীর মৃত্যুবরণের ঘটনায় সমবেদনা জানাতে রাস্তায় বেরিয়ে আসা ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকাকে সরকারও তো প্রশংসা করেছে।

রাস্তায় গণপরিবহন চলাচল ব্যবস্থায় যেসব ত্রুটি রয়েছে এবং শিক্ষার্থীরা তার প্রতিকারে যেসব সুপারিশ করেছে, তা কার্যকর করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার। ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ছাড়া যেসব মোটরযান চলাচল করছে, তা ছাত্ররা চেকিং করে দেখিয়ে দেয়।

স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীরা শান্তিপূর্ণভাবে এ কাজ করে উৎসাহব্যঞ্জক উদাহরণ সৃষ্টি করে। তাদের এ দৃষ্টান্ত সাধারণ মানুষের মনে আমাদের আগামী প্রজন্ম সম্পর্কে বিরাট আশার সঞ্চার করেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের সন্তানরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রশংসনীয় উদাহরণ সৃষ্টি করার পর কেন পরিস্থিতি পুলিশের নিরাপত্তার মধ্যে বিনা উসকানিতে সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠল? জনগণ দেখতে পেল- একদল তরুণ ধারালো অস্ত্র ও ভারি লাঠিসোটা নিয়ে বেরিয়ে এলো এবং আমাদের সন্তানদের ক্ষতবিক্ষত করল, যেন তাদের রক্ষা করার মতো কোনো অভিভাবক নেই। এ ছেলেমেয়েরা আমাদেরই সন্তান এবং আমাদের সবার দায়িত্ব এটি দেখানো যে, তারা অভিভাবকহীন নয়।

তরুণরা শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে, তা মলিন হওয়ার নয়। ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাদের ভূমিকা স্মরণ করা হবে। তবে অগ্রজদের বিশ্বাসঘাতকতাপূর্ণ ব্যর্থতার জন্য দায়ী হচ্ছে, তাদের মধ্যকার কিছু লোকের মনের ক্ষুদ্রতা, স্বার্থপরতা ও দেশপ্রেমের অভাব। পুলিশের ভূমিকাও স্মরণ করা হবে পরম বিস্ময় ও বেদনার সঙ্গে, নিজেদের জনগণের প্রতি রাষ্ট্রশক্তি কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে!

সাধারণ মানুষ এবং গণমাধ্যমের কর্মীরা বিদ্যমান পাগলামি প্রত্যক্ষ করে বিস্মিত ও বেদনাবিদ্ধ হয়েছে। কর্তব্যরত সাংবাদিকদেরও ছাড় দেয়া হয়নি। তাদের অনেককে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে। ছেলেমেয়েগুলোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্র প্রতিবাদ জানাচ্ছিল, তারাও আক্রমণের মারাÍক শিকার হন।

এরপর শুরু হয় গ্রেফতার প্রক্রিয়া। পুলিশ বেছে বেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গ্রেফতার করে এবং তাদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর আক্রমণের জন্য দুটি ক্রিমিনাল কেস দেয়। ২২ ছাত্রকে জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। পুলিশের একটি প্রিজন ভ্যানে তুলে তাদের যখন নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমরা অসহায়ের মতো দেখতে পেলাম- তাদের বেদনার্ত মা-বাবারা দাঁড়িয়ে থেকে তাদের বিদায় দিচ্ছেন।

এ তরুণ ছাত্রদের ব্যাপারে কোনো পর্যায়ে বিন্দুমাত্র মানবিক বিবেচনা দেখানো হয়নি। বস্তুত আমরা এক হৃদয়হীন পরিস্থিতির মধ্যে বসবাস করছি। সরকারের ভয়ে সবাই সন্ত্রস্ত। সরকার যে আমাদের সরকার, তা বোঝা কঠিন। জনগণ যেদিকে তাকাচ্ছে- দেখতে পাচ্ছে, পুলিশ এবং পুলিশি কর্মকাণ্ড। পুলিশের ওপর সরকার অতিমাত্রায় নির্ভরশীল বলে পুলিশের কর্মকর্তারা মনে করেন, পুলিশকে প্রাধান্য দিয়ে সরকারের চলতে হবে।

যাদের ছবি গণমাধ্যমে এসেছে, ছাত্রদের শায়েস্তা করতে যাদের দেখা গেছে, তাদের কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। যারা সাংবাদিকদের আহত করেছে, তাদের কাউকে আইনের আওতায় না আনায় ক্ষোভে ফুঁসছে সাংবাদিকরা। অর্থাৎ সব দোষটাই পুলিশ নিজের কাঁধে নিয়েছে। মন্ত্রী-মিনিস্টারদের কোনো ভূমিকা নেই।

তারা শুধু বড় বড় হাঁকডাক দিয়ে যাচ্ছেন। সমস্যা সমাধানে তাদের মাথাব্যথা নেই। সবই পুলিশ করে দেবে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার কোনো উদ্যোগ নেই। শুক্রবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গাড়িতে সংঘর্ষ ঘটাতে বাসের কোনো অসুবিধা হয়নি। পত্র-পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায়, বাসটি চালাচ্ছিল একজন হেলপার।

সড়ক ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও অব্যবস্থা আগের মতোই চলছে। বাসগুলোর রং পরিবর্তনের হিড়িক পড়ে গেছে। পরিস্থিতির উন্নতি সাধনে মন্ত্রীদের যোগ্যতা প্রমাণের কোনো প্রয়োজন নেই। পুলিশি তৎপরতাই যথেষ্ট।

সরকারের কর্মকাণ্ডে সুস্থ চিন্তার অভাব জনমনে এ ধারণাটি পাকাপোক্ত করছে- ক্ষমতায় থাকার ব্যাপারে সরকার এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্কে ভুগছে। দাবি যতই ন্যায্য হোক না কেন, রাস্তায় লোক জড়ো হতে দেখলে সরকার ব্যাপারটাকে ক্ষমতা হারানোর হুমকিস্বরূপ মনে করছে। তাদের মনে এ ভয় ঢুকেছে, তাদের ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য সর্বত্র ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যেহেতু তারা নিজেরাই অপকৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতায় আছেন, তাই এটিও হয়তো অন্যতম কারণ।

যারা ক্ষমতায় আছেন, তারা সরকার পরিবর্তনকে স্বাভাবিক ও অনিবার্য ঘটনা হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত নন। অবাধ নির্বাচন ছাড়া চিরস্থায়ীভাবে ক্ষমতায় থাকার জন্য সর্বক্ষণ ক্ষমতাসীনরাই অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছেন। তাই তারা জনগণের সমস্যাগুলোর সমাধানের ব্যাপারে শাসনতন্ত্রসম্মত সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন না।

কোনো ব্যাপারে আপস বা সমঝোতায় পৌঁছানোর বুদ্ধি-পরামর্শ পাকিস্তান আমলের আমলা-উপদেষ্টারা দেবেন না। তাদের কাছে রাষ্ট্রীয় শক্তির অপব্যবহার এত সহজ হচ্ছে যে, তারা ভাবতেই পারছেন না- দেশটি জনগণের এবং এ কারণে দুঃশাসন ও জনগণের সম্পদ লুটপাটের জবাবদিহিতা থাকতে হবে।

বাস-ট্রাকগুলো আগের মতোই দায়িত্বহীনভাবে চলাচল করছে এবং প্রতিদিনই মানুষ মারা যাচ্ছে। দুর্নীতির আধিপত্যও অপরিবর্তিত রয়েছে। সরকার পরিচালনার দক্ষতা বা কর্তৃত্ব কোথাও নেই। জনজীবন নানা ধরনের অন্যায়-অবিচার ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সন্তানদের নিরাপত্তা প্রদানে অভিভাবকদের অসহায়ত্ব চরম আকার ধারণ করেছে।

আইনের শাসন নয়, চলছে আইনের অপব্যবহার। বিচারব্যবস্থা রয়েছে নানা ধরনের চাপের মধ্যে। চারদিকে ভয়ভীতি বিরাজ করছে। পুলিশ কোনোরূপ মামলা দিয়েই কোর্টের নির্দেশে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে অহরহ পুলিশ রিমান্ডে নিয়ে যাচ্ছে। এমনকি মেয়েদের ব্যাপারেও এর কোনো ব্যতিক্রম নেই।

পুলিশ চাইলেই তাকে আইনজীবীর অনুপস্থিতিতে পুলিশি হেফাজতে পাঠানো সুপ্রিমকোর্টও অনুমোদন করে না। এ ধরনের ছিন্নভিন্ন রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙে পড়বেই।

ভেতো বাঙালি যে ভীতু জাতি- সে সত্যই প্রমাণিত হচ্ছে। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অস্তিত্বও তরুণরা দেখছে না। কিছু বাড়তি সুবিধা পেলেই কিছু লোক দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ববোধের কথা ভুলে যান।

সরকারের উদ্দেশে আমার বক্তব্য- এদিক-ওদিক শত্রু এবং ষড়যন্ত্রকারী খুঁজে লাভ হবে না। নিজেদের ব্যর্থতা ও দুর্নীতি আপনাদের নিজেদের জন্যই দুশ্চিন্তার কারণ হওয়া উচিত। আমাদের সন্তানদের নিরাপদে থাকতে দিন।

পুলিশের সরকার না হয়ে বরং জনগণের সরকার হতে চেষ্টা করুন। ব্যর্থ সরকারের জন্য ক্ষমতায় থাকাটাই এক বিরাট ষড়যন্ত্র। সরকার চলছে না অথচ ক্ষমতায় থাকতে হবে। অন্যদের ষড়যন্ত্র করার কোনো প্রয়োজনই হচ্ছে না। সবাই ক্ষমতা পাগল নয়।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

ঘটনাপ্রবাহ : বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter