বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিতে যমুনা নদীর বহুমুখী সম্ভাবনা

  ড. মো. রফিকুল ইসলাম ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যমুনা নদী
ফাইল ছবি

দেশের উত্তরবঙ্গে যমুনার করাল গ্রাসে বিলুপ্ত হয়েছে হাজারও জনপদ, মানবসভ্যতা এবং শত শত শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। তছনছ করে দিয়েছে লাখ লাখ মানুষের জীবনব্যবস্থা।

যমুনাপারের একজন আতঙ্কিত মানুষ হিসেবে আমার মনে যে প্রশ্নটি বারবার দাগ কাটে সেটি হল- যমুনা নদী যদি চীন, জাপান, কোরিয়া, মেক্সিকো কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার মতো দেশে হতো, তাহলে ওইসব দেশ নদীটিকে নিয়ে কী কী ভাবত এবং কী কী করত?

এর সহজ-সরল উত্তরে বলা যায়, ওইসব দেশ নিশ্চয়ই নদীটিকে মহাসম্পদে রূপান্তর করার জন্য সব ধরনের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি সানন্দে গ্রহণ করত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, চীনের হোয়াংহো নদীকে এক সময় বলা হতো চীনের দুঃখ ও অভিশাপ। কিন্তু উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহার করার সুবাদে হোয়াংহো নদী এখন চীনের জনগণের জন্য আশীর্বাদ।

তাহলে আমরাও কি পারি না উত্তরবঙ্গের দুঃখ বলে পরিচিত মহাতঙ্ক যমুনা নদীকে বাংলাদেশের জনগণের জন্য মহাসম্পদে রূপান্তর করার সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি গ্রহণ করতে? এর উত্তরে বলা যায়, নিশ্চয়ই আমরা পারব।

কিন্তু কীভাবে? উত্তরে বলা যায়, বিশ্বব্যাংককে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রজেক্ট যেভাবে এগিয়ে চলছে, ঠিক সেভাবে যমুনা নদীর পানিসম্পদ ব্যবহারের বহুমুখী মেগা প্রজেক্ট হাতে নেয়া বাংলাদেশ সরকারের কাছে কোনো ব্যাপারই নয়।

পাঠক, তাহলে আসুন কীভাবে সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে যমুনাকে বহুমুখী ব্যবহার উপযোগী একটি মহাসম্পদে রূপান্তর করা যেতে পারে তার একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় মনোনিবেশ করি।

মহাতঙ্ক যমুনা নদীকে মহাসম্পদে রূপান্তর করার প্রথম পদক্ষেপ হবে স্থায়ীভাবে যমুনা নদীর উভয় তীর রক্ষার জন্য স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করার পাশাপাশি যমুনা বক্ষে হারানো লাখ লাখ একর জমি পুনরুদ্ধার করা। স্থায়ীভাবে নদীশাসন ও জমি পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে ‘জিওটেক্সটাইল টিউবিং’ পদ্ধতি হল বিশ্বের সর্বাধুনিক, টেকসই, সুলভ ও সাশ্রয়ী বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি।

আমাদের দেশে কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে ইনানী সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার পথে বঙ্গোপসাগরের তীর বরাবর ছোট আকারের কিছু জিওটেক্সটাইল টিউব মাঝে মাঝে দেখা যায়, যা অত্যন্ত দুর্বলভাবে মেরিন-ড্রাইভ রোডের পশ্চিমে কিছুটা নিচু সাগরের তলদেশ বরাবর জায়গায় বসানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জিওটেক্সটাইল টিউবের দৈর্ঘ্য ও ব্যাস বিবেচনা করা হয়। যেমন, দক্ষিণ আমেরিকার ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের দেশগুলোতে ব্যবহৃত জিওটেক্সটাইল টিউবের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৩০ থেকে ৩০০ মিটার এবং ব্যাস ২ থেকে ৫ মিটার হয়। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট জিওটেক্সটাইল টিউব ব্যবহৃত হয়।

পাঠকের সুবিধার্থে এখানে বিষয়টি অতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হল। ‘জিওটেক্সটাইল টিউবিং’ পদ্ধতিতে প্রায় ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৫ মিটার ব্যাসবিশিষ্ট জিওটেক্সটাইল টিউবকে স্লারি প্রক্রিয়ায় পানি ও বালির মিশ্রণ দ্বারা প্রথমে ভর্তি করানো হয়। এরপর জিওটেক্সটাইল টিউবের সূক্ষ্ম ছিদ্রপথের মাধ্যমে পানির অংশ বেরিয়ে যায়; কিন্তু বালির কণাগুলো টিউবের ভেতরে স্থায়ীভাবে আটকে যায়।

এভাবে বালিভর্তি করানোর পর জিওটেক্সটাইল টিউবের ব্যাস ৫ মিটার আর থাকবে না, বরং বৈজ্ঞানিক সূত্রানুসারে টিউবের উচ্চতা কিছুটা কমে ৩ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট হবে এবং টিউবের প্রস্থ হবে প্রায় ৭ মিটার; কিন্তু টিউবের দৈর্ঘ্যে কোনো পরিবর্তন হবে না।

যমুনা নদীর উভয় তীরের কাছাকাছি তলদেশে জিওটেক্সটাইল টিউবগুলোকে স্রোতের অনুকূলে এবং তীরের সঙ্গে ৩০-৪৫ ডিগ্রি কোণের মধ্যে স্রোতের ভাটি বরাবর বসাতে হবে। ইউনিট অপারেশনের বিষয়টি মাথায় রেখে উল্লিখিত অনুকূল স্রোত ও কোণ বিবেচনা করে যদি নদীতীরের কাছে তলদেশ বরাবর প্রথমে সাতটি টিউব বসানো হয়, তাহলে সম্মিলিত প্রস্থ হবে প্রায় ৪৯ মিটার এবং উচ্চতা হবে প্রায় ৩ মিটার।

এরপর যদি তলদেশ থেকে ক্রমান্বয়ে দ্বিতীয় ধাপে ছয়টি, তৃতীয় ধাপে পাঁচটি, চতুর্থ ধাপে চারটি, পঞ্চম ধাপে তিনটি, ষষ্ঠ ধাপে দুটি এবং সর্বশেষ সপ্তম ধাপে একটি জিওটেক্সটাইল টিউব বসানো হয়, তাহলে একটি ইউনিট অপারেশনের মাধ্যমে প্রাপ্ত বালিভর্তি সম্মিলিত জিওটেক্সটাইল টিউবের উচ্চতা আসবে ২১ মিটার (প্রায় ৬৯ ফুট)।

জিওটেক্সটাইল টিউবগুলো ভর্তি করার ক্ষেত্রে ‘প্রতি ইউনিট অপারেশন’-এর জন্য প্রাক্কলিক ব্যয় হিসাব করে মোট বাজেটের পরিমাণ নির্ধারণ করা যাবে।

শুরুতে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী থেকে সিরাজগঞ্জ শহরের ভাটিতে বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু পর্যন্ত দৈর্ঘ্যরে মধ্যে যদি অর্ধকিলোমিটার পরপর একটি করে ইউনিট অপারেশন সম্পন্ন করার পর সব ইউনিটকে একত্রে সংযুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং স্রোতকে নদীতীর থেকে ভেতরের দিকে প্রবাহিত করতে বাধ্য করা হয়, তাহলে যমুনার পশ্চিম তীর স্থায়ীভাবে রক্ষা করার পাশাপাশি লাখ লাখ একর জমি যমুনা বক্ষ থেকে উদ্ধার করা প্রায় শতভাগ সম্ভব হবে।

অনুরূপ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে যমুনার পূর্ব তীরের ক্ষেত্রেও। এখানে আরও একটি বিষয় স্মরণ রাখা দরকার- জিওটেক্সটাইল টিউবগুলোকে কোনোভাবেই স্রোতের উজানের দিকে বসানো যাবে না। যমুনা নদীর ক্ষেত্রে জিওটেক্সটাইল টিউবগুলোকে স্রোতের উজানের দিকে বা ক্রস সেকশন বরাবর বসালে যমুনার ভাঙন আরও ভয়ংকর রূপ ধারণ করবে, যা একবারে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

এ লেখক কর্তৃক সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর থানার মেঘাই হার্ড পয়েন্ট ও পাটগ্রাম স্পার এলাকা এবং সিরাজগঞ্জ সদর থানার বাহুকা ও শিমলা-পাঁচঠাকুরী এলাকায় নির্মিত নদীতীর সংরক্ষণ ও শাসনসংশ্লিষ্ট বাঁধ ও স্পারগুলো স্রোতের উজানের দিকে অথবা নদীর ক্রস সেকশন বরাবর নির্মাণ করার কারণে বাঁধের উজানের অংশে নদীভাঙনের ব্যাপকতা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি।

যমুনা নদীর পশ্চিম তীরের এ অংশে সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার পরও শুধু পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভুল প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি, হবেও না। ছোট ছোট কিছু সিসি ব্লক এবং নামকাওয়াস্তে কিছু অতি নিুমানের জিওটেক্সটাইল ব্যাগ ব্যবহার করে যমুনার মতো প্রশস্ততম নদীর তীররক্ষা ও শাসন করার চেষ্টা করা আর সাগরে এক মুষ্টি মাটি ফেলা একই কথা।

স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করে দেখা গেছে, যমুনা নদী কোথাও ৬ কিলোমিটার, কোথাও ৯ কিলোমিটার এবং কোনো কোনো জায়গায় প্রায় ১৪ কিলোমিটার প্রশস্ত, যা ভরা বর্ষাকালে অনেকটা সাগরের মতো মনে হয়।

‘জিওটেক্সটাইল টিউবিং’ পদ্ধতি যমুনা নদীতে ব্যবহার করা হলে বিদ্যুৎ সেক্টরে অতি দ্রুত উন্নয়নের পাশাপাশি বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটবে। এ পদ্ধতি ব্যবহার করার জন্য যে পরিমাণ গুণগতমানের বালির দরকার তার চেয়েও বহুগুণ বেশি বালি যমুনা বক্ষের বিভিন্ন চরাঞ্চলে মজুদ রয়েছে।

‘জিওটেক্সটাইল টিউবিং’ পদ্ধতিতে ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর (যেমন- বালি (sand), সিল্ট (silt), কাদামাটি (clay), পলিমাটি এবং পানি) প্রায় ৯৫ ভাগ যমুনা বক্ষে বিদ্যমান রয়েছে। এসব নির্মাণসামগ্রী অন্য জায়গা থেকে যমুনায় আনতে হবে না।

জিওটেক্সটাইল টিউবিং পদ্ধতিতে স্থায়ীভাবে নদীশাসনের ফলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধ করা যাবে। যমুনা নদী শাসনের পাশাপাশি জমি উদ্ধারের পর যেসব কাজে নদীর পানি ব্যবহার করা যাবে, সেগুলো হল- ১. নদীর উভয় তীর বরাবর স্থায়ী বাঁধে বসানো ৭৮০টি জলবিদ্যুৎ টার্বাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন; ২. নদীর উভয় তীর বরাবর স্থায়ী বাঁধে বসানো ২০৮০টি বায়ুচালিত টার্বাইনের মাধ্যম বিদ্যুৎ উৎপাদন। উভয় প্রক্রিয়া থেকে প্রায় ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে; ৩. টার্বাইনের ফ্রি পানির মাধ্যমে যমুনার উভয় তীরের লাখ লাখ একর জমিতে চাষাবাদ।

টার্বাইন ঘোরানোর জন্য প্রবাহিত পানির মাধ্যমে যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে শুষ্ক মৌসুমে কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে পাবনা জেলার ভেড়াখোলা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষাবাদের কাজে ফ্রি পানি ব্যবহার করা যাবে। অনুরূপভাবে, যমুনার পূর্ব পাড়ে স্থাপিত টার্বাইনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পানি কুড়িগ্রাম জেলার একাংশ থেকে শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল হয়ে ভাটিতে মানিকগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা শুষ্ক মৌসুমে ফ্রি পানি দিয়ে চাষাবাদ করা যাবে, ৪. বছরে অন্যান্য সময় প্রবাহিত পানি পুরনো নদ-নদী ও খাল-বিলে প্রবাহিত করে খুলনা অঞ্চলের মতো গলদা চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ চাষ করার ক্ষেত্রে শতভাগ পানির নিশ্চয়তা পাওয়া যাবে।

৫. নদীর উভয় তীরের বিস্তীর্ণ এলাকাব্যাপী ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের ভারসাম্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যাবে এবং ৬. প্রতি বছর বর্ষাকালে উজান থেকে ভেসে আসা এবং যমুনার তলদেশে জমাকৃত বালি/পলি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উত্তোলন করে নির্মাণ কাজের জন্য ব্যবহার করা যাবে। যমুনা বক্ষ থেকে জমি উদ্ধারের পর অন্যান্য সুবিধার মধ্যে থাকবে-

১. নদীর উভয় তীর বরাবর স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা বাঁধের পাশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, ২. ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চলের ওপর চাপ কমানোর জন্য আলাদা শিল্পাঞ্চল এবং আবাসিক এলাকা প্রতিষ্ঠা করা, ৩. ঢাকার বিকল্প আরেকটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর গড়ে তোলা, ৪. বাঁধের পাশে বিভিন্ন জায়গায় চিত্তবিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা, ৫. সবুজ বনায়ন সম্প্রসারণ করা ৬. নদীর উভয় তীর বরাবর চার লেনের জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ করা।

উল্লিখিত যমুনা নদীকেন্দ্রিক কর্মসূচির মাধ্যমে বাংলাদেশের লাখ লাখ বেকার যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

ড. মো. রফিকুল ইসলাম : বিজ্ঞানী; সহযোগী অধ্যাপক, পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter