ব্রিটেনের উদাহরণ দিতে হচ্ছে

  এফ আর চৌধুরী ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটেনের উদাহরণ দিতে হচ্ছে
প্রতীকী ছবি

১৮ জুলাই, ২০১৮। দিনটি ছিল বুধবার। আমি তখনও সকালের নাশতার টেবিলে বসা এবং টিভিতে সংবাদ শুনছিলাম। সংবাদ শিরোনামটি ছিল বিবিসি কর্তৃক স্যার ক্লিফ রিচার্ডের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভঙ্গের দায়ে তাকে ২ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদালতের রায় সংক্রান্ত। ঘটনাটি ছিল দুই বছর আগে শিশু পর্নোগ্রাফির সন্দেহমূলক সাক্ষ্য-প্রমাণের খোঁজে স্যার রিচার্ডের বাসায় পুলিশের তল্লাশি সংক্রান্ত। ঘটনাটি নিয়ে বিবিসি এভাবে প্রতিবেদন করেছিল যে, মনে হয়েছিল স্যার রিচার্ড এরই মধ্যে দোষী সাব্যস্ত হয়ে গেছেন। বিবিসির প্রতিবেদন পদ্ধতিটি ছিল সাধারণত বিচারের আওতাধীন ঘটনাবলির প্রতিবেদন-পদ্ধতির বিপরীত।

যেহেতু ঘটনাটি নিয়ে লিখছি, এর সঙ্গে প্রাসঙ্গিক ব্রিটেনে অনুসৃত কার্যপ্রণালী নিয়েও আমি আলোচনা করতে চাই। মানবাধিকার এবং মানবমর্যাদা সংক্রান্ত বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটেনে অভিযুক্তের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে পুলিশ খুবই সতর্ক ও যত্নবান। যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো আদালতে দোষী সাব্যস্ত না হবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিই অপরাধী নন। অভিযুক্ত ব্যক্তি রাস্তার আর দশজন মানুষের মতোই। পুলিশও সেভাবেই তার সঙ্গে আচরণ করবে। কোনোভাবেই অভিযুক্ত ব্যক্তির মর্যাদা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। পুলিশ তার পুরো পরিচয় গণমাধ্যমে ফাঁস করবে না।

যে কোনো বিবৃতির ক্ষেত্রে সাধারণত বলা হবে যে, প্রায় ৪৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে র‌্যামফোর্ড এলাকা থেকে হেফাজতে নেয়া হয়েছে বা এ ধরনের কিছু। এর চেয়ে বেশি তথ্য দেয়া হতে পারে যদি পুলিশ সিদ্ধান্ত নেয় যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হবে এবং তাকে ফৌজদারি আইনে সোপর্দ করা হবে। একমাত্র আদালতের রায়ের পর পুলিশ সংবাদ ব্রিফিং ডাকতে পারে যে কীভাবে তারা মামলাটি নিয়ে এগিয়েছে। প্রতিটি স্তরে পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে পরিপূর্ণ মর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে আচরণ করবে। পুলিশ তাদের দায়িত্ব ভালোভাবে জানে- আইন প্রয়োগ এবং অপরাধ নিরোধ, জনগণকে রক্ষা; কিন্তু কোনোভাবেই অযথা হয়রানি না করা।

ব্রিটেনে আমরা পরিপূর্ণভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভোগ করি। একমাত্র রাজা-রানী ছাড়া যে কোনো ব্যক্তি বা তার কার্যক্রমের সমালোচনা আমরা করতে পারি এটা মাথায় রেখে যে, আমরা যে কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ ও মিথ্যা বলা এড়িয়ে যাব, যার কারণে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। এছাড়া যা থেকে বর্ণ, গোত্র বা ধর্মীয় ফাটল ও বিভক্তি তৈরি হতে পারে অথবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে- এমন বিবৃতিও এড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আমরা সমালোচনা করতে পারি। যারা রাজনীতি করেন, তারা যে কোনো ধরনের সমালোচনা মোকাবেলা করার জন্য তৈরি থাকেন। বিভিন্ন পত্রিকায় মজার কার্টুন প্রকাশ একেবারে সাধারণ বিষয়, এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীর কার্টুনও। এজন্য কাউকেই জেলে যেতে হয় না।

ব্রিটেনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা একটি স্থায়ী বিষয়। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতি, এমনকি সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতিও দীর্ঘসময় ধরে এখানে ঢেকে রাখা যায় না। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এ ধরনের অনিয়ম খুঁজে বের করে এবং জনসমক্ষে তুলে ধরে। এগুলো লুকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই। যা হোক, যে কোনো মিথ্যা প্রতিবেদন প্রকাশ সংশ্লিষ্টদের মানহানি এবং লাখো পাউন্ডের ক্ষতিপূরণের দিকে মোড় নিতে পারে।

ব্রিটেনে নতুন একটি আইন করা হয়েছে, যেখানে জনস্বার্থের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জানার অধিকার জনগণকে দেয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, প্রতিষ্ঠান বা সমাজের কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না- এমন তথ্য জনগণকে দেয়ার জন্য সরকারি বিভাগ ও এজেন্সিগুলোকে বলে দেয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষা বা রাষ্ট্রের অন্য কোনো গোপনীয়তা সংক্রান্ত বিষয় অবশ্য ফাঁস করা যাবে না। এমন কোনো তথ্য প্রচার করা যাবে না, যা ব্যবসায়িক সফলতা বা ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। যখন দুটি পক্ষ আইনি বিবাদে থাকবে, তখন যে কোনো তথ্য একপক্ষকে দেয়া হলে একই সঙ্গে তা অন্য পক্ষকেও দেয়া হবে।

ব্রিটেনের মানুষ প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ও উপভোগ করে। এটি সংরক্ষণ করা হয়। এক্ষেত্রে জনস্বার্থের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। যদি সাংবাদিকতা এ সীমা লঙ্ঘন করে, তবে তাদের এর জন্য বড় ধরনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এ কারণেই ভারসাম্যতা রক্ষিত হয়। ব্রিটেনের বিচার বিভাগ এটি নিয়ে কাজ করার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ এবং স্যার ক্লিফ রিচার্ডের মামলার ক্ষেত্রে বিচারক তাই করেছেন।

ব্রিটেনে এসব বিষয় দেখার জন্য একজন করে ন্যায়পাল রয়েছেন (যাকে আমরা পর্যবেক্ষক বা ওয়াচডগ বলে থাকি)। সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রতিকারের জন্য সংশ্লিষ্ট ন্যায়পালের কাছে যেতে পারেন। তবে আদালতগুলো সব সময় চূড়ান্ত যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত থাকে। ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ কমপ্লেইন্ট কমিশন বা আইসিসি পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করে। একই ধরনের কর্তৃপক্ষ রয়েছে গণমাধ্যম ও তথ্য বিভাগের জন্যও। এছাড়া জনস্বার্থের বিষয়গুলো মানুষ যাতে জানতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য একটি তথ্য কমিশনও রয়েছে।

স্পর্শকাতর এসব বিষয় দেখাশোনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটেনের মডেল এক কথায় অনন্য। যথাযথ ও উপযুক্ত প্রশাসন কর্তৃক আইনগুলো সমর্থন ও মান্য করা হয়। প্রতিটি খাতের ন্যায়পাল বা পর্যবেক্ষক সরকারের প্রভাবমুক্ত। তারা চূড়ান্ত জনস্বার্থের জন্য কাজ করে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডেও এমন কার্যপ্রণালী রয়েছে। প্রতিটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য এগুলো পূর্বশর্ত। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এগুলো প্রয়োজনীয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো এসব পদ্ধতি ও কার্যপ্রণালী থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে। বস্তুত, এসব বিষয়ে ব্রিটেনের কাছ থেকে সহযোগিতাও তারা চাইতে পারে।

বাংলাদেশে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মিডিয়া ও ক্যামেরার সামনে প্রদর্শন অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে অবশ্যই বুঝতে হবে যে তারা বিচারকমণ্ডলীর অংশ নন। অভিযুক্তের মিডিয়া ট্রায়াল তাদের অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। পুলিশ হেফাজতে বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে অভিযুক্তকে হত্যা সরকার কর্তৃক সংঘটিত সবচেয়ে বড় অপরাধ। এটি বর্বর সংস্কৃতি। সভ্য সমাজে এ ধরনের কার্যাবলির কোনো স্থান নেই। এগুলো অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।

আমি জানি, ব্রিটেনে প্রশিক্ষিত বহু উকিল ও ব্যারিস্টার বাংলাদেশে রয়েছেন। তারা বোঝেন এবং জানেন যে, এ প্রবন্ধে আমি কী বলতে চাচ্ছি। গণতান্ত্রিক সংস্কার আনয়নের জন্য পদক্ষেপ নিতে বাংলাদেশের আইনসমাজ বা বার কাউন্সিলকে আমি আহ্বান জানাচ্ছি। আসুন, সমতা এবং ন্যায়বিচার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মানবাধিকারভিত্তিক একটি সভ্য ও উন্নত সংস্কৃতির সমাজ আমরা গড়ে তুলি।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

এফ আর চৌধুরী : ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশি

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.