বায়ুদূষণে ফিটনেসবিহীন যানবাহন

  ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার ও হুমায়রা আদিবা কথা ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অসম্ভব রকম যানজট সৃষ্টির পাশাপাশি রাজধানীর পরিবেশ দূষণেও অন্যতম ভূমিকা রাখছে ফিটনেসবিহীন নিুমানের যানবাহন। বিআরটিএ থেকে নেয়া অধিকাংশ গণপরিবহন কোম্পানির গাড়ির চলাচলের বৈধ কাগজ থাকলেও নেই পরিবহনের ফিটনেস। ইঞ্জিনের বিকট শব্দে অস্বস্তিকর অবস্থা সৃষ্টির পাশাপাশি কালো ধোঁয়াও নির্গমন করে চলছে এসব পরিবহন। গাড়িগুলোর সাইলেন্সারে ধোঁয়া ফিল্টারের কোনো ধরনের ব্যবস্থা না থাকায় দূষিত হচ্ছে রাজপথ। রাজপথে মাঝে-মধ্যে মোবাইল কোর্ট অভিযান চালিয়ে ফিটনেসবিহীন কিছু গাড়ি ধরা হলেও সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হচ্ছে না, কখনও জেল-জরিমানা করে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে; কিন্তু কমছে না এ দূষক গাড়িগুলোর দৌরাত্ম্য। যার ফলে রাজধানীতে ক্রমাগত বায়ুদূষণ বেড়েই চলছে। পরিবহন মালিকরা এজন্য ভেজাল জ্বালানিকে দায়ী করছে। পরিবেশ অধিদফতরের এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট জানিয়েছে, ঢাকা শহরে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩ লাখ যান্ত্রিক যানবাহন চলাচল করে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলেন, মোটরযান চলাচলের প্রধান সড়কগুলো আবাসিক এলাকাসংলগ্ন হওয়ার এসব এলাকার লোকজন উচ্চহারে বায়ুদূষণের শিকার হচ্ছে। সবচেয়ে অরক্ষিত গোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে পথচারী, ফেরিওয়ালা, দোকানদার, ট্রাফিক পুলিশ ও গাড়িচালকরা।

ফিটনেসবিহীন গাড়িগুলো নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে রাজপথে, ক্ষতি হয় জনসাধারণের জান এবং মাল। ব্যক্তিমালিকানাধীন গাড়িসহ অন্যান্য যানবাহনের একটি বিরাট অংশ বায়ুদূষণের মুখ্য ভূমিকা পালন করছে। এসব নিুমানের মোটরযান থেকে ক্ষতিকর বস্তুকণা যেমন : কার্বন মনো-অক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং ওজোন নির্গত হচ্ছে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন মোটরযানগুলো রাজপথের পরিবেশকে ধূলিময় করে তোলে যা মানব স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রের দুটি গবেষণা সংস্থা ‘হেলথ ইফেক্টেস ইন্সটিটিউট’ এবং ‘ইন্সটিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভালুয়েশন’-এর যৌথ পরিচালিত বৈশ্বিক বায়ুদূষণ পরিস্থিতি ২০১৭-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বায়ুদূষণের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়।

এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনের ওপর ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত নগরীর ১৩টি পয়েন্টে বিভিন্ন যানবাহনের ওপর একটি সমীক্ষা করে। এ সমীক্ষায় ৪৬ দশমিক ৬৭ শতাংশ একতলা বাস, ৫৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ টাটা বাস, ৬০ দশমিক ২০ শতাংশ মিনিবাস, ৫০ শতাংশ মাইক্রোবাস ও জিপ, ৯০ শতাংশ পিকআপ ও মিনি কাভার্ডভ্যান, ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি বায়ুদূষণ করছে বলে মন্তব্য করা হয়। উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের পর থেকে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত যানবাহনের ওপর বড় কোনো সমীক্ষা করা হয়নি।

এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্টের কর্মকর্তারা বলেন, রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহনগুলো প্রধানত ৩ ধরনের জ্বালানি যথা : ডিজেল, পেট্রল ও সিএনজি ব্যবহার করে। ইঞ্জিন ডিজাইনে ত্র“টি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না করা, মানসম্মত জ্বালানি ও লুব্রিকেন্ট ব্যবহার না করা এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বা পণ্য বহন করার কারণে বায়ুদূষণ হচ্ছে। নিুমানের জ্বালানি দহনে বায়ুতে নিঃসরিত হচ্ছে অতিসূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫। কর্মকর্তারা আরও বলেন, সূক্ষ্ম বস্তুকণা পিএম ২.৫ নিঃসরণ কমানোর জন্য গাড়িকে প্রতি ঘণ্টায় কমপক্ষে ৬ কিলোমিটার বেগে চলতে হবে। কিন্তু যানজটের এ নগরীতে এত গতিতে গাড়ি চালানো প্রায় অসম্ভব।

ডিজেল নিঃসরণে যেসব দূষক পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অতি সূক্ষ্ম বস্তুকণা, নাইট্রোজেন অক্সাইড, হাইড্রোকার্বন, জৈব বিষ, পলি নিউক্লিয়ার এরোমেটিক্স। পেট্রল, অকটেন ও সিএনজিচালিত যানবাহন থেকে নিঃসরিত দূষণকারী পদার্থের মধ্যে রয়েছে আইডল কার্বন মনো-অক্সাইড, আইডল হাইড্রোকার্বন; এসব বস্তুকণার কারণে মানবদেহে ক্যান্সার, হৃদরোগ, অ্যাজমা, শ্বাসকষ্ট ও ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

পরিবেশ অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী বলেন, শুষ্ক মৌসুমে এমনিতেই দূষণ বাড়ে, বৃষ্টি হলে কমে। এ দূষণ কমানোর জন্য দেশে লেড বা সিসামুক্ত পেট্রল আমদানি করা হচ্ছে। এর ফলে পেট্রল ব্যবহারকারী যানবাহন কর্তৃক দূষণ কমছে। তিনি আরও বলেন, সালফারের মাত্রা কম আছে এমন ডিজেল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।

পরিবহন মালিকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব বাস কোম্পানির সভাপতি খন্দকার রফিকুল হুদা কাজল বলেন, বেশির ভাগ গাড়ি এখন সিএনজিতে চলে। এ ধরনের গাড়ি পরিবেশ দূষণ করে না। ডিজেলচালিত যানবাহন বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে ডিজেল পাওয়া যায়, তা খুবই নিুমানের। যার ফলে ওইসব যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া খুবই বিষাক্ত ও ক্ষতিকর।

পরিবেশ অধিদফতর থেকে জানা যায়, রাজধানীতে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে, এ সময় যতগুলো যানবাহন পরীক্ষা করা হয় তার বেশিরভাগই পরিবেশ দূষণকারী হিসেবে ধরা পড়ছে এবং এজন্য মামলাও হচ্ছে।

সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের জ্বালানি সাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তিবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, ২০১১ সালে ঢাকার বায়ুদূষণের জন্য যানবাহন দায়ী ছিল ১০ শতাংশ।

নরওয়েভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনআইএলইউয়ের সহায়তায় সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকা শহরের বায়ুর গুণগত মানের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরের শুধু গাড়ির ধোঁয়া থেকে প্রায় ৩ হাজার ৭০০ টন বস্তুকণা পিএম ২.৫ বাতাসে ছড়াচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার তথ্যমতে, ঢাকার বাতাসে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে এবং এর অধিকাংশ এসেছে নিম্নমানের যানবাহন থেকে।

ঢাকা শহরের নিুমানের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে প্রশাসন কাজ করছে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি করে ঢাকা শহরের বায়ুদূষণকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক্ষেত্রে মোটরযানের বিকল্প হিসেবে বাইসাইকেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার : বিভাগীয় প্রধান, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

হুমায়রা আদিবা কথা : লেখকের গবেষণা সহকারী

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter