জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও পরবর্তী করণীয়

  একেএম শামসুদ্দিন ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা
ফাইল ছবি

২৭ আগস্ট জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক স্বাধীন আন্তর্জাতিক তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদনে মিয়ানমারের রাখাইন অঞ্চলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্দেহাতীতভাবে এটি প্রমাণিত হয়েছে, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের সরাসরি নেতৃত্বে নিরাপত্তা বাহিনী রাখাইন, কোচিন এবং শান অঞ্চলে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক সব আইন উপেক্ষা করে নারকীয় হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, লুটপাট ও গ্রামের পর গ্রাম আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করেছে।

মানবতাবিরোধী এসব অপরাধের অভিযোগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী প্রধানসহ ছয় জেনারেলের বিরুদ্ধে বিচারের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন।

গত বছরের ২০ আগস্ট আরাকান রোহিঙ্গা সেলভেশন আর্মি (এআরএসএ) কর্তৃক মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকিতে আক্রমণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে বলে মিয়ানমার সরকার যে দাবি করেছে তা নাকচ করে এ গণহত্যা পূর্বপরিকল্পিত বলে প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় এক বছর অনুসন্ধান শেষে তথ্যানুসন্ধান মিশন এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে, এআরএসএ কর্তৃক মিয়ানমারের নিরাপত্তা চৌকি আক্রমণের সঙ্গে রাখাইন অঞ্চলের গণহত্যার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ আছে, গত বছরের মে এবং জুলাই মাসে মিয়ানমারের চরমপন্থী বৌদ্ধ মঙ্ক উইরাথু উত্তর রাখাইনে দু’বার ধর্মীয় সফরে যান।

এ বৌদ্ধ মঙ্কের সফরের জের ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর সহযোগিতায় রাখাইন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী গ্রামবাসী পুরো আগস্ট মাস ধরে উত্তর রাখাইনের রাথেডং শহর ও শহরতলি এলাকা ব্লক করে রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ২৫ আগস্ট গণহত্যা শুরুর আগ পর্যন্ত রাখাইন অঞ্চলে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল।

একইসঙ্গে মিয়ানমার মিডিয়াগুলো এআরএসএ’র কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন রকম জ্বালাময়ী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছিল। পাশাপাশি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জনমনে ঘৃণা সঞ্চারের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপও গ্রহণ করে।

অন্যদিকে আগস্ট মাসের প্রথম ভাগেই মিয়ানমার সশস্ত্র বাহিনী প্রধানের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মিটিং অনুষ্ঠিত হয় এবং এ মিটিংয়ের পরপরই উত্তর রাখাইনে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামাদিসহ অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশ ঘটানো হতে থাকে।

আগস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ৩৩ ও ৯৯ লাইট ইনফেন্ট্রি ডিভিশনকে বিমানযোগে রাখাইনে আনা হয়। এসব তথ্য পর্যালোচনা করে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশন নিশ্চিত হয়, এআরএসএ’র নিরাপত্তা চৌকিতে আক্রমণের ঘটনাকে উছিলা ধরে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান শুরু করে।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ আছে, যা গণহত্যার বিষয়টি যে পূর্বপরিকল্পিত তা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। উত্তর রাখাইনে অতিরিক্ত সৈন্য সমাবেশের পর সেনাবাহিনীর সদস্যরা আন্তর্জাতিক সীমানা বরাবর পুলিশ পোস্টগুলোর দায়িত্ব বুঝে নেয়। খুব দ্রুত পুলিশ বাহিনীতে নতুন নতুন পুলিশ সদস্য রিক্রুট করা হয়।

স্থানীয় রাখাইন যুবকদের সশস্ত্র করে তাদের স্বল্পকালীন প্রশিক্ষণও দেয়া হয়। এতকিছুর আয়োজন প্রচুর সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এছাড়াও এর জন্য যথেষ্ট লজিস্টিক্যাল সাপোর্টেরও প্রয়োজন হয়। তথ্যানুসন্ধান মিশন ধৈর্য সহকারে মাঠ পর্যায়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার গ্রহণ, ভিডিও ফুটেজ, স্যাটেলাইটে ধারণকৃত ছবি এবং অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য নিখুঁতভাবে পর্যালোচনা, বিশ্লেষণ এবং গবেষণা করে এ প্রতিবেদনটি তৈরি করে।

জাতিসংঘ ১৮ সেপ্টেম্বর আরও বিস্তারিত তথ্যসংবলিত প্রমাণসিদ্ধ প্রতিবেদন প্রকাশ করবে বলে ঘোষণাও দেয়। জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনকে মিয়ানমার সরকার যথারীতি প্রত্যাখ্যান করে।

জাতিসংঘ রাখাইনে সংঘটিত নৃশংস ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে আকাশ সমান জনপ্রিয় ফেসবুকের যথেচ্ছাচার ব্যবহার নিয়ে। রাখাইনে গণহত্যা শুরুর আগে মিয়ানমার সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে 'ঐধঃব ঝঢ়ববপয ধহফ চৎড়ঢ়ধমধহফধ' পধসঢ়ধরমহ শুরু হয়, তাতে ফেসবুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলা হয়েছে।

প্রতিবেদনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে মিয়ানমারের জন্য কার্যকর ইন্টারনেট হিসেবেও অভিহিত করে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সামরিক জান্তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে যেমন, তাদের দুরভিসন্ধিমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে তেমনি, স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রোহিঙ্গাদের তথ্য আদান-প্রদান মনিটর করা ও সেন্সর করার সুযোগও গ্রহণ করেছে।

অন্য একটি অনুসন্ধানে মিয়ানমারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার সম্পর্কে আরও ভয়ংকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। আগস্টের শুরুতে রয়টার্সের এক তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, হাজার হাজার বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ রোহিঙ্গা মুসলমানদের উচ্ছেদের আহ্বান জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে।

প্রয়োজনে তাদের গুলি করে হত্যা করা, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা এবং রোহিঙ্গাদের শূকর দিয়ে খাওয়ানোর অনুরোধও করা হয়েছে এসব পোস্টগুলোতে। এমনকি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলার ইহুদিদের সঙ্গে যে আচরণ করেছিল সে রকম ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েও পোস্ট দেয়া হয়েছে। মিয়ানমারের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকে।

শুধু ফেসবুক নয়, হোয়াটস্আপ, ইমো, উই চ্যাটের মাধ্যমে রোমহর্ষক আহ্বান অতি দ্রুত মিয়ানমারব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুক ব্যবহার এমন পর্যায়ে গেছে, ফেসবুক কোম্পানির সিইও মার্ক জাকারবার্গকে মিয়ানমারে জাতিসংঘের মহাসচিবের চেয়েও অধিক ক্ষমতাশালী মনে হয়েছে।

কারণ তিনি চাইলেই ফেসবুকের চ্যানেল বন্ধ করে রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের প্রোপাগান্ডা মেশিনকে দুর্বল করে দিতে পারেন। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ অবশ্য স্বীকার করে নিয়েছে, মিয়ানমার ভাষা বোঝে এমন খুব কমসংখ্যক স্টাফ আছে তাদের কোম্পানিতে, যারা মিয়ানমারে ফেসবুক নেটওয়ার্ক মনিটর করতে পারে।

যদিও ২০১৫ সালে তাদের মাত্র দু’জন স্টাফ ছিল, বর্তমানে আছে ঊনসত্তরজন। জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ অবশ্য ২৭ আগস্ট মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও অন্যান্য ১৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং এক কোটি কুড়ি লাখ ফলোওয়ার্সের ফেসবুক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

অন্যদিকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী সম্প্রতি প্রোপাগান্ডার অংশ হিসেবে তাদের পাবলিক রিলেশন্স অ্যান্ড সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার ডিপার্টমেন্ট থেকে ভুয়া ছবিসংবলিত রোহিঙ্গাবিরোধী একটি বই প্রকাশ করে। উল্লেখ্য, প্রকাশিত এ বইটি মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের মন জয় করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে জানা গেছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফসল হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ২৯ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে একথা বলেন।

আমরা জানি রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবেলায় বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ প্রশংসিত হয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা প্রধানরা বাংলাদেশ সফরে এসে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর শেষে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের জন্য বাংলাদেশের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেন।

জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন নিরাপত্তা পরিষদ আয়োজিত বিতর্ক অনুষ্ঠানেও অধিকাংশ বক্তাই রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশের মহানুভবতা প্রকাশের জন্য সাধুবাদ জানিয়েছে।

বর্তমানে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বদরবারে যে ইমেজ সংকট চলছে তা থেকে উত্তরণে নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ সরকারের জন্য এটি একটি প্লাস পয়েন্ট।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ায় পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং নিরাপত্তাজনিত হুমকি মোকাবেলায় দেশের সাধারণ মানুষ ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও সর্বাত্মক সহযোগিতার যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছে, আন্তর্জাতিক মহলের এ প্রশংসা বাক্যে যেন তারই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। অথচ আমাদের কোনো কোনো বক্তব্যে কিংবা বিবৃতিতে সাধারণ মানুষকে তাদের এ ত্যাগের স্বীকৃতি এবং অর্জিত প্রশংসার অংশীদার করতে কেমন যেন কার্পণ্য করে থাকি আমরা।

আমাদের প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের সঙ্গে সুস্থিরভাবে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রেখে তৎপরতা চালিয়েছে। মিয়ানমারের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি খুব স্বাভাবিক, মিয়ানমার এ প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করবে।

কিন্তু তাতে কিছুই আসে যায় না। বিশ্ব সবকিছুই জানে’। প্রতিমন্ত্রীর এ শেষ বাক্যে কিছুটা দ্বিধান্বিত না হয়ে পারা যায় না। কিছুটা বিস্ময়ও জাগে বৈকি! আমরা জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদন প্রকাশকে সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফসল দাবি করি অথচ জোর গলায় একথা বলতে পারি না, ‘জাতিসংঘের এ প্রতিবেদনকে কাজে লাগিয়ে সময়োচিত এবং জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে আমরা আমাদের পদক্ষেপগুলো মেনে নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করব। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বের সব মহলকে একই প্লাটফর্মে নিয়ে আনতে সক্ষম হব।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন, গত বছর রোহিঙ্গা জনস্রোত বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে এযাবৎ সরকারের অনেক কূটনৈতিক কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বলতা চোখে পড়েছে। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা এ বক্তব্যের জন্য যথেষ্ট। ৮ আগস্ট বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফরে গিয়ে রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্রে ‘মিয়ানমার নাগরিক’ লেখার বদলে ‘রাখাইনের বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি’ শব্দ বসাতে বিস্ময়করভাবে রাজি হয়ে এসেছেন।

অথচ মিয়ানমার প্রথম থেকেই রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এসেছে। অপরদিকে, তথ্যানুসন্ধান মিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আয়োজিত রোহিঙ্গা প্রশ্নে বিতর্কে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত হাউ ডো সুয়ান তাদের নেত্রী অং সান সু চির বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত থাকলেও বাংলাদেশ সরকার তাদের প্রত্যাবর্তনের কাজ শেষ করতে সক্ষম হয়নি বলে বক্তব্য দিলে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন তার এ বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করেন।

ফিরে যাওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে বলেই প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়াটি শুরু করা যায়নি বলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জানান। এ ‘আস্থা’ অর্জনের মূল কথাটি হল রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি নিশ্চিত করা, যেন তারা স্বেচ্ছায় নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন করতে পারে। এটি রোহিঙ্গা মুসলমানদেরও মূল দাবি। আর এ আস্থা অর্জনের দায়িত্ব মিয়ানমার সরকারের, অন্য কারও নয়।

গত বছর আগস্টে গঠিত কফি আনানের নেতৃত্বে পরিচালিত আন্তর্জাতিক কমিশনের পেশকৃত প্রতিবেদনেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, আইনের চোখে সমানাধিকার ও মিয়ানমারের যে কোনো অঞ্চলে গমনের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চয়তা প্রদানের সুপারিশ করা হয়।

এতদসত্ত্বেও মিয়ানমারের দাবির মুখে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্রে ‘মিয়ানমারের নাগরিক’ লেখার পরিবর্তে ‘রাখাইনের বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি’ শব্দ লেখার ব্যাপারে রাজি হওয়ায়, এটাই বোঝায় কি- মিয়ানমার সরকার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানের দাবি আদায়ের আন্তর্জাতিক উদ্যোগকে পাশ কাটিয়ে, মূল সমস্যার সমাধান না করেই যে কোনো উপায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতে রোহিঙ্গা ইস্যুর পরিসমাপ্তি ঘটান?

রোহিঙ্গা প্রশ্নে নিরাপত্তা পরিষদের বিতর্কে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য, অপরদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমারের ইচ্ছানুসারে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ‘রাখাইনের বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি’ হিসেবে মেনে নেয়া শুধু পরস্পরবিরোধী নয়, বরং এটিকে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা ও নমনীয় কূটনৈতিক তৎপরতার বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২৮ আগস্ট নিরাপত্তা পরিষদের বিতর্কে চীন ও রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতও বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সাম্প্রতিক সমঝোতার কথা উল্লেখ করে রোহিঙ্গা ইস্যুকে দ্বিপক্ষীয়ভাবে সমাধান করতে উপদেশ দেয়। চীনা রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নটি সমস্যা সমাধানের পূর্বশর্ত হিসেবে ধরা ঠিক হবে না বলেও জানান।

সাফল্যজনক কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে যে বৃহত্তর স্বার্থসিদ্ধি করা সম্ভব তার প্রকৃত উদাহরণ হল ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। সে সময় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা সত্ত্বেও বিশ্বের দ্বারে দ্বারে ঘুরে ভারত যে কূটনৈতিক বিজয় অর্জন করেছিল, বাংলাদেশ সরকারেরও উচিত ঠিক একইভাবে আমাদের কূটনৈতিক তৎপরতাকে আরও বেগবান করে বিশ্বের সব পরাশক্তিকে একই প্লাটফর্মে এনে পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করা।

সূক্ষ্ম কূটনৈতিক তৎপরতায় আমাদের দুর্বলতা থাকলেও আশার কথা হল জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক মহল রোহিঙ্গা ইস্যুতে বেশ নড়েচড়ে বসেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সসহ অন্যান্য রাষ্ট্র জাতিসংঘের প্রতিবেদনকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এ ব্যাপারে বেশ তৎপর। তিনি নিরাপত্তা পরিষদে আয়োজিত উন্মুক্ত আলোচনায় বাস্তবসম্মত বক্তব্যে বলেছেন, মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যে বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, কোনো যুক্তি দিয়েই তা ন্যায়সঙ্গত প্রমাণ করা যাবে না।

জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত নিকি হেলি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী যে আচরণ করেছে, সেই কঠিন সত্যকে বিশ্ববাসী কোনো অবস্থাতেই এড়িয়ে যেতে পারে না। তিনি মিয়ানমারের ওইসব অশুভ শক্তি প্রয়োগকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কাছে আহ্বান জানান।

নিরাপত্তা পরিষদের এ বিতর্ক অনুষ্ঠানে অন্যান্য অধিকাংশ বক্তা রোহিঙ্গাদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। এ বিচার সম্পন্ন করার দায়িত্ব একা মিয়ানমার সরকারের নয়, এ বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংযুক্ত থাকতে হবে বলে তাদের বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

চীন ও রাশিয়ার প্রতি ইঙ্গিত করে তারা নিরাপত্তা পরিষদ সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য ভুলে মানবতার স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যবস্থা নেয়ারও আবেদন করেন। আমাদের এখন ১৮ সেপ্টেম্বর মানবাধিকার পরিষদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেয়ার পর, সেটা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ এবং অন্য সদস্যরা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কী কর্মপন্থা গ্রহণ করে তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter