চাকরিতে প্রবেশের বয়স বাড়ানো হোক

  নাজমুল হোসেন ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চাকরিতে প্রবেশের বয়স
ফাইল ছবি

নব্বইয়ের দশকের আগে বাংলাদেশে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ছিল ২৭ বছর আর অবসরের বয়সসীমা ছিল ৫৭ বছর। তারপর গড় আয়ু আর কর্মক্ষমতার বিচার করে ১৯৯১ সালের জুলাই মাসে শুধু বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩০ বছর করা হয়।

তবে সর্বশেষ বিগত ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে শুধু অবসরের বয়স ৫৭ থেকে বাড়িয়ে সাধারণদের জন্য ৫৯ বছর আর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৬০ বছর করা হয়। তবে এই অবসরের বয়স দৃশ্যমান কোনো দাবি-দাওয়া ছাড়াই সরকার স্বেচ্ছায় বাড়িয়েছে।

একতরফাভাবে শুধু অবসরের বয়স বাড়ানোর কারণে স্বাভাবিকভাবেই শূন্যপদের সংখ্যা কমে যায়। এরপরই চাকরির আবেদনে বয়স বাড়ানোর দাবি তুলে সারা দেশের সাধারণ ছাত্রছাত্রী ও চাকরিপ্রার্থীরা।

তারা ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি জেলার প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন, অনশন, সরকার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্মারকলিপিও দিয়েছেন। জাতীয় সংসদেও ‘পয়েন্ট অব অর্ডারসহ’ রেকর্ড সংখ্যকবার এর প্রস্তাব ওঠে। মাননীয় রাষ্ট্রপতি স্পিকার থাকাকালীন ২০১২ সালে ৩১ জানুয়ারি ৭১ বিধিতে জনগুরুত্বসম্পন্ন নোটিশের ওপর আলোচনা করার সময় সর্বপ্রথম এর পক্ষে আলোচনা করেন।

সরকার বিষয়টিকে তখন আমলেও নিয়ে বলেছিল, পরেরবার ক্ষমতায় এলে এর বাস্তবায়ন করা হবে। ২০১৪ সালে নতুন করে ক্ষমতায় এলেও আজ পর্যন্ত হয়নি এই দাবির বাস্তবায়ন। এর বাস্তবায়নের জন্য বারবার লাখ লাখ শিক্ষার্থী তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করেছেন।

শিক্ষার্থীরা দাবি করেছেন, বিগত দশকে সেশনজট, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বসহ নানা কারণে তারা অনার্স-মাস্টার্স শেষ করেছেন ২৭-২৮ বছরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাতটি কলেজেও রয়েছে সেশনজট।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সেশনের মাস্টার্স পরীক্ষা সময়মতো অনুষ্ঠিত না হয়ে অসময়ে হচ্ছে। তাদের জীবন থেকে অকালে হারিয়ে যাওয়া ৫-৬ বছর ফিরিয়ে দিতে তো সরকারকেই এর দায়ভার নিতে হবে।

সরকার সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, সেশনজট কমার কারণে আবেদনে বয়সসীমা বাড়ানো যাবে না। তাহলে গত এক দশকেরও বেশি সময়ের ভয়াবহ সেশনজটে বয়স হারিয়ে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে সরকার কী উদ্যোগ নেবে?

সরকারি নীতির মতো বেসরকারি সেক্টরও ৩০-এর পরে জনবল নিয়োগ না দেয়ায় এসব বেকার সেখানেও প্রবেশ করতে পারছে না। বয়স নামের শিকলে হাত-পা বাঁধা থাকায় তারা রীতিমতো হতাশা আর অনিশ্চিত আগাম ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তায় ভুগছে।

জানা যায়, বর্তমান বিশ্বের ১৬০টিরও বেশি দেশের চাকরির নিয়োগে আবেদনের বয়সসীমা ন্যূনতম ৩৫ থেকে ৫৯ বছর পর্যন্ত। তাহলে কি বাংলাদেশ নামের ছোট্ট ভূখণ্ডটা পৃথিবী নামক গ্রহের বাইরে? কিসের এত বাধা এই বয়স বাড়ানোর পথে?

বয়স বাড়িয়ে দিলেই কি সবাইকে চাকরি দিতে হবে বা সবার চাকরি হয়ে যাবে? এতে শুধু প্রতিযোগিতার সুযোগটা বিস্তৃত হবে আর প্রকৃত মেধাবীরাই চাকরি পাবে। তাছাড়া একই দেশে চাকরির নিয়োগে দ্বৈতনীতি কখনই কাম্য নয়।

এ দেশের চাকরির প্রজ্ঞাপনে আবেদনের বয়সসীমা ১৮ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ বছর পর্যন্ত নিয়ম থাকলেও এটা শুধু সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের বেলায়ই প্রযোজ্য। কারণ চাকরিতে প্রবেশনারি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সুবিধা পাচ্ছেন যেমন উপজাতিরা ৩২ বছর, ডাক্তাররা ৩২ বছর, জুডিশিয়ালরা ৩২ বছর, নার্সরা ৩৬ আর বিভাগীয় প্রার্থীরা পাচ্ছেন ৪০ বছর পর্যন্ত।

অথচ বাংলাদেশ সংবিধানের ‘সরকারি নিয়োগ লাভে সুযোগের সমতা’ অংশে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে- ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদলাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’

অথচ বাস্তবে এর উল্টো নীতিই অনুসরণ করা হচ্ছে। আমরা কখনই বুক ফুলিয়ে বলতে পারব না, এ ক্ষেত্রে আমরা সাংবিধানিক নীতিতেই রয়েছি।

উল্লেখ্য, চাকরির আবেদনে বয়সসীমা বাড়ানোর অকাট্য দলিল ও যৌক্তিকতার প্রমাণস্বরূপ বলা যায়, ২০১২ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২১তম বৈঠকে ৩২ বছরের সুপারিশ করা হয়; ২০১৬ সালের জেলা প্রশাসক সম্মেলনে সবগুলো জেলার প্রশাসক ৩৩ বছরের সুপারিশ করেন এবং সর্বশেষ চলতি বছরের ২৭ জুন আবারও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির ২৯তম বৈঠকে ৩৫ বছরের সুপারিশসহ দ্রুত এর বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়কে বলা হয়।

কমিটির সদস্যরা বিশ্বের সব দেশের নিয়োগবিধি, দেশের বর্তমান গড় আয়ু, আন্দোলনকারী সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের তুলে ধরা সব যৌক্তিক দিকের সঠিক আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে বয়স বাড়ানোর বিষয়টিকে আমলে নিয়ে এই সুপারিশ করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হয়নি।

বেশ কয়েকবার চাকরির আবেদনে বয়সসীমা বাড়ছে- এ সুর উঠলেই যুবসমাজের মনে জমে থাকা হতাশার কালো মেঘে ঢাকা অমানিশার ঘোর অন্ধকার কেটে যায়। কিন্তু এ যে শোনা আর গুজবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ! আজ পর্যন্ত কেন এর বাস্তবায়ন হচ্ছে না? কেনই বা তাদের দমিয়ে রাখা হবে? দেশ গড়ার কাজে তারাও তো সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চায়।

সাংবিধানিকভাবে তারা এ দেশের নাগরিক হয়ে সুনাগরিকের সব বৈশিষ্ট্য বহন করে থাকলে কেন সাংবিধানিকভাবে চাকরির আবেদনে অন্যদের মতো সমসুযোগ পাবে না? দেশে দিন দিন বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৬-২০১৭) অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ২৭ লাখ বেকার রয়েছে; যার অর্ধেকেরও বেশি স্নাতক ও

স্নাতকোত্তর শেষ করা চাকরি প্রত্যাশী। তবে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাটি আরও বড়।

বিভিন্ন চিন্তাবিদ, গবেষক আর বিশ্লেষক বলেছেন, চাকরির আবেদনে কোনো বয়সসীমা থাকা কখনই উচিত নয়। একজন লোক বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করে যে কোনো সময় মেধা আর শিক্ষাগত যোগ্যতার বলে প্রজাতন্ত্রের কাজে প্রবেশ করতে পারবে। মানুষের এগিয়ে যেতে বয়স কোনো বাধা নয়। আর তাই সেটা প্রমাণ করেছেন মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ, যিনি বর্তমান বয়স ৯২ বছরেও নির্বাচন করে বিপুল পরিমাণ ভোটে জয়লাভের মাধ্যমে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। দার্শনিক ফিলিপ ম্যাসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘যে মনের দিক থেকে বৃদ্ধ নয়, বার্ধক্য তার জীবনে আসে না।’ তাহলে লাখ লাখ তরুণ-তরুণী কেন পারবে না?

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করার লক্ষ্যে সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৩২ বছর করার প্রস্তাব করলেও এটি সরকারের নীতিনির্ধারণী বিষয় হওয়ায় সেটা ইচ্ছামতো বাড়ানোর এখতিয়ার সরকারের হাতে রয়েছে বলেও জানা যায়। এমন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করার দাবিতে নতুনভাবে ঝড় ওঠে।

সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের গড়ে ওঠা সংগঠন ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র পরিষদ’ শেষবারের মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিবকে স্মারকলিপি প্রদান করেছে। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের আগেই অর্থাৎ আসন্ন ৪০তম বিসিএসের আগেই যেন চাকরির আবেদনে বয়সসীমা ন্যূনতম ৩৫ বছর করা হয়।

প্রসঙ্গত, গত ২৯ আগস্ট সচিবালয়ে অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকরা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে চাকরির আবেদনে বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ করা হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাকরির বয়স বাড়ালে তার কোনো আপত্তি নেই।

তিনি আরও বলেন, চাকরির নিয়োগ হওয়া উচিত চুক্তিভিত্তিক (কন্ট্রাক্ট বেসিস)। সেটা ১০ বছরের বা ১৫ বছরের জন্য। সেটা হতে পারে যে কোনো বয়সে। এই বিষয়টিকে কয়েকটি স্বনামধন্য পত্রিকা অন্যভাবে অর্থাৎ বিকৃত আকারে প্রকাশ করেছে, যা সত্যিই খুবই দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। বিষয়টি যুব সমাজের মাঝে রীতিমতো হতাশা আর বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে।

তাছাড়া চাকরির আবেদনে বয়সসীমা ন্যূনতম ৩৫ বা তার বেশি করলে সরকার বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে লাভবান হবে।

যেমন- ১. শিক্ষিত বেকাররা প্রজাতন্ত্রের কাজে প্রবেশ করলে দেশ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।

২. শিক্ষিত তরুণরা নানারকম অপরাধকর্ম যেমন- মাদক সেবন, মাদক ব্যবসা, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে আর যুক্ত হয়ে পড়বে না।

৩. বেসরকারি সেক্টরগুলোয়ও যেমন ব্যাংক, বীমা, বিভিন্ন কর্পোরেট অফিস ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতেও সমভাবে প্রবেশের সুযোগ থাকবে। মেধাবীরা বেকারত্বের যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করার মতো পথ থেকে সরে যাবে।

৪. নিয়োগ পরীক্ষায় কঠিন প্রতিযোগিতা থাকায় যোগ্য লোক সঠিক মেধার বলে নিয়োগ পাবে।

৫. প্রতিটি আবেদনের মাধ্যমে একেকটা পদের বিপরীতে ব্যাংক ড্রাফট বা ট্রেজারি চালান মারফত সরকার কয়েক কোটি করে টাকা পাবে।

৬. উচ্চশিক্ষিত তথা পিএইচডি ডিগ্রিধারীরা প্রজাতন্ত্রের কাজে লাগবে এবং ব্রেনড্রেনের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় চলে আসবে।

৭. সরকারের আগাম আধুনিক সব রূপকল্প বাস্তবায়নে সবাই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করবে।

তাই সামগ্রিক দিক বিবেচনায় চাকরির বয়স ন্যূনতম ৩৫ বছর করে যুবসমাজকে দেশের কাজে লাগাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হবে, এটাই প্রত্যাশা।

নাজমুল হোসেন : প্রকৌশলী

[email protected]

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter