শক্তির রূপান্তর এবং নিরাপদ সড়ক

  ড. শ ফি ক আ ল ম ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিরাপদ সড়ক চাই

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন স্তিমিত হলেও এর অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ নির্ধারিত হবে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ নেতৃত্বের পরবর্তী কার্যক্রমের ওপর। ২০৪১ সাল নাগাদ একটি উন্নত দেশের স্বপ্নচারী হিসেবে আমরা ভালো কিছুই প্রত্যাশা করি। এ নিবন্ধে তা সড়ক নিরাপত্তা আন্দোলনের মাঝেই নির্ধারিত রাখা হল, যদিও এর প্রভাব কার্যত সর্বমুখী।

নিরাপদ সড়কের জন্য সাধারণত তিনটি ঊ-এর ওপর জোর দেয়া হয়। এগুলো হচ্ছে Education (শিক্ষা), Enforcement (প্রয়োগ) আর Engineering (প্রকৌশল)। এর মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও সময়সাপেক্ষ বিষয় হচ্ছে প্রথমটি অর্থাৎ শিক্ষা। এটা অর্জনের সঙ্গে একটি জাতির সংস্কৃতিরও বিশেষ সম্পর্ক আছে। দ্বিতীয় কঠিন কাজটি হচ্ছে প্রয়োগ। এর সঙ্গে যুক্ত আছে সুশাসন ও শিক্ষার বিষয়টি। আর তুলনামূলকভাবে সহজ বিষয়টি হচ্ছে প্রকৌশল, যেটা শুধু অর্থ ব্যয়ের সামর্থ্যওে বেশ খানিকটা অর্জন করা সম্ভব। তবে এর সঙ্গে শিক্ষা যোগ হলে প্রায় পুরোটাই অর্জিত হয়।

এখন দেখা যাক এ তিন ‘ই’-এর ওপর সাম্প্রতিক আন্দোলনের প্রভাব কতটুকু। বস্তুত, এ আন্দোলন আমাদের নিরাপদ সড়ক প্রাপ্তির পথে এগিয়ে দিতে পারে কয়েক যুগ, যদি যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এর অন্তর্নিহিত শক্তিকে আমরা সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি। যে কোনো জাতির ক্ষেত্রে যথাযথ শিক্ষার প্রধান প্রাপ্তি হচ্ছে ভালো কিছু করার জন্য জনমানুষের উদ্বুদ্ধ হওয়া।

নিরাপদ সড়কের এ আন্দোলন ও ছাত্রদের গৃহীত কার্যক্রম শুধু তাদের নিজেদের উদ্বুদ্ধ হওয়ার বিষয়টিকেই নির্দেশ করে না, এর প্রতিক্রিয়ায় বড়দের মাঝেও ভ্রান্তিমুক্তির একটা চাপ লক্ষণীয়। এর ফলে ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে তুলনামূলকভাবে শক্ত হাতে ‘প্রয়োগ’ কার্যক্রম নেয়া সম্ভব হচ্ছে।

প্রকৌশল ক্ষেত্রেও এ আন্দোলনের ফলে নানাবিধ সড়ক নিরাপত্তামূলক উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা যেমন সম্ভব হবে, তেমনি এর বাস্তবায়নে এক ধরনের উন্নতি আশা করা অমূলক নয়। বিশেষ করে এ আন্দোলন প্রজন্মের যারা প্রকৌশলী হয়ে কয়েক বছর পর বিভিন্ন সরকারি দফতরে যোগ দেবে, তারা তখন স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়ে অধিক মনোযোগ দেবে বলে আশা করা যায়।

উপরের বাস্তবতার আলোকে সরকারকে অবিলম্বে একটি সড়ক নিরাপত্তা রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে, যার মূল প্রতিপাদ্য হবে এ ছাত্রশক্তির গঠনমূলক অংশগ্রহণ। অন্যথায় দিকভ্রান্ত আমলাতন্ত্র আর ভুইফোঁড় রাজনীতি সরকারের আর সব ভালো কাজের মতোই এ বিষয়ে যে কোনো উদ্যোগকে জনঅংশগ্রহণে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হবে। দেশ-বিদেশে সড়ক নিরাপত্তায় কাজের অভিজ্ঞতা থেকে এ বিষয়ে কয়েকটি প্রস্তাবনা সরকারের বিবেচনার জন্য তুলে ধরছি।

বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০০৪ সালে ব্র্যাকের মাধ্যমে বিশেষ সড়ক নিরাপত্তামূলক পাইলট কর্মসূচি হাতে নেয়। মহাসড়ক বরাবর বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে সড়ক নিরাপত্তা ছাত্র ব্রিগেড গঠন করা হয়। চালক ও গ্রামীণ সাংবাদিকদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। বিভিন্ন বাস টার্মিনালে চালক সমিতির সঙ্গে উদ্বুদ্ধকরণ সভা করা হয় এবং জনগণকে নিয়ে শোভাযাত্রা করা হয়।

জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী মমতাজকে দিয়ে সড়ক নিরাপত্তার ওপর গানের সিডি বের করে বিতরণ করা হয় এবং মিনা কার্টুনের আলোকে একটি সড়ক নিরাপত্তা কার্টুন তৈরি করা হয়। মুস্তফা মনোয়ার, শিশির ভট্টাচার্যের মতো দেশবরেণ্য শিল্পী-সাহিত্যিকদের অংশগ্রহণে ‘লাল, হলুদ আর সবুজ’ নামের কার্টুনটির কয়েকটি এপিসোড নির্মাণ করা হয় এবং তা একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করা হয়।

প্রকল্প প্রস্তাবনায় সরকারি-বেসরকারি সহায়তায় পরবর্তীকালে আরও কিছু এপিসোড নির্মাণ করে মিনা কার্টুনের মতো ব্যাপকভাবে দেশব্যাপী প্রচারের কথা বলা ছিল। এ ছাড়া, সড়ক নিরাপত্তায় টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে পাইলট কর্মসূচির সফলতার আলোকে বিভিন্ন কার্যক্রম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার কথাও উল্লেখ ছিল। তবে দুঃখজনকভাবে পরবর্তীকালে এর কিছুই আর হয়নি।

উপরের প্রকল্প যেখানে শেষ হয়েছে, সেখান থেকে কি আবার শুরু করা যায় না? দেশব্যাপী সড়ক নিরাপত্তা ছাত্র ব্রিগেড গঠন করা যেতে পারে। এবারের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এতে ছাত্রদের ব্যাপক অংশগ্রহণ আশা করা যায়। শিক্ষক, পুলিশ, সড়ক প্রকৌশলী, প্রশাসন ও সুধীজনের প্রতিনিধিত্বে গঠিত কমিটির সহযোগিতায় এই ব্রিগেড নানাবিধ উদ্ভাবনী কার্যক্রম হাতে নিতে পারবে, যেমন- নিয়ম মেনে সড়কে চলাচল এবং সড়ক ব্যবহার বিষয়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দেয়া ও উদ্বুদ্ধকরণ, সড়কের ড্রেন আবর্জনামুক্ত রেখে পানিতে নষ্ট হওয়া থেকে সড়ক বাঁচিয়ে রাখা, সড়কের ওপর হাটবাজার না বসানো ও নির্মাণসামগ্রী না রাখার বিষয়ে প্রশাসনকে সহায়তা করা, সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের সহায়তায় এগিয়ে আসা ও পুলিশকে জানানো এবং সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রে প্রেরণ করা ইত্যাদি।

জনঅংশগ্রহণ যে কত দ্রুত ও শৃঙ্খলার সঙ্গে একটি দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তা বিধ্বস্ত আফ্রিকার রুয়ান্ডায় ২০১০-১১ সালে কর্মকালীন আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। ‘উমুগান্ডা’ নামে একটি কর্মসূচির অধীনে দেশটির প্রতিটি সক্ষম নাগরিক প্রতি মাসের শেষ শনিবার সারা দেশে বিশেষ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নেয়। এর আওতায় জনগণকে দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম বিষয়ে মতামত প্রদান ও অবগতকরণ ছাড়াও স্থানীয়ভাবে বিবাদ নিরসনেও উৎসাহ দেয়া হয়। এ কর্মসূচির সফলতায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনশৃঙ্খলার বিবেচনায় এখন অনেকেই রুয়ান্ডাকে আফ্রিকার সিঙ্গাপুর বলে।

ছাত্র ব্রিগেড গঠনের পাশাপাশি ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ছাত্র ব্রিগেড ট্রাফিক সপ্তাহ পালনে পুলিশকে সহায়তা করতে পারলে এর ফল হবে অনেক ব্যাপক। এ ছাড়া সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে ছাত্রদের অংশগ্রহণে শোভাযাত্রা, চিত্রাঙ্কন, বিতর্ক প্রতিযোগিতাসহ নানাবিধ কর্মকাণ্ড স্থানীয়ভাবে সড়ক প্রকৌশল ও প্রয়োগ বিষয়ে সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটিয়ে অধিকতর কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়তা করবে।

এসব উদ্যোগের ফলে দেশব্যাপী ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গঠনেরও এক অবারিত সুযোগ তৈরি হবে। পর্যায়ক্রমে সফলতার নিরিখে সড়ক নিরাপত্তার পাশাপাশি অন্যান্য জাতি গঠনমূলক কাজের জন্যও এ ব্রিগেডের কার্যক্রমকে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।

ধূমকেতুর মতো ছুটে আশা এই কিশোর ছাত্রশক্তির যথাযথ ব্যবহারই জাতির প্রত্যাশা। শক্তির কোনো ক্ষয় নেই, তবে এর রূপান্তর আছে। সে রূপান্তর যেমন হতে পারে মানবসভ্যতার বিকাশের কারণ, তেমনি হতে পারে মানবসভ্যতার বিনাশেরও কারণ। তবে সিদ্ধান্তটি আসে মানুষের হাত ধরেই। আধুনিক সমাজে এর দায় বর্তায় সরকারের ওপর।

ড. শফিক আলম : অস্ট্রেলিয়ায় কর্মরত সড়ক প্রকৌশলী

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter