নির্বাচন, বিদেশনির্ভরতা ও জাতীয় ঐক্য

  ড. এমএলআর সরকার ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ
ছবি: সংগৃহীত

সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো বিদেশিদের কাছে যেভাবে দেনদরবার করছে তাতে দেশের আত্মমর্যাদা আজ ভূলুণ্ঠিত। বিএনপি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের কাছে বলছে, আপানারা সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রদূতদের বলছে আপনারা চিন্তা করবেন না, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। শুধু তাই নয়, অন্য দেশে গিয়ে বিএনপি বলছে, আমাদের সমর্থন দিন। সরকারি দলের প্রতিনিধি সেই একই দেশ থেকে ফিরে এসে বলছে, অমুক দেশ বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না।

সর্বোপরি তৃতীয় ফ্রন্ট বা তৃতীয় শক্তি নামে যে জোটটি আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করছে, তারাও বিদেশিদের বলছে আমাদের সমর্থন দিন, আমরাই দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনব। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে দেশের শুধু সীমানাগত স্বাধীনতা আছে। কিন্তু কীভাবে দেশটি পরিচালিত হবে তা নির্ভর করছে অন্য দেশের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। দেশবাসী এ অবস্থায় লজ্জিত ও শঙ্কিত।

একটি দেশের বন্ধুপ্রতিম দেশ থাকে। বিপদে-আপদে তাদের সাহায্য-সহযোগিতা এবং পরামর্শ নেয়ারও প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো যতই সাহায্য করুক বা শক্তিশালী হোক, কোনোভাবেই তাদের আমাদের ভাগ্য নির্ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ দেয়া উচিত না। প্রশ্ন হচ্ছে কেন তাহলে আমরা এটি করছি?

আমরা কি ভুলে গেছি বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ? আমরা কি অর্থনৈতিকভাবে অন্য দেশের ওপর নির্ভরশীল? দেশের জনগণ কি জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে অপারগ? আসলে দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এ বিষয়গুলো ভালো করেই জানেন, তবে তারা সবাই চান ক্ষমতা এবং তা যেনতেন প্রকারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এই মুহূর্তে কোনো দলেরই ক্ষমতায় আসার মতো প্রয়োজনীয় জনসমর্থন নেই, যা নিচের তিনটি অবস্থা থেকে অনুমেয়।

অনেকেই বলেন নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই জোট কি ইতিপূর্বে এমন কাজ করেছে, যেজন্য তাদের ব্যাপক জনসমর্থন সৃষ্টি হয়েছে? জনগণ কি বিশ্বাস করে যে তারা ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নতি হবে ও দুর্নীতি হ্রাস পাবে? আসলে তাদের সম্বল হচ্ছে খালেদা জিয়ার বন্দিত্ব এবং আওয়ামী লীগের কিছু ব্যর্থতা ও দুর্নীতি। আওয়ামী লীগের দুর্নীতির প্রতিবাদে কিছু মানুষ ক্ষমতার পরিবর্তন চায়, কিন্তু বিএনপির অতীত কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে না। ফলে বিএনপির পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়নি। এখানেই আসলে তাদের ভয়। ফলে জনগণের সমর্থনের ওপর তাদের ভরসা নেই, বিদেশিদের কাছে তারা ধরনা দিচ্ছে, একটু সহায়তার আশায়।

আওয়ামী লীগ অনেক কাজ করেছে, যার ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে। তবে ঝুলিতে মন্দ কাজের পরিমাণও কম নেই। আওয়ামী লীগের এখনও জনসমর্থন আছে, কিন্তু তাদের ক্ষমতায় আসার পথে বড় প্রতিবন্ধক হতে পারে দেশের মানুষের ভুলোমন।

মানুষ এর মধ্যে ভুলে গেছে বিএনপি জোটের বিদ্যুৎবিহীন খুঁটি এবং দুর্নীতির কথা। ভোটের সময় হয়তো জনগণের মনে থাকবে খালেদা জিয়ার কারাবাস, ব্যাংক ব্যবস্থার ধ্বংস, ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মকাণ্ড, অতিরিক্ত আমলা-তোষণ এবং ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার কথা। ফলে অনেকেই সম্ভবত ক্ষমতার পরিবর্তন দেখতে চাইবে। আর এটি চাইলেই আওয়ামী লীগের অবস্থা হবে সংকটাপন্ন। তাই তাদেরও প্রয়োজন বিদেশি সমর্থন!

তৃতীয় ফ্রন্টের অধিকাংশই এলিট শ্রেণীর এবং তাদের জনসমর্থন প্রায় শূন্যের কোঠায়। তারা সরকার পরিবর্তন চায়। কিন্তু নিজেরাও সম্ভবত জানে না কীভাবে সরকার পরিবর্তন করবে এবং পরিবর্তন হলেও তাদের ভূমিকা কী হবে। এছাড়াও সবচেয়ে বড় কথা সরকার পরিবর্তন করার মতো তাদের জনসমর্থন নেই। নিকট অতীতে তারা জনগণের জন্য এমন কোনো কাজ করেনি যে জনগণ তাদের ক্ষমতায় বসাবে। ফলে তারাও চেষ্টা করছে, কীভাবে বিদেশি সমর্থন পাওয়া যায়।

ইতিহাসের শিক্ষা বলে, বহিঃশক্তির দ্বারা দেশের সমস্যার সমাধান হয় না, বরং তাদের হস্তক্ষেপে সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়। বিশ্বের অনেক সম্পদশালী দেশ বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের কারণে ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে এবং হচ্ছে, যার জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে ইয়েমেন, সিরিয়া, আফগানিস্তানসহ অনেক দেশ। এজন্যই বহুক্ষেত্রে আমরা আমাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার আদায়, আমাদের বিরুদ্ধে নানা চক্রান্তকে প্রতিহত, এমনকি নিজেদের সমস্যা সমাধানেও ব্যর্থ হচ্ছি।

যেমন, তিস্তার পানির জন্য আমরা বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের সঙ্গে অনেকবার কথা বলেছি। তারাও আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু অদ্যাবধি এর ফলাফল শূন্য। সরকার ভারতকে অনেক সহায়তা করেছে। কেন তাহলে আমরা পানির ভাগ পাচ্ছি না? এজন্য দায়ী হচ্ছে আমাদের রাজনৈতিক বিভেদ এবং ভোটের সময় ভারতের সমর্থনের আশায় দৌড়-ঝাঁপ। সমর্থন হারানোর ভয়ে সরকার-বিরোধী দল কেউ বলিষ্ঠ কণ্ঠে ভারতের কাছে পানির কথা বলে না। এমনভাবে বলে যে, ভারত দয়াপরবশত পানি দিলে আমরা উপকৃত হব। তিস্তা, রোহিঙ্গা কিংবা নব্য আসাম সমস্যা সবই একই সূত্রে ঝুলে আছে এবং থাকবে। এসবের একটিরও সমাধান হবে না। আমাদের বিভেদ থাকলে ভারত একবার একথা এবং আরেকবার অন্যকথা বলেই শুধু সময়ক্ষেপণ করবে।

দ্বিতীয়ত, এবার আসুন অন্য দেশ, যেমন চীনের কথায়। চীন আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র, দুঃখের বিষয় তারাও এখন আমাদের রাজনীতি নিয়ে কথা বলছে। আসলে আমরাই তাদের উৎসাহিত করছি এই বলে যে, অমুক দল ভারতের সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এলে তোমাদের স্বার্থের বিঘ্ন হবে। তোমরাও কথা বল এবং আমাদের সমর্থন দাও।

আমরা ক্ষমতায় এলে তোমাদের সঙ্গেই বেশি কাজ করব। দেখুন, চীন আমাদের ভোট নিয়ে কথা বললেও রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কিছুই করছে না। বরং চীনের বিরোধিতায় সমস্যাটি নিরাপত্তা পরিষদে উঠছে না। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার দুই দেশেরই সম্পর্ক আছে। কিন্তু চীন মিয়ানমারের পক্ষে কাজ করছে, কারণ মিয়ানমার রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ আর আমরা বিভক্ত। জঘন্য কাজেও তাদের সামরিক বাহিনী, সু চি সরকার এবং বিরোধী দল একতাবদ্ধ। ফলে শুধু চীনই নয়, অন্য যাদের সঙ্গে (যেমন ভারত ও রাশিয়া) মিয়ানমারের বাণিজ্যিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে তারাও তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে রোহিঙ্গা সমস্যাটি নিয়ে কিছু করছে না এবং করতে দিচ্ছে না।

তৃতীয়ত, রাজনৈতিক অনৈক্য আমাদের অনেক অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানের পথকেও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে কোটা সংস্কার এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। দুটি আন্দোলনের বিষয়বস্তু অরাজনৈতিক এবং এর সুষ্ঠু সমাধান ছিল প্রায় সবারই কাম্য। কিন্তু বিরোধী দলের অযাচিত প্ররোচনা এবং সরকারের গৃহীত কঠোর পদক্ষেপের কারণে এ সুন্দর আন্দোলন দুটির পরিসমাপ্তি হল অসুন্দরভাবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ঐক্য থাকলে এমনটি কোনোভাবেই ঘটত না।

আসলে প্রয়োজন একটি কল্যাণধর্মী রাষ্ট্রের, যেখানে দেশের স্বার্থে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করবে। প্রয়োজন এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক যার পেছনে থাকবে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন। কিন্তু এরকম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং নেতৃত্ব একদিনে তৈরি হয় না। বঙ্গবন্ধুর মতো নেতা আজ আমাদের বড়ই প্রয়োজন। যিনি স্বাধীনতার জন্য জীবনের ভয়কে বিসর্জন দিয়েছিলেন; কিন্তু এদেশের সম্মানকে বিকিয়ে দেননি। তাই তো তিনি ভারতীয় গোয়েন্দাদের বলেছিলেন আমার বিরুদ্ধে কে শত্রুতা করছে তা নিয়ে তোমাদের মাথা ঘামাতে হবে না।

বস্তুত, আমাদের প্রয়োজন একজন মাহাথির মোহাম্মদের। যিনি চীনকে দৃঢ়ভাবে বলেছেন, আমি এমন বিনিয়োগ চাই না যেখানে ‘contract goes to China, borrowing huge sums of money from China, use workers from China, imported everything from China, and even the payment is made in China’. শুধু তাই নয়, চীন সফরে গিয়ে তিনি বলেছেন ‘we dont want a nwe version of colonialism happening because of open free trade, we want free trade but it must also be fair trade’.

কিন্তু দুঃখজনক সত্য হল আমরা বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাব না এবং মাহাথির এদেশে জন্মগ্রহণ করেননি। তাহলে আমরা কি এই অবস্থা থেকে কোনোদিনও পরিত্রাণ পাব না? এর উত্তরে এটুকু বলা কর্তব্য যে, আমাদের অবশ্যই এ ব্যর্থতার বেড়াজাল ছিন্ন করে একটি রাজনৈতিক ঐক্য বা সমঝোতায় উপনীত হয়ে একটি মর্যাদাবান জাতি হিসেবে দাঁড়াতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে কে এই রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ গ্রহণ করবে? ড. কামাল হোসেন সাহেবের নেতৃত্বে একটি জাতীয় ঐক্য গঠনের চেষ্টা চলছে যা সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু জাতীয় ঐক্য বা জাতীয় সরকার গঠনের নামে তারা বিভিন্ন কথাবার্তা বলে পুরো প্রক্রিয়াটিকেই বিতর্কিত করছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তারা জাতীয় ঐক্য বা জাতীয় সরকার গঠনের চেয়ে আওয়ামী লীগবিরোধী ঐক্য গঠন করে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনে নিজেরাও ক্ষমতার একটি ভাগীদার হতে চান।

ড. কামাল সাহেবকে বিনীতভাবে বলছি, সত্যিই যদি আপনি দেশের কল্যাণে জাতীয় ঐক্য গঠন করতে চান, তবে দুই বৃহৎ দলকে নিয়েই সেই চেষ্টা করাটাই হবে শ্রেয়। জাতীয় ঐক্যে আওয়ামী লীগকে আনতে হলে তাদের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি করবেন না। এখনও আপনিই একমাত্র ব্যক্তি যার সমাজে এবং শেখ হাসিনার কাছেও গ্রহণযোগ্যতা আছে, তা না হলে কেমন করে আপনার অনুরোধে গ্রেফতারকৃত সব ছাত্রের ঈদের আগেই জামিন হল। তবে আওয়ামী লীগকে নিয়ে জাতীয় ঐক্য করতে গেলে এ সরকারের কাজ সম্পর্কে কিছু ভ্রান্তধারণা আপনাকে দূর করতে হবে, যেগুলো আপনি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন।

দেশের উন্নয়ন জনগণই করেছে। কিন্তু কথা হচ্ছে এতদিন কেন হয়নি এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে কেন হয়নি? উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সরকারের অনেক পদক্ষেপ, যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য রাস্তাঘাট-বিদ্যুৎ-যোগাযোগ; কৃষকের জন্য সার-কীটনাশক-কৃষিঋণ; গরিব-অসহায়ের জন্য সাহায্য-সহযোগিতা।

আপনি আসলে না ব্যবসায়ী, না কৃষক, না গরিব-অসহায় এবং না গ্রামের মানুষ। তাই আপনি জানেন না বিগত কয়েক বছরে গ্রাম-গঞ্জের রাস্তাঘাটের কী অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে, বিদ্যুতের ঘাটতি কতটা কমেছে, সার-কীটনাশকের সরবরাহ কতটা নিশ্চিত হয়েছে এবং গরিব-অসহায় মানুষের জন্য কত প্রকার ভাতার ব্যবস্থা হয়েছে।

আপনি কি জানেন বিদ্যুৎ এবং পাকা-রাস্তার কারণেই গ্রামের কয়েক লাখ লোক অটোরিকশা বা ইজিবাইক চালিয়ে ভালোভাবে শুধু জীবিকা নির্বাহই করছে তাই না, বরং গ্রামবাংলায় মানুষ ও পণ্য পরিবহনে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। আপনার জন্য এসব প্রয়োজন নেই। তাইতো আপনি ভুলে গেছেন বিদ্যুৎবিহীন খুঁটি এবং সার-ডিজেলের জন্য কৃষকের গুলি খাওয়ার কথা। হ্যাঁ, আপনি বলতে পারেন এসব কাজে দুর্নীতি হয়েছে, কিন্তু অনুগ্রহপূর্বক যেটি সত্য সেটি অস্বীকার করবেন না।

আপনার কাছে রিপোর্ট আছে রাজশাহী ও বরিশালের নির্বাচন খুবই খারাপ হয়েছে। আমি বরিশালের কথা জানি না, তবে বলতে পারি রাজশাহীর নির্বাচনের ফলাফল ছিল অবধারিত। হ্যাঁ, সরকার কিছু প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু এটি না করলেও তাদের প্রার্থী খায়রুজ্জামান লিটনই মেয়র নির্বাচিত হতেন। খায়রুজ্জামান সাহেব পাঁচ বছর আগে মেয়র ছিলেন। তার শত্র“রাও বলে যে, উনি যত কাজ করেছেন তা ইতিপূর্বে যত মেয়র ছিল তারা সবাই মিলেও করতে পারেননি। তার কাজের কারণেই রাজশাহী আজ সুন্দর সিটি হিসেবে পরিচিত।

এত কাজের পরও গত নির্বাচনে খায়রুজ্জামানকে পরাজিত করে বিএনপি প্রার্থী বুলবুল মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মেয়র হিসেবে বুলবুল সাহেব তেমন কোনো কাজ করতে পারেননি। ফলে রাজশাহীর মানুষ গত পাঁচ বছরে এটুকু বুঝেছে যে, খায়রুজ্জামান ছাড়া রাজশাহীর উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই তো উৎসবমুখর ভোটের শেষে যখন বিএনপি প্রার্থী বুঝতে পারলেন তার পরাজয় অবধারিত, তখন একাই ফাঁকা মাঠে বসে পড়েছিলেন। খায়রুজ্জামানের এ বিজয় হচ্ছে তার উন্নয়নের প্রতি জনগণের প্রতিদান, তবে এতে কালিমা লেগেছে কিছু অপ্রয়োজনীয় অনিয়মের জন্য।

এটি সত্য, শেখ হাসিনা স্বেচ্ছাচারমূলক অনেক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। কিন্তু আপনি এত দ্রুত কী করে ভুলে গেলেন খালেদা জিয়ার স্বেচ্ছাচারী আচরণের কথা? আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা সাহেবই তো এর একটি বড় প্রমাণ। খালেদা জিয়ার স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের (যাকে অনেকেই বলে আপসহীন মনোভাব) কারণেই গত নির্বাচনের আগে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেননি, বিএনপি জোট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি, তার লোকেরা ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্য করেছে এবং আজ তার দলের, নিজের এ পরিণতি হয়েছে।

আপনার কাছে কি এমন কোনো রেকর্ড আছে যা থেকে আপনার মনে হচ্ছে বিএনপি ক্ষমতায় এলে স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ চালাবে না? নাকি গল্পের সেই সাধুবাবার মতো খাঁচায় বন্দি বাঘের কথা শুনে আপনি বিশ্বাস করছেন।

আপনি নিজেও কি কম স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের লোক? এই তো কিছুদিন আগেই আপনি মাননীয় প্রধান বিচারপতির সামনে অ্যাটর্নি জেনারেলকে অত্যন্ত খারাপ ভাষায় আক্রমণ করেছিলেন। আসলে কী জানেন, আমরা সবাই স্বৈরাচারী মনোভাবের। তবে সেটি প্রকাশ হয় ক্ষমতা থাকলেই- অন্যথায় আমরা সবাই সাধু।

পরিশেষে, ড. কামাল সাহেবকে বলতে চাই, নির্বাচনকে নিয়ে আমাদের রাজনৈতিক দীনতা দেশের জন্য অপমানজনক, স্বার্থের পরিপন্থী এবং গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। জাতীয় ঐক্য আমাদের অবশ্যই প্রয়োজন, তবে সেটি শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য আওয়ামী লীগবিরোধী ঐক্য হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। এ ধরনের ঐক্য থেকে স্বৈরাচারী শাসন এবং রাজনৈতিক বিভেদেরও অবসান হবে না। উপরন্তু, এই প্রচেষ্টার ফলে দেশে এক অনাহূত সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্ম হতে পারে, যা সম্ভবত আপনারও কাম্য হবে না।

তাই শুধু বিএনপি নয়, আপনারা আওয়ামী লীগের সঙ্গেও আলোচনা করে প্রকৃত জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলুন। এ প্রক্রিয়াটি খুবই কঠিন, কিন্তু একেবারেই অসম্ভব নয়। আপনি সফল হবেন এটিই আমার কামনা। কিন্তু অসফল হলেও দেশের মানুষের কাছে এবং আপনার বিবেকের কাছে সারাজীবন জয়ী হয়ে থাকবেন। অনুগ্রহপূর্বক চেষ্টা করেই দেখুন। অনুরোধ, জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমে শুধু নির্বাচন নয়, নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও যাতে উভয় দলেরই ক্ষমতার একটি ভারসাম্যমূলক অংশীদারিত্ব থাকে সে বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। অন্যথায় এ ধরনের ঐক্য হবে শুধু লোক-দেখানো এবং তার ফলাফল হবে শূন্য।

ড. এমএল আর সরকার : প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

ঘটনাপ্রবাহ : বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter