ইউয়ান কি ডলারের আধিপত্য রুখে দেবে!

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাজ্জাদ আলম খান

ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে চীন তার প্রত্যাশিত পেট্রো-ইউয়ান মুদ্রার প্রচলন শুরু করেছে। চীন বর্তমান বিশ্বে তেলের বৃহত্তম ভোক্তা। ইউয়ান এখন মার্কিন ডলারের অবমূল্যায়নকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে। চীন সৌদি আরবকে পেট্রোডলারের লেনদেন থেকে সরে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে। এর পরিবর্তে পেট্রো-ইউয়ানে তেলের ট্রেডিং শুরু করতে চায়।

গেল ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পেট্রো-ইউয়ানের পক্ষে অবস্থান নেন। ব্রিকস কয়েক বছর ধরে আলোচনা করছে সীমিতসংখ্যক রিজার্ভ মুদ্রার আধিপত্য বিস্তার কীভাবে রোধ করা যায়।

এখন বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে আমদানি-রফতানি হবে টাকা ও ইউয়ানে। অর্থাৎ ডলার ব্যবহার করে এলসি খুলতে হবে না। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা চাইলেই টাকা দিয়ে সরাসরি ইউয়ান কিনে এলসি পরিচালনা করতে পারবেন। অনুরূপ চীনা ব্যবসায়ীরা একই ধরনের সুযোগ পাবেন।

অর্থাৎ চীনের ব্যবসায়ীরা স্থানীয় মুদ্রায় এলসি খুলে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি করতে পারবেন। এর মধ্য দিয়ে ইউয়ানকে মূলত আন্তর্জাতিক মুদ্রার স্বীকৃতি দিল বাংলাদেশ। চীন বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ান ব্যবহারের প্রচেষ্টা চালায়।

গত জানুয়ারি থেকে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে রুপি ও ইউয়ানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য করার সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে মার্কিন ডলার, ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরো, কানাডিয়ান ডলার ও জাপানি ইয়েন আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশ। এখন যুক্ত হল ইউয়ান।

২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট আমদানির ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ এসেছে চীন থেকে। এ ধারা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। ওই সময়ে বাংলাদেশ সারা বিশ্ব থেকে মোট তিন লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে চীন থেকে আমদানি করেছে এক লাখ ৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকার পণ্য।

টেক্সটাইল মেশিনারি, ইলেকট্রনিক সরঞ্জামাদি, শিল্পের কাঁচামাল, রাসায়নিক পণ্য, বেস মেটাল, প্লাস্টিক ও রাবারের পণ্য আমদানি করা হয় চীন থেকে। বাংলাদেশে বিনিয়োগের দিক থেকেও অনেক দেশকে ছাড়িয়েছে চীন। অগ্রাধিকার ও মেগা প্রকল্পে অংশীদারিত্ব বাড়ছে চীনের। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।

মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হলে দুই দেশের বাণিজ্য বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। এর পুরোটাই ডলারের পরিবর্তে ইউয়ানে করা যাবে। এতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ব্যবসায় ব্যয়ও কমবে। চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। টাকা দিয়ে ডলার কিনে সেই ডলার আবার রূপান্তরিত করে আমদানির ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে কমিশন দিতে হয়।

এতে সময়ের অপচয়ও হয়। এছাড়া ডলারের চাহিদা বেড়ে গেলে দামেও হেরফের হয়। সরাসরি টাকা-ইউয়ানে বাণিজ্য হলে ব্যবসায়ীদের আর তৃতীয় কোনো মুদ্রা ব্যবহারের ঝামেলায় যেতে হবে না। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য চীন বেশকিছু দিন ধরে তার মুদ্রাটির ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমাচ্ছে।

চলতি বছরের প্রথম মাসেই পাকিস্তান চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এবং বিনিয়োগ কার্যক্রমে ইউয়ানকে অনুমোদন দিয়েছে। ফলে দেশটিতে ডলারের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে ইউয়ান ব্যবহার বৈধতা পেয়েছে। এর ফলে আমদানি, রফতানি এবং আর্থিক লেনদেনের জন্য চীনা ইউয়ান ব্যবহার করা যাচ্ছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কার্যক্রমে ইউয়ানের মাধ্যমে এলসি খোলা এবং আর্থিক সুবিধা গ্রহণের মতো নিয়ন্ত্রক কাঠামোও তৈরি হয়েছে।

পাকিস্তানে ইউয়ান এখন মার্কিন ডলার, ইউরো ও জাপানি ইয়েনের মতো অন্যান্য আন্তর্জাতিক মুদ্রার কাতারে চলে এসেছে। চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের আওতায় যে হারে চীনা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ছে, ইসলামাবাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় বেইজিং ২০৩০ সাল নাগাদ পাকিস্তানে ৬ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

২০১৫ সালের অক্টোবরে আইএমএফ ইউয়ানকে আইএমএফে রিজার্ভ জমা রাখার মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর আগে চারটি মুদ্রা, যথাক্রমে মার্কিন ডলার, ইউরো, পাউন্ড ও ইয়েন স্বীকৃত ছিল। ২০১৬ সাল থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। বস্তুত, মুদ্রার তিন ধরনের মৌলিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়।

প্রথমত, গ্রহণযোগ্যতা। যে কেউই ওই মুদ্রার বিনিময়ে পণ্য বিক্রি করতে পারবে। আবার ওই মুদ্রা দিয়ে অন্য পণ্য কেনা যাবে। বিনা দ্বিধায় বাজারে ওই মুদ্রা লেনদেন করা যাবে। দ্বিতীয়, লিকুইডিটি থাকতেই হবে। এটি গ্রহণযোগ্যতার মাত্রার কম-বেশি ইঙ্গিত করে। ব্যাংকের চেকের চেয়ে নগদ মুদ্রার গ্রহণযোগ্যতা বেশি।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য, মুদ্রার বদলে সোনা। ব্যাংকে গিয়ে মুদ্রার বদলে সোনা চাইলে তৎক্ষণাৎ তা পাওয়া যায় এমন হতে হবে। এ গুণটা অনেকাংশে এখন অপ্রয়োজনীয়। একটা সময় ছিল ব্যাংক কাগুজে মুদ্রা ছাপার আগে সমমূল্যের সোনা ভল্টে রিজার্ভ রেখে নিত। এখন তা আর করে না। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ কাগুজে মুদ্রার বদলে সোনা ফেরত দেয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতাও তুলে দেয়। মুদ্রা আবার দু’ধরনের।

দেশি মুদ্রা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ব্যবস্থা প্রথম চালু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। বিশ্ব বাণিজ্য বিনিময় চালুর পূর্বশর্ত হল এক আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্য মুদ্রা চালু থাকা। এটাই আইএমএফের মুখ্য কাজ। আইএমএফ তহবিলে সদস্য রাষ্ট্রের অ্যাকাউন্টে জমাকৃত অর্থ হিসাব করা হয় স্পেশাল ড্রয়িং রাইট বা এসডিআরের মাধ্যমে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় দেখা যাবে ওইদিনের এসডিআর রেট দেয়া আছে।

মার্কিন ডলারের জয়যাত্রা শুরু হয় ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। মিসরের ঐতিহাসিক সুয়েজ খালের পাশে গ্রেট বিটার হ্রদে ইউএসএস কুইন্সি জাহাজে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এবং সৌদি বাদশা ইবনে সৌদ উপস্থিত ছিলেন। সৌদি তেলে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার এবং ডলারের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের প্রতিশ্রুতি মেলে তখন। আর বাদশাহ সৌদকে সামরিক সহায়তা দেয়ার অঙ্গীকার করেন রুজভেল্ট। এরপর তেল ও মার্কিন ডলারের চাহিদাও বেড়েছে।

বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক লেনদেনের মাধ্যম হয়ে ওঠে মার্কিন ডলার। আইএমএফের হিসাব বলছে, বিশ্বের মোট রিজার্ভের প্রায় ৬২ শতাংশই সংরক্ষিত আছে মার্কিন ডলারে। ২০ শতাংশ ইউরোতে এবং ইয়েন ও ব্রিটিশ পাউন্ডে সংরক্ষিত আছে মাত্র ৫ শতাংশ রিজার্ভ। বিশ্বজুড়ে লেনদেনের ৮৫ শতাংশই হয়ে থাকে ডলারে। ডলারের তারল্য বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করে আসছে। ডলারের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী এখন ইউরো ও ইউয়ান। যদিও ইউরোর ওপর একক কোনো রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ নেই, তবে ইউয়ানের ওপর আছে চীনের কর্তৃত্ব।

রাশিয়া ও তুরস্ক এরই মধ্যে ঘোষণা করেছে, ডলারের বদলে তারা নিজ নিজ মুদ্রাতে বাণিজ্য চালাতে আগ্রহী। যদি এ দুই দেশ অন্যদেরও এ ব্যাপারে রাজি করাতে পারে, তাহলে ডলারের আধিপত্য স্পষ্টতই অনেক কমে আসবে। তবে যতদিন যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিনিয়োগকারীদের পর্যাপ্ত আস্থায় থাকবে, ততদিন ডলারও সবচেয়ে শক্তিশালী থাকার সম্ভাবনাই বেশি। অস্ট্রেলিয়ান ডলারও ইউয়ানের সঙ্গে বিনিময় করা যায়। বেশ কয়েক বছর ধরে চীন তার নিজস্ব মুদ্রাকে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

চীনের লক্ষ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের মাধ্যমে মার্কিন ডলারের বিকল্প হিসেবে নিজেদের ইউয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করা। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করছে এমন ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান এখন মার্কিন ডলারের পরিবর্তে ইউরো মুদ্রায় লেনদেন করার উদ্যোগ নিয়েছে। ডলারে লেনদেন থেকে সরে আসার পদক্ষেপ এটাই প্রথম নয়। আরও বেশ কয়েকটি দেশ মার্কিন ডলারে আন্তর্জাতিক লেনদেন থেকে সরে আসার কথা সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। ডলারের লেনদেন থেকে কি এত সহজে মুক্তি মিলবে?

ব্রিটিশ পাউন্ডকে হটিয়ে প্রায় এক শতক ধরে আন্তর্জাতিক রিজার্ভ মুদ্রায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে মার্কিন ডলার। এর আগে উনিশ শতক এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে আধিপত্য ধরে রেখেছিল পাউন্ড। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রিজার্ভের ক্ষেত্রে মার্কিন ডলারই পছন্দের মুদ্রা। গোটা আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা মার্কিন ডলারকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।

সাজ্জাদ আলম খান : অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]