বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে ফিরে তাকাতেই হবে

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  এ কে এম শাহনাওয়াজ

ছবি: সংগৃহীত

২০১৪ সালের নির্বাচনের সময় সাংগঠনিকভাবে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থা এ সময়ের চেয়ে আরেকটু সুসংগঠিত ছিল; তবে অবশ্যই দৃঢ় ছিল না। বাস্তবতার বিচারে সুস্থধারার মানুষ বিবেচনা করেছিল, নির্বাচনে হয়তো সরকার গঠন করার মতো বিরাট সাফল্য পাবে না বিএনপি তথা বিশদলীয় জোট।

আওয়ামী লীগ নেতারা সরকারি সুবিধায় থাকার কারণে কমবেশি নির্বাচনী অন্যায় করবে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনে থাকার সুবাদে দলকে সুগঠিত করার সুযোগ পাবে বিএনপি। সরকার গঠন করার ইচ্ছাটা পাঁচ বছরের জন্য মুলতবি রেখে সরকারের নানা ভুল-ত্রুটিগুলো সামনে এনে আন্দোলনের পথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ছিল বিএনপির।

এতে দলটির জনপ্রিয়তা অনেক বাড়ত। আওয়ামী লীগ একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারত। তার বদলে হালভাঙা হতাশ নাবিকের মতো ভুল পথে নৌকা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট। চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করে গণেশ উল্টে ফেলার দুর্বুদ্ধি মাথায় এসেছিল।

এভাবে নিজ হাতেই যেন কলঙ্কতিলক কপালে আঁকল, যার কুফল এখনও ভোগ করতে হচ্ছে বিএনপিকে। ছন্নছাড়া দল নিয়ে এবার নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছেন বিএনপি নেতৃত্ব। এখন এই প্রশ্নটি সামনে আসছে যে, তাদের দূরদর্শী পরিকল্পনা কী হতে পারে?

জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি নেতৃত্বকে অবশ্যই অপ্রয়োজনীয় বাগাড়ম্বর ছেড়ে পাঁচ বছর আগে রেখে আসা কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে আত্মসমালোচনায় যেতে হবে। সেবার নির্বাচনোত্তরকালে এমনও যুক্তি অনেকে দিয়েছিলেন যে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে বিএনপি-জামায়াত জোট যে আন্দোলনের নামে অরাজকতা শুরু করেছিল, নির্বাচনের পরও উচিত ছিল তা অব্যাহত রাখা।

তাহলে সরকার চাপে পড়ত এবং মধ্যবর্তী নির্বাচন দিতে বাধ্য হতো। এই যুক্তির সারবত্তা ছিল বলে অনেকে মনে করেন। কিন্তু যা হারিয়ে ফেলেছে তাকে ফিরে পাওয়া সহজ নয়। যথার্থ ইস্যু ও পারিপার্শ্বিক বাস্তবতা ছাড়া হঠাৎ অবরোধের ডাক দিয়ে এবং তা অনির্দিষ্টকালের জন্য জারি রাখলে কি একই ফল ফলবে? বিএনপি ভালো করেই জানে, সাধারণ মানুষ দূরের কথা; নিজ দলের নেতাকর্মীরাও সরবে মাঠে নামছে না বা নামতে পারছে না।

হাট ভেঙে গেলে সে হাট আবার বসানো গেছে কোনোকালে! গেল নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপি সুস্থধারায় নিজেকে রাখতে পারলে এবং ঠিকভাবে খেলতে পারলে তবু জোটের ভাগ্যের শিকে ছেঁড়ার সম্ভাবনা ছিল। কারণ তখন সাধারণ ভোটারের অনেকের মধ্যে বিএনপির প্রতি সহানুভূতি ছিল। মধ্যবর্তী নির্বাচন আদায় করতে পারলে বিএনপির বিজয় নিয়ে বেরিয়ে আসার একটি সম্ভাবনা তৈরি হতে পারত।

সরকারে থাকার কারণে এবং দুর্নীতি-সন্ত্রাস কমাতে না পারায় আওয়ামী লীগ ক্রমে জনআস্থা হারাত। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিএনপি নিয়মতান্ত্রিক ও জনসম্পৃক্ত আন্দোলন করতে পারলে দলটির জনসমর্থনের সূচক ঊর্ধ্বমুখী হতো। কিন্তু সে পথে হাঁটেনি বিএনপি আর তার জোটবন্ধুরা।

২০১৫-এর ৫ জানুয়ারি অবরুদ্ধ বেগম জিয়া পরামর্শকবিহীন অবস্থায় সংবাদকর্মীদের খোঁচাখুঁচিতে ধুম করে অন্তহীন অবরোধের ডাক দিয়েছিলেন। আমাদের মনে হচ্ছিল, সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত হলে এমনটি হতো না। এটি অকেনটা অকাল-বোধন হয়ে গিয়েছিল যেন! রাবণবধের প্রয়োজনে শক্তি লাভ করার জন্য শ্রী রামচন্দ্র বসন্তকালের বদলে শরৎকালে দুর্গা দেবীর বোধন বা নিদ্রাভঙ্গ করেছিলেন।

রামচন্দ্র দেবতা। তিনি না হয় অকালবোধন করে পার পেয়েছিলেন। আমাদের মর্তের দেবী-দেবতারা কি দেবালয়ে যখন প্রলয় চলছে, তেমন অবস্থায় অনুকূল সময় তৈরি না করেই হাট বসানোর চেষ্টা করেছিলেন? এমন ভাঙাহাট বসানো কঠিন। বিএনপি নেত্রীর ‘আপসহীন’ খেতাব আছে। এখন যদি খেতাবের সম্মান রক্ষার্থে আপসহীনভাবে আরও কিছুদিন লাগাতার অবরোধ চালিয়ে যেতেন, তবে তা আপনাআপনি চুপসে যাওয়া বেলুন হয়ে যেত।

কারণ শুরু থেকেই বিএনপি তাদের আন্দোলনে জনসাধারণকে অংশগ্রহণ করাতে পারেনি। এতে কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা তৈরি হয়েছিল। ২০১৪-এর নির্বাচনের আগে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার আঞ্চলিক জনসভায় লোক জোগাড় করার দায়িত্ব জামায়াত গ্রহণ করেছিল।

বিনিময়ে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদলকে হটিয়ে দিয়ে দর্শক সারির প্রথম দিকগুলো জামায়াত দখলে রেখে দেয়। তাই মঞ্চ থেকে ক্যামেরার সীমানায় শিবির আর জামায়াতের প্ল্যাকার্ড, সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের ছবি সম্বলিত বেলুন শোভা পেত। দেখে বোঝা যেত না, এটি বিএনপির জনসভা; না জামায়াতের। এহেন অবস্থায় বিধ্বস্ত বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন অবরোধের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিকভাবে দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়া আর কিছু অর্জন করতে পারেনি!

আমার খুব দুঃখ লাগে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ও রুহুল কবির রিজভী সাহেবদের দেখলে। যতদূর জানি, তাদের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক অতীত ছিল। মির্জা সাহেব পদ ঠিক রাখতে যেভাবে যুক্তি ও ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে কণ্ঠশীলন করেন, তা দেখে সচেতন মানুষ কিছুটা বিব্রত হয় বৈকি! আর অন্যদিকে রিজভী সাহেবের অবস্থা আরও করুণ- দলীয় কার্যালয়ে প্রতিদিন বিবৃতি পড়ার একমাত্র দায়িত্ব পালনের জন্য যাকে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল দলীয় কার্যালয়ে।

বছরের পর বছর কলের পুতুলের মতো এই দায়িত্বই পালন করে যাচ্ছেন তিনি। ৫ জানুয়ারির হৈ-হট্টগোলের সময়ের একটি ছবি অনেকেই মনে করতে পারবেন। জনাব রিজভী আহমদ যখন বিবৃতি দিচ্ছিলেন, তখন টানা অবরোধ কর্মসূচির ডাক থাকলেও সবকিছু প্রায় চালু ছিল দেশে। লঞ্চ-স্টিমার চলছিল; ট্রেন চলছিল।

নগর পরিবহন তো চলছিলই! প্রথম প্রথম সাহস না করলেও পরে সীমিতভাবে হলেও দূরপাল্লার বাস চলেছে। পুলিশ প্রহরায় পণ্যবাহী ট্রাক চলাচলও শুরু হয়েছিল। পাশাপাশি বিএনপি ও জামায়াত কর্মীরা ঝটিকা আক্রমণে হিংসাও ছড়াচ্ছিল।

এরই মধ্যে অবরোধ আহ্বানকারীদের হাতে নিহত হয়েছিল বেশ ক’জন নিরীহ মানুষ; আহত হয়েছিল অনেকে। রেললাইন উপড়ে ফেলে রেল দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। আগুন দেয়া হয়েছিল অনেক যানবাহনে। বিএনপি নেতাদের বরাবরের মতো মাঠে পাওয়া যাচ্ছিল না।

বোমায় আহত সন্তানের পাশে বসে একজন মা যখন আহাজারি করছিলেন আর অসুস্থ ও আসুরিক রাজনীতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করছিলেন, তখন নিজেদের তৈরি মৃত্যুবাণ আর আগুনের কুণ্ডলি হাতে থাকা অবরোধ আহ্বানকারীদের মস্তক নত হওয়ার কথা ছিল। অথচ মাথা উঁচু করে বিএনপি মুখপাত্র রিজভী আহমদ ভিডিও বার্তায় দলীয় আদেশ এমনভাবে প্রচার করছিলেন, যেন এইমাত্র তিনি ভিনগ্রহ থেকে নেমেছেন।

তাদের সৃষ্ট উন্মত্ততায় সে সময়ে মানুষের অসহায় অবস্থা সম্বন্ধে রিজভী আহমদ মোটেও অবহিত নন। বাণী প্রচারিত হচ্ছিল, ‘জনগণকে’ নিয়ে তারা ‘শান্তিপূর্ণ’ অবরোধ করে যাচ্ছেন! অসহায় দেশবাসীর কাছে কতটা বীভৎস হতে পারে এমন উচ্চারণ, তা একবারও ভেবে দেখেননি। সাধারণ মানুষ যখন হরতাল-অবরোধ থেকে মুক্তি পেতে চাচ্ছিল, তখন অত্যন্ত নির্মমভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলে যাচ্ছিলেন তিনি।

বুঝলাম, রিজভী সাহেব দলের বিবৃতি পাঠক মাত্র। তার ভূমিকা কলের পুতুল বৈ কিছু নয়। তারপরও তিনি মানুষ তো, যার একটি রাজনৈতিক অতীত ছিল! এক সময় হয়তো গণমানুষের কথা নিয়ে ভাবতেন। আজ তবে দলীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কীভাবে মিথ্যাচার (নাকি ‘রাজনৈতিক বক্তব্য’) করছিলেন? দেশের মানুষ আর সম্পদকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানোর মতো লাগাতার অবরোধ চালানোর আদেশ জারি করেছিলেন?

কী বিচিত্র রাজনীতি! নষ্ট রাজনীতি এভাবে ক্ষমতার আফিমের ঘোরে মত্ত করে রাখে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের বিবেক। আমি বিস্মিত হই এই ভেবে যে, এসব নেতা একবারও ইতিহাসের আদালতের কথা ভাবেন না। নিজেদের রাজনৈতিক জীবনের সব অর্জন এভাবে নোংরা এঁদোকাদায় বিসর্জন দিয়ে দেন অবলীলায়।

ক্ষমতার রাজনীতির জাদুকরি নেশায় বিবেক কি একেবারে নিঃশেষিত হয়ে যায়! দেশ ও দেশবাসী- তারাও যে একটি অংশ, তা কীভাবে বিস্মৃত হন! নিজেদের পরাজিত করে মানুষের অশ্রদ্ধা নিয়ে এ কেমন বেঁচে থাকা তাদের! রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে জড়াইনি বলে বোধকরি আমার কাছে এ এক গভীর রহস্য হয়ে রইল।

আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি নেতৃত্বের এখন উচিত- আত্মোপলব্ধিতে ফিরে আসা। সময় অনেক গড়িয়েছে। দলকে পরিচ্ছন্ন-সুসংগঠিত না করে ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ এখন আর নেই। রাত পোহাতেই ক্ষমতার মসনদ হাতে ধরা দেবে, অমন স্বপ্ন (নাকি দুঃস্বপ্ন!) দেখার কোনো অবকাশ নেই বর্তমান বাস্তবতায়।

ক্ষমতাসীন দল অনেক অন্যায় করছে। দমন-পীড়নমূলক আচরণ করছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারছে না। দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত হচ্ছে। এতে সরকারের বিরুদ্ধে সৃষ্ট জনক্ষুব্ধতা নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করতে হলে জনকল্যাণমুখী রাজনীতির পথে হাঁটা প্রয়োজন বিএনপির।

আলোকিত পথে বিএনপির জন্য এর চেয়ে ভালো আর কি কোনো বিকল্প আছে! গেল পাঁচ বছরের সময়টাকে অপচয় করেছে বিএনপি। তাই বলে এত বড় একটি রাজনৈতিক দল ঘুরে দাঁড়াবে না? আমরা মনে করি, আবারও নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য বিএনপির নির্বাচনকে উপলক্ষ করা উচিত। সময় নিয়ে দলকে সুসংগঠিত করে, গণমুখী কর্মসূচি নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত।

জামায়াতি শক্তি এখন আর বিএনপির লক্ষ্য পূরণের হাতিয়ার হবে না। বিএনপি এই দুঃসময়েও দলের চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকায় একটি বড় জমায়েত করতে পেরেছে। এখান থেকেই শক্তি সঞ্চয় করতে পারেন বিএনপি নেতৃত্ব। দেশজুড়ে যে দলের অসংখ্য কর্মী-সমর্থক আছে, সে দল যদি ইতিবাচক রাজনীতির পথে না হেঁটে অন্ধকার পথ হাতড়ে বেড়ায়; সে দলের নেতাদের মতো দুর্ভাগা আর কে আছে!

ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]