বৈষম্যে বিপর্যস্ত প্রাথমিক শিক্ষা

  মো. সিদ্দিকুর রহমান ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বৈষম্যে বিপর্যস্ত প্রাথমিক শিক্ষা

শিক্ষার ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষা। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত নড়বড়ে বা দুর্বল হলে পুরো জাতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। এ উপলব্ধি অনেক শিক্ষিত বা সংশ্লিষ্টদের মাঝে দৃশ্যমান নয়। বৈষম্যের কারণেই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জন্ম। প্রাথমিক শিক্ষায়ও বৈষম্য ব্যাপক।

এ বৈষম্যের ফলে তৃণমূলের সাধারণ মানুষের শিক্ষার অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। এতে স্বাধীনতার মূল উদ্দেশ্য, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে বৈষম্যগুলো উপস্থাপন করছি।

প্রাথমিকের শিক্ষকরা সরকারি কর্মচারী হলেও তারা সরকারি কর্মচারীদের সব সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেকের ধারণা, অনেক ছুটি ভোগ করছেন প্রাথমিক শিক্ষকরা। বাস্তবে প্রাথমিক শিক্ষক ও কর্মকর্তারা সরকারি কর্মচারীদের চেয়েও কম ছুটি ভোগ করেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের বার্ষিক ছুটির তালিকায় বছরে ৭৫ দিন দেয়া থাকে। এ ছুটির তালিকা থেকে প্রাথমিকের শিক্ষকরা জাতীয় ও গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোসহ কমপক্ষে ১০ দিন ছুটি ভোগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাই প্রাথমিক শিক্ষকদের ছুটি থাকে ৬৫ দিন। প্রাথমিক শিক্ষকদের চেয়ে সরকারি কর্মচারীরা সপ্তাহে একদিন- শনিবার বেশি ছুটি ভোগ করেন। সেই হিসেবে সরকারি কর্মচারীরা বছরে ৫২ দিন এবং সরকারি ছুটির তালিকাভুক্ত কমপক্ষে ২৪ দিন, সর্বমোট ৭৬ দিন ছুটি ভোগ করেন। প্রাথমিকের শিক্ষকরা সরকারি কর্মচারীদের চেয়ে বছরে ১০-১২ দিন কম ছুটি ভোগ করেন। এছাড়া প্রাথমিকের শিক্ষকদের পাঠদান ও পাঠদান বহির্ভূত বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়।

সরকারি কর্মচারী ও প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রাপ্ত সুবিধায় ব্যবধান রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষকরা অর্ধ গড় বেতনে একটি অর্জিত ছুটি এবং এক বছর অর্ধ বেতনে পিআরএল সুবিধা পেয়ে থাকেন। অপরদিকে সরকারি কর্মচারীরা দুটি অর্জিত ছুটি পান, যার একটি অর্ধ গড় বেতনে এবং একটি পূর্ণ বেতনে। সরকারি কর্মচারীরা এক বছর পূর্ণ বেতনে পিআরএল সুবিধা পেয়ে থাকেন।

অর্জিত ছুটি একটি হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষকদের কেউ কেউ ল্যাম্প গ্র্যান্টের (চাকরি শেষ হওয়ার এককালীন অনুদান) টাকা মোটেই পান না। সরকারি কর্মচারীরা ৩ বছর পরপর শ্রান্তি বিনোদন ভাতা পেলেও প্রাথমিকের শিক্ষকরা তা পান ৪-৫ বছর পরপর। সরকারি কর্মচারীদের মতো প্রাথমিকের শিক্ষকরা ৩ বছর পরপর ১৫ দিন ছুটিও পান না। সংশ্লিষ্টরা প্রাথমিক শিক্ষকদের গ্রীষ্ম বা যে কোনো অবকাশে ১৫ দিন ছুটি নির্ধারণ করা হলে তারা ৩ বছর পরপর বিধি মোতাবেক সরকারি কর্মচারীদের মতো ছুটি পেতেন। অন্য কোনো অবকাশে ১৫ দিন ছুটি না থাকায় বাধ্য হয়ে তাদের রোজার মাসে ছুটি দেখিয়ে শ্রান্তি বিনোদন ভাতা পেতে হয়। এ ক্ষেত্রে আরবি বছর ৩৫৫ দিন হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষকদের ভাগ্যে ৪-৫ বছর পরপর শ্রান্তি বিনোদন ভাতা জুটে থাকে।

এ বছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ৫ দিন বন্ধ রাখা হয়েছে। দুই ঈদের আগের দিন প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা। অথচ ঈদ উপলক্ষে উচ্চ বিদ্যালয় ১৫ দিন এবং পিটিআই ২০ দিন বন্ধ। মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসবে এরকম বৈষম্য প্রাথমিক শিক্ষকদের অনুভূতিতে ব্যাপকভাবে আঘাত এনেছে। বৈষম্য সৃষ্টির মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষকদের অনুভূতিতে আঘাত হানার কাজ যে বা যারা করে থাকেন, তাদের আইনের আওতায় আনা জরুরি।

প্রাথমিকের সময়সূচির সঙ্গে উচ্চ বিদ্যালয়ের সময়সূচির বিশাল পার্থক্য। এ পার্থক্য নন্দিত শিল্পী মমতাজের গানের দুটি লাইন মনে করিয়ে দেয় : ‘আমার বাড়ির পাশ দিয়া বন্ধু যখন হাঁইট্টা যায়, বুকটা ফাইট্টা যায়।’ প্রাথমিকের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ শিশুবান্ধব সময়সূচি না থাকা। প্রাথমিক শিক্ষায় এসব বৈষম্য এ স্তরের শিক্ষায় সফলতা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

এ বছর দফতরি কাম প্রহরীদের বেতনের প্রজ্ঞাপন ঈদের ছুটির পূর্বক্ষণে জারি হওয়ায় ৩৭ হাজার কর্মচারী জুলাই-আগস্ট মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। এ বঞ্চনার জন্য দায়ীরা কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আসছেন না। বিষয়টির প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছি, আর সময়ক্ষেপণ না করে প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষকদের বিশাল বেতন বৈষম্যসহ সব বৈষম্য দূর করুন।

বৈষম্য সৃষ্টিকারীরা সরকারের পক্ষে তোষামোদি করে বৈষম্য সৃষ্টি করে চলেছেন। এতে প্রাথমিকের শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ শিক্ষা পরিবারের ক্ষোভ বৃদ্ধি পেয়ে চরমে পৌঁছেছে। বৈষম্য সৃষ্টিকারীদের অপসারণের দাবি করে আসছে প্রাথমিক শিক্ষা পরিবার। সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান- ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের পরিপন্থী কাজ পরিহার করে সব বৈষম্য দূর করুন। প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি অবহেলা বন্ধ করুন।

মো. সিদ্দিকুর রহমান : আহ্বায়ক, প্রাথমিক শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা ফোরাম

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter