পেনশনারদের প্রতি বৈষম্য দূর করা হোক

  মো. কামরুজ্জামান ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পেনশন

সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেলে ৬৫ বছর বয়স থেকে নিুবয়স্ক পেনশনারদের পেনশন শতকরা ৪০ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। পক্ষান্তরে চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন শতকরা একশ’ ভাগের মতো বৃদ্ধি করা হয়েছে।

অর্থাৎ এ বেতন স্কেলে ৬৫ বছর বয়স থেকে কমবয়স্ক পেনশনারদের পেনশন শতকরা ৬০ ভাগের মতো কম বৃদ্ধি করা হয়েছে। ফলে জাতীয় বেতন স্কেলে পেনশনারদের পেনশন প্রদানে কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনায় বড় আকারে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।

পূর্ববর্তী জাতীয় বেতন স্কেলে (২০০৯) ৬৫ বছরের নিচে বয়স্ক পেনশনারদের পেনশনও শতকরা ৪০ ভাগ বৃদ্ধি করা হয়েছিল। কিন্তু তখন চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ৭০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি করা হয়েছিল। অর্থাৎ সে সময় পেনশনারদের পেনশন চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের তুলনায় শতকরা ৩০ ভাগের মতো কম বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

সরকারি চাকরিজীবীদের মাসিক বেতন প্রদানের জন্য জাতীয় বেতন স্কেলে ২০টি স্কেল/গ্রেড আছে। এর মধ্যে ১নং স্কেল/গ্রেডটি হচ্ছে সর্বোচ্চ বেতনের, আর ২০নং স্কেল/গ্রেডটি সর্বনিু বেতনের। সরকারের সচিব ও সচিব পর্যায়ের উচ্চতম সরকারি কর্মকর্তারা ১নং স্কেলে/গ্রেডে বেতন পান।

আর নিুতম পর্যায়ের সরকারি কর্মচারীরা ২০নং স্কেলে/গ্রেডে বেতন পেয়ে থাকেন। প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের মাসিক বেতন ৯নং স্কেল/গ্রেড থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ১নং স্কেল/গ্রেডে। দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের বেতনের স্কেল/গ্রেড ১২নং থেকে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে ১০নং স্কেলে/গ্রেডে। আর কর্মচারীদের বেতন শুরু হয়েছে ২০নং স্কেল/গ্রেড থেকে এবং শেষ হয়েছে ১৩নং স্কেলে/গ্রেডে।

শুধু যে পেনশনারের পেনশন তুলনামূলকভাবে কমে গেছে তা নয়, এর সঙ্গে সঙ্গে তিনি অবমূল্যায়িতও হচ্ছেন। ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের ৯নং গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে জুলাই/২০১৫-তে তিনি যদি পূর্ণ অবসরপ্রাপ্ত হতেন, তাহলে তার বেতন তখন ২২ হাজার টাকা হতো এবং এ টাকার ওপর হিসাব করলে তার মাসিক পেনশন তখন ৯ হাজার ৯০০ টাকা হতো।

আর যদি তিনি ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ১০ নং গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে অর্থাৎ ১৬ হাজার টাকা বেতনে পূর্ণ অবসরপ্রাপ্ত হতেন তখন তার মাসিক পেনশন হতো ৭ হাজার ২০০ টাকা। এ থেকে দেখা যায়, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ৬ নং গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীর, যার পেনশন ৪ হাজার ৪০০ টাকা থেকে পরবর্তী ২টি জাতীয় বেতন স্কেলে বৃদ্ধি পেয়ে ৮ হাজার ৬২৪ টাকা হয়, তা ৯নং গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে জুলাই/২০১৫-তে পূর্ণ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীর মাসিক পেনশন ৯ হাজার ৯০০ টাকার চেয়ে কম এবং ১০নং গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপের জুলাই/২০১৫-তে পূর্ণ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবীর মাসিক পেনশন ৭ হাজার ২০০ টাকার চেয়ে বেশি।

অর্থাৎ ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে ৬নং গ্রেডের প্রারম্ভিক ধাপে পূর্ণ অবসরপ্রাপ্ত পেনশনারের মাসিক পেনশনের অবস্থান ২০১৫ সালের জুলাইয়ে ৬নং গ্রেড থেকে অবমূল্যায়িত হয়ে ১০নং গ্রেডের পর্যায়ে নেমে এসেছে। জাতীয় বেতন স্কেলের ৬নং গ্রেড হচ্ছে প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের; আর ১০নং গ্রেড হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের। অর্থাৎ ওই পেনশনারের অবস্থান দুটি জাতীয় বেতন স্কেল ২০০৯ ও ২০১৫-তে অবমূল্যায়িত হয়ে প্রথম শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তাদের পর্যায়ে নেমে এসেছে।

উল্লেখ্য, সরকার জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-তে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রথম শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা, দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা ও সরকারি কর্মচারী শ্রেণীতে বিভাজনের পদ্ধতি উঠিয়ে দিয়ে গ্রেডভিত্তিক পরিচিতির ব্যবস্থা করেছে।

বিদ্যমান অবস্থায় মাসিক পেনশনের এ করুণ পরিণতি দেখে চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীরা চায় তাদের চাকরির মেয়াদ আরও বাড়ানো হোক। কয়েক বছর আগে কোনো কোনো পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ফ্রান্সে সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর কথা উঠলে তারা তাতে অনীহা প্রকাশ করে এবং পেনশনে যেতে আগ্রহ প্রকাশ করে।

কারণ, তাদের পেনশনের অবস্থা ভালো বিধায় তারা মনে করে আরও চাকরি করা থেকে পেনশনে যাওয়াটাই বেশি কল্যাণজনক। তবে তাদের চাকরির অবসরের মেয়াদ বাংলাদেশ থেকে বেশি। অথচ এ দেশের অবস্থা তার উল্টো।

এখন কেউ কেউ বলতে পারে, দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে জাতীয় বেতন স্কেলে চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের যে হারে বেতন বৃদ্ধি করা হয়, সে হারে পেনশন বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়। এটা মানবিক বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য নয় এবং দেশের স্বার্থের জন্যও অনুকূল নয়।

পেনশন জাতীয় বেতন স্কেলে চাকরিরতদের মতো সমহারে বৃদ্ধি করা না হলে চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের মনে ভবিষ্যতে পেনশনে যাওয়ার কথা এলে তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই হতাশা চলে আসবে। যার ফলে সরকারি কাজকর্মের গতিতে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি হবে না।

উল্লেখ্য, সরকার ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে চাকরিরত চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি করায় এটা সরকারি কাজকর্মের গতি বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। ফলে বাংলাদেশে জিডিপি বৃদ্ধির হার আগের তুলনায় বেড়েছে।

এখন যদি পেনশনের পরিমাণ চাকরিরতদের মতো একই হারে বৃদ্ধি করা হয় তবে তা চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের ভবিষ্যতে অবসরে যাওয়ার পর পরিস্থিতি সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা দূর করবে এবং তারা নিশ্চিন্ত থেকে সরকারি কাজকর্মে আরও মন দিতে পারবে, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে আরও অবদান রাখবে।

বর্তমান অবস্থায় সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের চাকরির মেয়াদ যুক্তিসঙ্গত সময় পর্যন্ত বৃদ্ধি করলে মাসিক পেনশনজনিত যে ব্যয় হয় তার অনেকটা সাশ্রয় হবে। এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরির অবসরের বয়স ৬৫ বছর।

সার্বিক বিবেচনায় সরকারি চাকরিজীবীদের অবসরের বয়স ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত বৃদ্ধি করা যুক্তিসঙ্গত। তবে একবারে এ মেয়াদ বৃদ্ধি না করে ধাপে ধাপে করাই বাস্তবসম্মত। এর আগে সরকার ২০১১ সালে সরকারি চাকরিজীবীদের অবসরের বয়স ৫৭ বছর থেকে দুই বছর বৃদ্ধি করে ৫৯ বছর করেছে।

একইভাবে সরকার এখন সরকারি চাকরিজীবীদের অবসরের বয়স প্রথম ধাপে দুই বছর বৃদ্ধি করতে পারে। এর পর কয়েক বছর বিরতি দিয়ে ধাপে ধাপে এক বছর করে অবসরের বয়স ৬৫ বছর পর্যন্ত করতে পারে।

এতে একদিকে চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের মেয়াদ বাড়ানোর আকাক্সক্ষা পূরণ হবে; অন্যদিকে চাকরির মেয়াদ যে পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হবে সে মেয়াদে তাদের পেনশনের টাকা দিতে হবে না বিধায় পেনশনজনিত এ ব্যাপারে ব্যয় সাশ্রয় হবে।

পেনশনারদের কর্মরত চাকরিজীবীদের হারে পেনশন বৃদ্ধি করলে সরকারের যে অতিরিক্ত অর্থ খরচ হবে এর দ্বারা তার অনেকটা সাশ্রয় হবে। আরও উল্লেখ্য, পেনশনাররা সব সময় ভালো পেনশন পেলে অতি মেধাবীরা চাকরির জন্য বিদেশে না গিয়ে আরও বেশি সরকারি চাকরিতে আকৃষ্ট হবে। এতে মেধা পাচার অনেকাংশে কমে যাবে, যা জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন স্কেলের তুলনায় ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে কেন পেনশনারদের পেনশন চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির হারের চেয়ে অনেক কম হারে বৃদ্ধি করেছে? সম্ভবত এর জবাব হচ্ছে, বেখেয়ালে বা ভুলে এটি হয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে পেনশনারদের পেনশন ৬৫ বছর কম বয়স্কদের জন্য যে ৪০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা হয়েছিল সেটিই ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে হুবহু অনুসরণ করা হয়েছে।

তখন খেয়াল করা হয়নি, ২০০৯ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ৭০ শতাংশের মতো বৃদ্ধি করা হয়েছিল, আর ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে ১০০ শতাংশের মতো বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেল চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি যুগান্তকারী জাতীয় বেতন স্কেল।

এ বেতন স্কেলে তারা সার্বিকভাবে সন্তুষ্ট হয়েছে। তারপরও এ বেতন স্কেলে কিছু অসঙ্গতি ও জটিলতা ছিল। পরবর্তী সময়ে চাকরিরত ভুক্তভোগী সরকারি চাকরিজীবীরা সেসব অসঙ্গতি ও সমস্যা যখন সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরেন, তখন সরকার তা সমাধান করে দেয়।

ধারণা করা হচ্ছে, সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পেনশনারদের পেনশন ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে যে যথাযথভাবে বৃদ্ধি করা হয়নি, তা কেউই তুলে ধরেনি।

এমতাবস্থায় পেনশনপ্রাপ্ত অবসরভোগী সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা, জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-তে চাকরিরত সরকারি চাকরিজীবীদের যে হারে বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, সে হারে পেনশনারদের পেনশন বৃদ্ধি করা হোক এবং এর আগের বিভিন্ন জাতীয় বেতন স্কেলে যে কম হারে পেনশন প্রদান করা হয়েছে তারও প্রতিকার করা হোক।

অর্থাৎ একজন পেনশনার আগে যে সময়ই পূর্ণ অবসরপ্রাপ্ত হয়ে পেনশনে যান না কেন, তিনি যে গ্রেডের যে ধাপের পেনশনে গেছেন সেই একই গ্রেডের একই ধাপে ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে পূর্ণ অবসরপ্রাপ্ত হয়ে পেনশনে গেলে যে পরিমাণ পেনশন পেতেন, সেই পরিমাণ পেনশন জুলাই/২০১৫-তে তাকে প্রদান করার মাধ্যমে পেনশনারদের প্রতি বৈষম্য দূর করা হোক।

প্রকৌশলী মো. কামরুজ্জামান : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter