রাজস্ব আহরণ উদ্যোগে চাই পরিশীলিত সংস্কার

  ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজস্ব ভবন
ছবি: সংগৃহীত

দেশে বিদ্যমান কর সংস্কৃতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। দেশের রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতি প্রেক্ষাপটের কার্যকর উন্নতির জন্য চেষ্টা অব্যাহত আছে। দেশের ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত এখনও কম। এটি একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ পরিস্থিতিও নির্দেশ করে।

সম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের ধনীদের আরও ধনী হওয়ার মাত্রা দক্ষিণ এশিয়ায় অগ্রগামী, এমনকি চীনের চেয়েও। জিডিপি প্রবৃদ্ধি অগ্রসরমান (এবার ৭ অতিক্রম করবে জানা যাচ্ছে) থাকলে রাজস্ব আহরণ বাড়ে না কেন, কম হয় কী করে? তার মানে রাজস্ব আহরণ ঠিকমতো হচ্ছে না। আহরিত রাজস্বের মধ্যে প্রত্যক্ষ কর আয়করের অবস্থান এখনও দোটানায়।

যারা সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছে তাদের সবাই কি ঠিকমত করের আওতায় আসছে? যারা কর দেয় তারা নানাভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে, নানাভাবে কর রেয়াতও পাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড আহরিত মোট রাজস্ব আয়ের ৩৬/৩৭ শতাংশ ভ্যাট, ৩৩/৩৪ শতাংশ আয়করের এবং ৩০/৩১ শতাংশ কাস্টম ডিউটি (সম্পূরকসহ আমদানি শুল্ক)।

অথচ অর্থনীতির স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম হচ্ছে, আয়কর হবে সর্বোচ্চ। অন্যগুলো থাকবে তার পরের অবস্থানে। যে অর্থনীতিতে কোটি কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়, সম্পদ ভোগ করতে পারে, যারা ব্যাংকের পুঁজি পর্যন্ত লোপাট করে তাদের সবাইকে ঠিকমত কেন আয়করের আওতায় আনা যাচ্ছে না? যে অর্থনীতিতে পাবলিক সেক্টরেই বৃহৎ আয়-ব্যয় হয় সেখানে রাজস্ব আহরণে জবাবদিহি নিশ্চিত করা করা যাচ্ছে না।

সেক্টর কর্পোরেশনগুলোর কাছে এনবিআরের পাওনা পাওনাই থেকে যাচ্ছে। ট্যাক্স জিডিপি রেশিও ন্যায্য পর্যায়ে উন্নীত হতে হলে রাজস্ব পরিশোধে সরকারি খাতের ভূমিকা পর্যালোচনার প্রশ্ন এসে যাবে।

স্বাধীনতার পর ৪৭ বছরে দেশ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিদেশি ঋণ এবং প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার অনুদান গ্রহণ করা হয়েছে। আর অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে গৃহীত ঋণের পরিমাণ পাহাড় সমান। বিদেশি ঋণের আসলের বর্ষিক কিস্তির পরিমাণ প্রায় বারো/তেরো হাজার কোটি টাকা।

দেশি-বিদেশি ঋণের বার্ষিক সুদ পরিশোধে বাজেটের প্রায় ১৬ শতাংশই চলে যাচ্ছে। এরকম একটি অর্থনীতিতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণে খাতওয়ারি অসমাঞ্জস্যতাকে স্বাভাবিক অবস্থায় আনতে উপযুক্ত উদ্যোগ গ্রহণের বিকল্প নেই। বলা বাহুল্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ এক ধরনের নাজুক কাঠামোর কারণে রাজস্ব আহরণ কার্যকর অবস্থায় উন্নীত হতে পারছে না।

অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য বাড়ছে, অর্থ পাচারের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। সব সেক্টর থেকে যথাযথভাবে রাজস্ব আহরণের সুযোগ ও উপায় অবারিত হলে রাজস্ব আহরণ পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে। রাজস্ব যথাযথভাবে আহরিত হলে ট্যাক্স জিডিপি অনুপাত বাড়বে, অসামঞ্জস্যতাও দূর হবে।

যে দেশের আট লক্ষাধিক লোক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে পারে, এডিপিতে ব্যাপক অর্থব্যয়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, মাসে শত শত গাড়ি আমদানি হয়, সেখানে এত কম রাজস্ব আহরিত হতে পারে না। এটা বারবার পর্যালোচনা করা আবশ্যক।

দেশে বিদ্যমান রাজস্ব আহরণ আইন, এর কাঠামো এবং এর প্রয়োগ কৌশল সম্পর্কে, সর্বোপরি একটি কার্যকর কর সংস্কৃতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দৃঢ়চিত্ত রাজনৈতিক প্রতিশ্র“তিসহ সবার নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টিই আজ বিশেষভাবে বিবেচ্য হয়ে উঠছে।

এটি এ কারণে যে, করদাতা আর কর আহরণকারীর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন যত বাড়বে কর সংস্কৃতির বিকাশ তত বাধাগ্রস্ত হবে। কর রেয়াত বা অবকাশের রাজনৈতিক প্রয়োগ শুধু সাময়িক সমস্যার সৃষ্টি করবে না, দীর্ঘমেয়াদে অপপ্রয়োগের পথ উন্মোচিত হবে।

করযোগ্য আয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধিবিধানের প্রয়োগের ভাষায় যদি ভিন্ন মনোভাবের প্রকাশ পায় তাহলে তা জটিল, দ্ব্যর্থ ও কূটার্থবোধক হয়ে ওঠে। এমনিতেই এ দেশে প্রবর্তিত রাজস্ব আহরণ সংক্রান্ত সার্কুলারসমূহে নানা রকম জটিলতা রয়েছে।

ঔপনিবেশিক সরকারের তরফে করদাতার কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি মুখ্য বিবেচনায় না এলেও কর আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদার পাইক-পেয়াদা সুলভ যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ পেত।

এখন একটি স্বাধীন দেশে করদাতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন মহল বা পর্যায় থেকে নির্দেশনা দানের বিষয়টিও উদ্বেগজনক। এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে রাজস্ব বিভাগের সঙ্গে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদস্তিমূলক, পরস্পরকে দোষারোপ আর এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হওয়ার প্রবণতা পরিব্যাপ্ত হতে পারে।

রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থা যেখানে সামাজিক সুবিচার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক পরিপূরক দায়িত্ব পালনের বিষয়, ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোয় সঙ্গত কারণেই যার যথার্থতা অনুসরণ ছিল অনুপস্থিত, আজকের বাংলাদেশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে যেভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ তথা আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিপুল বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ছিল তা এখনও অব্যাহত থাকা সমীচীন হবে না।

অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত আয়করদাতারা যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে আয়কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ হন সেটা দেখতে হবে। কর আদায় নয়, কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত বেশিমাত্রায় করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, কর রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের ততই বিকাশ ঘটবে।

এরূপ অবস্থায় করদাতাকে তাড়া করে ফেরার স্পর্শকাতর পরিস্থিতির অবসান ঘটবে। তবে এ সবকিছুই নির্ভর করবে আয়কর আইনের ভাষা আর দৃষ্টিভঙ্গীতে কার্যকর ও কল্যাণকর পরির্বতন আনয়নের ওপর। আর সে প্রত্যাশা পূরণ প্রয়াসে আইন পরিষদ, নির্বাহী বিভাগ এবং করদাতা নির্বিশেষে সবার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক।

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর একযুগেরও বেশি সময় সেই ১৯২২ সালের আয়কর আইন ভারতস্থলে পাকিস্তান, পাকিস্তানস্থলে বাংলাদেশ প্রতিস্থাপিত ও নামাঙ্কিত হওয়া ছাড়া একইভাবে বলবৎ ও প্রযোজ্য থাকে।

আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ (১৯৮৪ সালের ৩৬ নং অধ্যাদেশ) জারির মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজস্ব আয়কর আইন প্রবর্তিত হয় ১৯৮৪ সালে। তবে তখন দেশে আইন পরিষদ বিদ্যমান না থাকায় রাষ্ট্র ও নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও গণগুরুত্বপূর্ণ আয়কর আইনটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি হওয়ায় এটির প্রণয়ন ও প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।

বারবার দাবি উঠেছে আয়কর অধ্যাদেশের স্থলে আয়কর আইন প্রণয়নের। আইনসভার অনুমোদনে প্রণীত না হওয়ায় লক্ষ্য করা যায়, অধ্যাদেশের সংশ্লিষ্ট ধারা-উপধারাসমূহ তথা বিধানাবলী মূলত ১৯২২ সালের মূল আইনেরই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতায় দেশি- বিদেশি বিশেষজ্ঞ প্রণীত প্রেসক্রিপশনমাত্র এবং এটি সে হিসেবেই বিবেচিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশে বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের ভাষা ও গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে গেলে এটা প্রতীয়মান হয় যে, বছর বছর অর্থ আইনে যেসব ছিটেফোঁটা শব্দগত সংযোজন-বিয়োজন এবং মূল ধারণার আওতায় প্রয়োগযোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তন বা পরিমার্জন অনুমোদিত হয়েছে তা ধারণ করা ছাড়া ১৯২২-এর মূল আইনের ভাব ভাষা দৃষ্টিভঙ্গিগত তেমন কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার দৃশ্যগোচর হয় না।

বরং প্রতি বছর কর নির্ধারণ, শুনানি, বিচার-আচারে কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার, কর অবকাশ-নিষ্কৃতি-ছাড় কিংবা বিশেষ সুবিধাবলীর ধারা-উপধারা সংযোজন-বিয়োজন করতে করতে অনেক ক্ষেত্রেই করারোপ, আদায় ও করদাতার অধিকার, কর অবকাশ-নিষ্কৃৃতির সুবিধা সংক্রান্ত মৌল দর্শন হয়েছে বিভ্রান্ত, বিকৃত ও বিস্মৃত।

পক্ষান্তরে, যুগের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর নির্ধারণ ও আদায় সংক্রান্ত বিধানাবলী সহজীকরণ-সরলীকরণ তথা করদাতাবান্ধব করার পরিবর্তে ক্ষেত্রবিশেষে আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতির সমকালীন পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে আয়কর ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ সংবলিত সংশোধন-সংযোজন-বিয়োজন প্রয়াস বারবার যেন উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।

একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবগাহন করে অধুনিকমনস্ক হতে চাইলেও সে দেশের আয়কর আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখনও যেন ঔপনিবেশিক আমলের পারস্পরিক অবিশ্বাস, সংশয়-সন্দেহ, পক্ষপাতিত্ব ও জটিলতাপূর্ণ।

করদানে সক্ষম ব্যক্তিকে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, নিরুৎসাহিতবোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যমান আইনের ভাষা, দৃষ্টিভঙ্গি ও সার্বিক সীমাবদ্ধতা।

আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার অর্থে ভাড়া করা দেশি-বিদেশি রাজস্ব আইন বিশেষজ্ঞ দ্বারা বাংলাদেশের বিদ্যমান গোটা আয়কর আইনকে পুনর্লিখিত করে ইংরেজি ভাষায় প্রণীত খসড়ার ওপর মতামত চাওয়া হয়। ১৯৮৭ সালে বাংলাভাষা প্রয়োগ আইন পাসের পর দেশের সব আইন বাংলা ভাষায় প্রণয়নের বিধান থাকলেও আয়কর আইনটি ইংরেজি ভাষায় দুর্বোধ্য ও দ্ব্যর্থবোধক প্রক্রিয়ার সমাহার ঘটানো হলে- বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আবহাওয়া ও সংস্কৃতিতে তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সঙ্গত প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

এ দেশের রাজস্ব আইনগুলো ও এর প্রয়োগ পদ্ধতিতে থাকতে হবে-এ দেশেরই আবহমান অর্থনীতির আবহে লালিত ধ্যান-ধারণার প্রতিফলন, তবেই বাড়বে এর গ্রহণযোগ্যতা এবং এর বাস্তবায়নযোগ্যতা।

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter