আমরা ও তোমরার গল্প

  জয়া ফারহানা ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রিপুরা উপজাতি

ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনের সময় ‘মাল্টি কালচারালিজম’ নিয়ে বিশ্ব নেতাদের যত হইচই শোনা গেছে, তা যে একরকম ভণ্ডামি- তার প্রমাণ পাই সারা বিশ্বে ভিন্ন সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর প্রতি অত্যাচার নির্যাতন নিপীড়ন এবং লাঞ্ছনা-বঞ্চনা দেখে।

বিশ্বজুড়েই সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগোষ্ঠী অন্যায়-অবিচারের শিকার। কিছুদিন আগে জাতিসংঘ তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চীনের জিনজিয়ান প্রদেশে ‘গণ রি-এডুকেশন ক্যাম্পে’ দশ লাখ মুসলিমকে অন্যায়ভাবে আটকে রাখা হয়েছে। চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়া প্রদেশে উয়েইঝু গ্র্যান্ড মসজিদ পরিকল্পনা ও নির্মাণ অনুমোদন মেনে তৈরি হয়নি অজুহাতে গেল আগস্টের প্রথম সপ্তাহে সেটি ভেঙে দিয়েছে জিনজিয়া প্রদেশের প্রশাসন।

উইঘুরদের প্রতি এ অন্যায় অবশ্য নতুন কিছু নয়। এত বিশাল চীন, বিশাল জনগোষ্ঠী অথচ সামান্য দশ লাখ উইঘুর সেখানে নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে মাথা উঁচু করে টিকে থাকতে পারছে না। তারপরও মহান চীন! মহান তাদের সংস্কৃতি! এই মহান সংস্কৃতিতে ভিন্ন সংস্কৃতির উইঘুরদের নিজস্বতা নিয়ে বাঁচার ব্যবস্থা নেই।

গত ১৭ বছরে অন্তত ৮টি বড় ধরনের হামলার শিকার হয়েছে উইঘুর মুসলিম। শুধু চীনের কথাই বলি কেন, বিশ্বজুড়ে আজ এথনিক মাইনোরিটি দুর্ভোগ-দুর্দশার শিকার। ভিন্ন সংস্কৃতিকে নিজের সংস্কৃতির মতো শ্রদ্ধা করতে পারা নিজের সংস্কৃতির সমান মর্যাদা দেয়া খুব সহজ ব্যাপার নয় বোধহয়।

নয় তো যে আইনস্টাইন মানুষ হয়েও বিশ্বজুড়ে মহাপুরুষের মর্যাদা পেয়েছেন এবং যিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে নাগরিক অধিকারের জন্য আন্দোলন করেছেন তিনিও যে বর্ণবাদী ছিলেন তার প্রমাণ মিলেছে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত ‘দ্য ট্রাভেল ডায়েরিজ অব আলবার্ট আইনস্টাইন : দ্য ফারইস্ট প্যালেস্টাইন অ্যান্ড স্পেন’ গ্রন্থে। ১৯২২-২৩ সালে আইনস্টাইন স্পেন থেকে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সেখান থেকে চীন ও জাপান সফরে গিয়েছিলেন। মিসরের পোর্ট সাইদে পৌঁছানোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে তিনি লিখেছেন, এখানে চারদিকে নানা রঙের লেভেনটাইনস।

যেন নরক থেকে উগড়ে দেয়া হয়েছে। লেভান বলতে সাইপ্রাস, মিসর, ইরাক, জর্ডান, লেবানন, প্যালেস্টাইন, সিরিয়া ও তুরস্ক পর্যন্ত দেশগুলোকে ভাবা হয়। পোর্ট সাইদে বিদেশি জাহাজে পণ্য বিক্রি করতে উঠত এরা। শ্রমজীবী শ্রেণীর প্রতি এত বিদ্বেষ ছিল আইনস্টাইনের! শ্রীলংকার কলম্বোর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘এরা মাটির ওপর মারাত্মক নোংরা পরিবেশ এবং কটু গন্ধের মধ্যে থাকে। সামান্যই কাজকর্ম করে আর চাহিদাও সামান্য।’

সামান্য চাহিদা থাকা আইনস্টাইনের চোখে দোষ তবে! সবচেয়ে বাজে মন্তব্য তিনি করেছেন চীনাদের সম্পর্কে। লিখেছেন, চীনা ছেলেমেয়েরা উদ্যমহীন এবং ভোঁতা বুদ্ধির অধিকারী। এরা যদি আর সব জাতিকে ছাড়িয়ে যায় তাহলে কী হবে? অথচ এই আইনস্টাইনই বহুবার বর্ণবাদকে শ্বেতাঙ্গদের ব্যাধি বলেছেন। তিনি নিজেও তবে এ ব্যাধি থেকে মুক্ত ছিলেন না। শুধু আইনস্টাইন নন, কম উচ্চতার কারণে চীনা জাতি বহুদিন পর্যন্ত ইউরোপীয়দের কাছে হাসির পাত্র হয়ে থেকেছে।

অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ এবং ইংরেজ জাতির চেয়ে আকারে ছোট ও ভিন্ন অবয়বের জন্য চীনা জাতিকে সহ্য করতে হয়েছে বহুরকম তাচ্ছিল্য। কে না জানে, সেই ছোট্ট উচ্চতার চীনা জাতি অলিম্পিকে এখন প্রায় সব ইউরোপীয়ান দেশের চেয়ে বেশি স্বর্ণপদক পায়।

যে চীন উচ্চতা এবং দেখতে ভিন্ন হওয়ার কারণে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তারাই এখন বঞ্চিত করছে উইঘুরদের! শ্বেতবর্ণের মানুষরাই যে কেবল শ্রেষ্ঠত্বের রোগে ভোগে তাই নয়, উচ্চতার কারণেও কোনো কোনো জাতি অন্যায় শ্রেষ্ঠত্বের বোধে ভুগতে পারে। সে অভিজ্ঞতা আছে বাঙালিদের। মাছলি (মাছ) খাওয়া বাঙালিরা খর্বকায় এবং বুদ্ধিতে খাটো অজুহাতে পাকিস্তানিরা বাঙালিদের জাতীয় ক্রিকেট দলে অংশ নিতে দেয়নি। আজ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়!

২.

সংস্কৃতি নিজে সরল, নির্দোষ ও নমনীয়। সরল বলেই পড়েছে জটিল রাজনীতির খপ্পরে। এমনই জটিলতায় যে অনেক প্রশ্নের উত্তরই আমরা সমাজতত্ত্ব, নৃবিজ্ঞান, রাজনীতি বিজ্ঞান, অর্থনীতি, এমনকি সাহিত্যের কাছেও পাচ্ছি না। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও হাড়ি-ডোম-কৈর্বত্য-ব্যাধ-দলিত এবং নৃতাত্ত্বিকভাবে ভিন্ন জনগোষ্ঠী বৈষম্য-বঞ্চনা-দারিদ্র্য-অবহেলা ও নিপীড়নের চূড়ান্ত শিকার হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছে। পার্বত্য অঞ্চলে যখন কোনো সংঘাত-সংঘর্ষে পাহাড়িরা নিহত হয়, পত্রিকাওয়ালারা লেখে, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে মারা গেল আরও ৪ জন, আরও ৬ জন, আরও ১০ জন...।

আসল সত্য এই যে, আমরা তাদের ভাইয়ের চোখে দেখি না। বোনের চোখেও দেখি না। দেখলে কেমন করে কৃর্ত্তিকা ত্রিপুরা পূর্ণা, যার বয়স দশও ছোঁয়নি, কিছুদিন আগে গত ২৮ জুলাই তাকে ধর্ষণ করে হত্যা করলাম? তাও তার বাড়ির কাছেই। কেমন লেগেছিল পূর্ণার মায়ের? তা কি আমরা ভেবেছি একবারও? এরপরও আমরা দাবি করব, পূর্ণাকে আমরা বোনের চোখে দেখি? খাগড়াছড়ির দীঘিনালার ৯ মাইল এলাকায় নিজের বাড়ির পাশে ধর্ষণের শিকার কৃর্ত্তিকা ত্রিপুরা পূর্ণার মৃতদেহ পড়েছিল। সেই খাগড়াছড়িতেই গুম, খুন ও অপহরণের প্রতিবাদ করতে গিয়ে আবারও হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন ৬ জন।

শুধু খাগড়াছড়ি নয়। গোটা পার্বত্য অঞ্চল বিভীষিকাময় হয়ে উঠেছে। হয়েছে আরও আগে। কল্পনা চাকমা অপহৃত হয়েছিলেন। সেটা হয়তো শুরু। তারপর ধারাবাহিকভাবে চলেছে ধর্ষণ, হত্যা। বিচার হয়নি সুজাতা তুমাচিং হত্যারও। ২২ বছরের হিসাব বাদ দিই। কেবল এ বছরই, এই ২০১৮ সালে পাহাড়ি নারী ধর্ষণ ও হত্যার তালিকা দীর্ঘ। ২২ জানুয়ারি রাঙ্গামাটির বিলাইছড়িতে দুই মারমা তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। ২৭ জানুয়ারি ঘটেছে রামগড়ে। ৮ মার্চ মাটিরাঙায় ত্রিপুরা কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। ১৮ মার্চ রাঙ্গামাটির কুতুবছড়ি থেকে দুই নারী নেত্রী অপহৃত হয়েছেন।

১৩ এপ্রিল বান্দরবানের আলী কদমে ত্রিপুরা কিশোরী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ১৮ মে সীতাকুণ্ডে দুই ত্রিপুরা কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ১৭ জুন বান্দরবানের লামায় নিজ বাড়িতে এক মারমা কিশোরীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। ২১ জুন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে কিশোরী গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

৫ জুলাই চট্টগ্রামের রাউজানে বৌদ্ধমন্দিরের অনাথ আশ্রমে মারমা কিশোরী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ৯ ও ১৭ জুলাই কাউখালী ও মহাছড়িতে দুই পাহাড়ি কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। হত্যা এবং ধর্ষণের তালিকাটি আরও দীর্ঘ। শুধু হত্যা আর ধর্ষণই অপরাধ? মানুষগুলো কখনও নিজেদের জমিজমা হারাচ্ছে। কখনও হারাচ্ছে সহায় সম্পদ। নিজ বাসভূমি থেকে উচ্ছেদের শিকার হয়েছে বহুবার। ভূমি দখল, পাহাড়ি মেয়েদের প্রতি নির্যাতন, অপমান এবং লাঞ্ছনার শিকার হয়ে নীরবে দেশান্তর ঘটছে পাহাড়িদের।

৩.

বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছিলেন, সাহেবদের শৌখিন পাখি শিকারের ইতিহাসও লেখা আছে। কিন্তু বাঙালির ইতিহাস নেই। তার ধারণা ধার করে বলি, পাহাড়িদের ইতিহাস কোথাও লেখা নেই। বাঙালিরা তাদের ইতিহাস আত্মসাৎ করেছে। লুকাতে চেয়েছে রক্ত। মুছে দিতে চেয়েছে তাদের বীরত্ব, ত্যাগ এবং রক্তের ইতিহাস। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে চাকমারা।

কোথাও লেখা আছে সে ইতিহাস? কার্পাস মহলের জুমিয়ারা যে অন্যায় খাজনা দিতে অস্বীকার করে কোম্পানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল, সে স্বীকৃতিও আমরা তাদের দিতে চাই না। আমাদের মহাশ্বেতা দেবী নেই। এখন ইলা মিত্রও নেই। একজন ইলা মিত্রই পারতেন বিশ্বায়নের প্রসবকৃত বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হতে।

একজন ইলা মিত্র পারতেন ওরা আর আমরায় বিভক্ত বিভাজিত সংস্কৃতি থেকে উদ্ধার করতে। আমরা মানে যারা স্যুট-টাই পরে, ইংরেজিতে কথা বলে এবং ব্র্যান্ডিং ইমেজ মেনে চলে। আর ওরা মানেই হল অসভ্য, অ-সংস্কৃতিমান, অলস ও অশিক্ষিত। কলোনিয়াল লিটারেচার থেকে যে আমরা এক পা-ও সরে আসিনি, ওরা আর আমরার বিভাজনই তার প্রমাণ। বিশ্বজুড়েই দেখি ভিন্ন সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর অবদমন।

জয়া ফারহানা : গল্পকার ও প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter