বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস

পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে তরুণ সমাজ

  ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ ১০ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে তরুণ সমাজ

প্রতি বছর ১০ অক্টোবর বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হয়। World Federation for Mental Health (WFMH)-এর উদ্যোগে ১৯৯২ সালে এ দিনটি প্রথম উদযাপিত হয়। পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (WHO) প্রতি বছর এ দিনটিকে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানসিক রোগ সম্পর্কে সমাজে যে ভ্রান্ত বিশ্বাস, কুসংস্কারসহ নানাবিধ স্টিগমা প্রচলিত আছে তা দূর করতে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে এ দিবসটি উদযাপিত হয়। যদিও এ ব্যাপারে কর্মকাণ্ড বছরজুড়েই চলে। দিবসটি সামনে রেখে প্রতি বছর এক বা একাধিক মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাকে থিম হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। সারা বছর মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত অন্যান্য কর্মকাণ্ডের সঙ্গে প্রতি বছরের নির্ধারিত থিমটি নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করা হয়।

এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের থিম হচ্ছে ‘Young People and mental health in a changing world’, অর্থাৎ ‘পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে তরুণ সমাজ এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য’। যদিও ‘Young People’-কে বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘তরুণ মানুষ’ বা ‘তরুণ সমাজ’; কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘Young People’কে একটি বয়সের সীমারেখা দ্বারা সংজ্ঞায়িত করে। WHO- এর সংজ্ঞা অনুযায়ী Adolescent age (বয়োঃসন্ধিকাল) ১০-১৯ বছর, Youth (তরুণ-তরুণী) ১৫-২৪ বছর এবং Young people (তরুণ সমাজ) ১০-২৪ বছর। কাজেই ‘Young people’ বললে বয়োঃসন্ধিকাল এবং তরুণ-তরুণী বা যুব সম্প্রদায় উভয়কেই বোঝায়।

পৃথিবীর একটি মৌলিক চরিত্র হচ্ছে গতিময়তা, পরিবর্তনশীলতা। জীবনের ধর্মও তা-ই। ক্রমপরিবর্তনশীল এ পৃথিবীতে সে-ই সুস্থ-সুন্দরভাবে বেঁচে থাকতে পারে, যার অভিযোজন ক্ষমতা তথা খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা বেশি। পৃথিবী তার নিজস্ব নিয়মে পরিবর্তিত হয়। আর্থ-সামাজিক অবস্থা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ, পারস্পরিক সম্পর্ক, সম্পর্কের ভিত্তি- সবকিছুই পরিবর্তিত হয়। আর এ পরিবর্তন প্রভাব ফেলে প্রত্যেক মানুষের জীবনে, মননে। তবে তরুণ জনগোষ্ঠীই এ পরিবর্তনগুলো দিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়। পরিবর্তনের হাওয়া তাদের চিন্তা-চেতনায়, মননে, তাদের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভূত পরিবর্তন ও সমস্যার সৃষ্টি করে।

প্রসঙ্গত লিখছি ‘পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে তরুণ সমাজ এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্য’ নিয়ে। সঙ্গত কারণেই সব পবির্তনের মাঝেই ভালো ও খারাপ দুটি দিকই থাকে। পরিবর্তন নিয়ে ভীত হওয়ার কিছু নেই। খোলা মনে উন্নত মানসিকতা তৈরির প্রত্যয় নিয়ে পরিবর্তনকে গ্রহণ করতে হবে। পরিবর্তনশীল এ পৃথিবীর ক্রম পরিবর্তনের অসংখ্য ভালো দিক রয়েছে, যা আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে সমৃদ্ধ করতে পারে। একইভাবে পরিবর্তনের নেতিবাচক দিকগুলো আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের তরুণ সমাজকে ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক রকম সমস্যা যেমন- গৃহনির্যাতন, যৌন হয়রানি বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে, সাইবার অপরাধসহ নানাবিধ সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়। উপরন্তু তরুণ সমাজের অধিকাংশই তাদের দিনের বেশির ভাগ সময় কোনো না কোনোভাবে ইন্টারনেটে ব্যয় করে। এর মধ্যে আবার একটি অংশ মাদকাসক্ত। তদুপরি তারুণ্য হচ্ছে জীবনের এমন একটা সময় যখন অধিকাংশ মানসিক রোগের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। পারিপার্শ্বিক অবস্থা তথা পরিবর্তনশীল পৃথিবী এ ক্ষেত্রে Precipitating factor হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ রোগের প্রকাশকে ত্বরান্বিত করে। এ বয়সে তরুণদের মধ্যে আরেকটি সমস্যা খুব প্রকট আকারে দেখা দেয় যাকে আমরা সাইকিয়াট্রির ভাষায় বলি Adolescent crisis। তারুণ্যের এ সময়ে অধিকাংশ তরুণ তাদের আত্মপরিচয়, জীবনের লক্ষ্য, সমাজ-সংসার তথা পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়া নিয়ে একটা অস্থিরতা ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে ভোগে। তাদের মধ্যে একটা আবেগের ঝড়ো তাণ্ডব অনেক সময়ই খেলা করতে থাকে। এ অস্থিরতা ও আবেগকে শক্ত হাতে এবং দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভবিষ্যৎ জীবনটা ব্যর্থতা-হতাশার আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের অনেক তরুণেরই ধারণা খুবই অল্প এবং এ সমস্যাগুলো কীভাবে মোকাবেলা করতে হবে সে সম্পর্কেও তাদের শিক্ষা ও দক্ষতা খুবই অপ্রতুল। ফলে এ অজ্ঞতা অনেক তরুণকেই দিশেহারা করে দেয়- মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। কাজেই এ ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান ও দিকনির্দেশনা প্রয়োজন।

পরিবর্তন তা ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক যা-ই হোক না কেন, আমাদের লক্ষ্য হবে তাদের যথাক্রমে গ্রহণ বা বর্জনের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য অটুট রাখা। সাইকিয়াট্রির ভাষায় আমরা বলি ‘Set the limit’, অর্থাৎ পরিমিত মাত্রাবোধ। আপনাকে, আমাকে, বিশেষ করে আমাদের তরুণ সমাজকে শিখতে হবে কোথায় থামতে হবে। জীবনকে উৎপাদনক্ষম করতে গেলে, মানসিক স্বাস্থ্যকে অটুট রাখতে হলে প্রতিটি পরিবর্তনের জন্য আমাদের প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে ‘Set the limit’ ঠিক করতে হবে- অবশ্যই ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে। তবে এক্ষেত্রে শেখার দৃষ্টিভঙ্গি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে যা-ই ঘটুক না কেন, আসুন আমরা ইতিবাচক চিন্তা করি, গঠনমূলক মানসিকতা নিয়ে সব পরিবর্তনকে মোকাবেলা করি, সুস্থ-সুন্দর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বেঁচে থাকি।

বর্তমান পরিবর্তনশীল পৃথিবীর সব অস্থিরতা, যুদ্ধ, মানসিক চাপ ইত্যাদি সবকিছুকে বিবেচনায় রেখে এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি শক্ত, মজবুত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্লাটফর্ম বা ক্ষেত্র তৈরি করা, যাতে আমাদের এ ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পরিবর্তনশীল এ পৃথিবীতে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য এবং স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, নিজে সচেতন হতে পারে এবং অন্যকে সচেতন করতে পারে। সব ধরনের গোঁড়ামি, ক্ষুদ্রতার ঊর্ধ্বে উঠে মুক্ত মন নিয়ে স্টিগমামুক্ত হয়ে তাদের সমস্যা যথাযথ জায়গায় প্রকাশ করতে পারে, সেবা গ্রহণ করতে পারে এবং উন্নততর মানসিক স্বাস্থ্য উপভোগ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, সুস্থ মন হচ্ছে এ পৃথিবীকে সুন্দরভাবে উপলব্ধি করার, আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করার পূর্বশর্ত।

ডা. আহসান উদ্দিন আহমেদ : সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব সাইকিয়াট্রি, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

[email protected]

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter