অপ্রতিরোধ্য শিল্পোদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম
jugantor
চেহলাম আজ
অপ্রতিরোধ্য শিল্পোদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম
দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই উদ্যোক্তার কাছে স্বপ্ন এসে ধরা দিত। তিনি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারতেন

  যুগান্তর রিপোর্ট  

২২ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যমুনা গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের চেহলাম আজ। সামাজিক দূরত্ব মেনে সীমিত পরিসরে যমুনা ফিউচার পার্কের মোগল কনভেনশন হলে বাদ জোহর এই চেহলাম অনুষ্ঠিত হবে। এতে পরিবারের সদস্য, স্বজন, প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং গুণগ্রাহীরা অংশ নেবেন।

নুরুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন ১৪ জুলাই রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন আপসহীন এই যোদ্ধা। তার মৃত্যুতে দেশের ব্যবসাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। চেহলাম উপলক্ষে দৈনিক যুগান্তর কার্যালয়ে সকাল থেকে জোহরের আগ পর্যন্ত কোরআন খতম এবং দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।

শিল্প খাতের একটি বিপ্লবের নাম নুরুল ইসলাম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রেখেছেন সফলতার স্বাক্ষর। একজীবনে দু’হাত ভরে দেশকে দিয়ে গেছেন ক্ষণজন্মা এই মানুষটি। যৌবনে অস্ত্রহাতে ’৭১ সালে দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন রণাঙ্গনের প্রথম সারির এই যোদ্ধা। আর স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শুরু করেন নতুন যুদ্ধ।

এ যেন অবিরাম পথচলা। মেধা, সততা, পরিশ্রম ও সাহসিকতার সঙ্গে একে একে ৪১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন আপসহীন এই কর্মবীর। এসব প্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হয় অর্ধলক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান। দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ এই কণ্ঠস্বর আজীবন, নির্দ্বিধায় ‘কালোকে কালো’ এবং ‘সাদাকে সাদা’ বলে গেছেন। রক্তচক্ষুর ভয়ে নীতি থেকে কখনও একচুলও পিছপা হননি। দেশকে নিয়ে বিশাল স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই ৭৪ বছর বয়সে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই স্বপ্নদ্রষ্টা। জন্ম নিলে মৃত্যু নিশ্চিত-এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম সত্য। কিন্তু কিছু মানুষের মৃত্যু আক্ষরিক অর্থেই অপূরণীয়।

বিশেষ করে ব্যক্তি যখন একটি ‘ইন্সটিটিউশন’-এ পরিণত হন, তখন তার মৃত্যু হাজারও মানুষের স্বপ্নকে করে দেয় ক্ষতবিক্ষত। কবির ভাষায়: ‘পাল্টে দিতে যুগ-যমানা চাই না অনেক জন, এক মানুষই আনতে পারে জাতির জাগরণ।’ তেমনি এক সিংহপুরুষ ছিলেন নুরুল ইসলাম। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই উদ্যোক্তার কাছে স্বপ্ন এসে ধরা দিত। তিনি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারতেন। তার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে একটি বিপ্লব যেন থমকে দাঁড়াল। তবে রেখে যাওয়া কাজ এগিয়ে নেবেন-এমন ঘোষণা দিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।

জন্ম ও পারিবারিক জীবন : নুরুল ইসলাম ৩ মে ১৯৪৬ সালে ঢাকার নবাবগঞ্জের চুড়াইন ইউনিয়নের কামালখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আমজাদ হোসেন এবং মাতা জমিলা খাতুন। বিশিষ্ট শিল্পপতি নুরুল ইসলাম যেমন দেশকে ভালোবাসতেন, তেমনি ভালোবাসতেন জন্মদাত্রী জননীকেও। স্রষ্টা তাকে মায়ের প্রতি সেই ভালোবাসার প্রতিদানও দিয়েছেন অকুণ্ঠ হস্তে। দেশের শিল্প খাতে মহীরুহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

নুরুল ইসলামের স্ত্রী সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বর্তমান জাতীয় সংসদের এমপি অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। ছেলে শামীম ইসলাম যমুনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তিন মেয়ে-সারীয়াত তাসরীন সোনিয়া, মনিকা নাজনীন ইসলাম এবং সুমাইয়া রোজালিন ইসলাম যমুনা গ্রুপের পরিচালক।

কর্মজীবন : তিনি যে শিল্পই গড়ে তুলতে চেয়েছেন, সেখানেই সফল হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন। দেখতেন অনেক বড় স্বপ্ন। ব্যবসায়িক জীবনে অত্যন্ত সফল এ মানুষটি, উদ্যোক্তা হয়ে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিন্তা লালন করতেন। শিক্ষাজীবনে এসব স্বপ্নের কথা শেয়ার করতেন সহপাঠীদের সঙ্গে। তবে কর্মজীবনের শুরুতে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। এর মধ্যেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। অস্ত্রহাতে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যখন সবাইকে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান, সেই ডাকে সাড়া দিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মাতৃভূমির রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যেমন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তেমনি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে দেশমাতৃকার অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য গভীর দেশপ্রেম নিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন তার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। শেষ বয়সে এসেও অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন তিনি। তার ‘অভিধানে’ ছিল না কোনো সাপ্তাহিক ছুটি। সাত দিনই অফিস করতেন দেশের অর্থনীতির এই উজ্জ্বল তারকা।

শিল্প খাতে একটি বিপ্লবের নাম নুরুল ইসলাম : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিতে নুরুল ইসলাম একজন আধুনিক চিন্তার সাহসী উদ্যোক্তা। স্বাধীন বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতের আলোচিত ও উজ্জ্বল মুখ তিনি। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা গ্রুপ। কর্মজীবনে অসংখ্য বাধা এসেছে। সব বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন শিল্প খাতের এই আপসহীন উদ্যোক্তা। এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, যা দেশের মানুষ কখনও কল্পনাও করেনি।

এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিং মল যমুনা ফিউচার পার্ক, যমুনা ইলেকট্রনিক্স, যমুনা ডিস্টিলারি, বস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স, ওভেন গার্মেন্টস, রাসায়নিক, চামড়া, বেভারেজ টয়লেট্রিজ, মোটরসাইকেল এবং আবাসন খাতসহ যে ব্যবসাতেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছেছেন এই কর্মবীর। যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প ও সেবা খাতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমেও তিনি বিশাল বিনিয়োগ করেছেন। দুই দশক আগে প্রতিষ্ঠা করেন পাঠকপ্রিয় দৈনিক যুগান্তর। এ ছাড়া বিশ্বমানের বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেল তৈরি ছিল তার বিশাল এক স্বপ্ন। এরই অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা টেলিভিশন।

নুরুল ইসলাম মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হবে, মাথা তুলে দাঁড়াবে। শুরু থেকেই তার আগ্রহের পুরোটাই ছিল ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। তাই যমুনা ফ্যান, অ্যারোমেটিক সাবান এবং পেগাসাস কেডসের মতো জনপ্রিয় বাংলাদেশি ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন তিনি। শুধু গার্মেন্টস বা ডেনিম নয়, উৎপাদনে নানা বৈচিত্র্য এনেছিলেন দূরদর্শী এই মানুষটি। গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ফ্রিজ ও মোটরসাইকেলসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী। পণ্যের মানের ব্যাপারে কখনও আপস করতেন না। সব সময় বলতেন, যে পণ্যই তিনি বানাবেন, সেটি হতে হবে ‘নাম্বার ওয়ান’। গুণগত মানের কারণে যিনি একবার ব্যবহার করবেন, তিনি পণ্যের সুনাম ছড়াবেন।

পরিচ্ছন্ন ব্যবসায়ী : ব্যক্তিগত জীবনে নুরুল ইসলাম ছিলেন একজন পরিচ্ছন্ন ব্যবসায়ী। তার সব অর্থ, মেধা ও পরিশ্রম দেশেই বিনিয়োগ করেছেন। খেলাপি ঋণ এবং বিদেশে টাকা পাচারের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগপর্যন্ত কোনো ব্যাংকে তার এক টাকাও খেলাপি ঋণ ছিল না। বিদেশে টাকা পাচারের কোনো অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে। এ কারণে তার মালিকানাধীন দুটি গণমাধ্যম-দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভি খেলাপি ঋণ ও টাকা পাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সংবাদ প্রচার করছে।

চেহলাম আজ

অপ্রতিরোধ্য শিল্পোদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম

দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই উদ্যোক্তার কাছে স্বপ্ন এসে ধরা দিত। তিনি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারতেন
 যুগান্তর রিপোর্ট 
২২ আগস্ট ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

যমুনা গ্রুপের প্রয়াত চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামের চেহলাম আজ। সামাজিক দূরত্ব মেনে সীমিত পরিসরে যমুনা ফিউচার পার্কের মোগল কনভেনশন হলে বাদ জোহর এই চেহলাম অনুষ্ঠিত হবে। এতে পরিবারের সদস্য, স্বজন, প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী, ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং গুণগ্রাহীরা অংশ নেবেন।

নুরুল ইসলাম গত ১৩ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন ১৪ জুলাই রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন আপসহীন এই যোদ্ধা। তার মৃত্যুতে দেশের ব্যবসাঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। চেহলাম উপলক্ষে দৈনিক যুগান্তর কার্যালয়ে সকাল থেকে জোহরের আগ পর্যন্ত কোরআন খতম এবং দোয়া অনুষ্ঠিত হবে।

শিল্প খাতের একটি বিপ্লবের নাম নুরুল ইসলাম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রেখেছেন সফলতার স্বাক্ষর। একজীবনে দু’হাত ভরে দেশকে দিয়ে গেছেন ক্ষণজন্মা এই মানুষটি। যৌবনে অস্ত্রহাতে ’৭১ সালে দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন রণাঙ্গনের প্রথম সারির এই যোদ্ধা। আর স্বাধীনতার পর দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য শুরু করেন নতুন যুদ্ধ।

এ যেন অবিরাম পথচলা। মেধা, সততা, পরিশ্রম ও সাহসিকতার সঙ্গে একে একে ৪১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন আপসহীন এই কর্মবীর। এসব প্রতিষ্ঠানে সৃষ্টি হয় অর্ধলক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান। দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ এই কণ্ঠস্বর আজীবন, নির্দ্বিধায় ‘কালোকে কালো’ এবং ‘সাদাকে সাদা’ বলে গেছেন। রক্তচক্ষুর ভয়ে নীতি থেকে কখনও একচুলও পিছপা হননি। দেশকে নিয়ে বিশাল স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন পুরোপুরি বাস্তবায়নের আগেই ৭৪ বছর বয়সে মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই স্বপ্নদ্রষ্টা। জন্ম নিলে মৃত্যু নিশ্চিত-এটিই পৃথিবীর সবচেয়ে নির্মম সত্য। কিন্তু কিছু মানুষের মৃত্যু আক্ষরিক অর্থেই অপূরণীয়।

বিশেষ করে ব্যক্তি যখন একটি ‘ইন্সটিটিউশন’-এ পরিণত হন, তখন তার মৃত্যু হাজারও মানুষের স্বপ্নকে করে দেয় ক্ষতবিক্ষত। কবির ভাষায়: ‘পাল্টে দিতে যুগ-যমানা চাই না অনেক জন, এক মানুষই আনতে পারে জাতির জাগরণ।’ তেমনি এক সিংহপুরুষ ছিলেন নুরুল ইসলাম। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই উদ্যোক্তার কাছে স্বপ্ন এসে ধরা দিত। তিনি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারতেন। তার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে একটি বিপ্লব যেন থমকে দাঁড়াল। তবে রেখে যাওয়া কাজ এগিয়ে নেবেন-এমন ঘোষণা দিয়েছেন তার পরিবারের সদস্যরা।

জন্ম ও পারিবারিক জীবন : নুরুল ইসলাম ৩ মে ১৯৪৬ সালে ঢাকার নবাবগঞ্জের চুড়াইন ইউনিয়নের কামালখোলা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আমজাদ হোসেন এবং মাতা জমিলা খাতুন। বিশিষ্ট শিল্পপতি নুরুল ইসলাম যেমন দেশকে ভালোবাসতেন, তেমনি ভালোবাসতেন জন্মদাত্রী জননীকেও। স্রষ্টা তাকে মায়ের প্রতি সেই ভালোবাসার প্রতিদানও দিয়েছেন অকুণ্ঠ হস্তে। দেশের শিল্প খাতে মহীরুহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

নুরুল ইসলামের স্ত্রী সাবেক মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বর্তমান জাতীয় সংসদের এমপি অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। ছেলে শামীম ইসলাম যমুনা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, তিন মেয়ে-সারীয়াত তাসরীন সোনিয়া, মনিকা নাজনীন ইসলাম এবং সুমাইয়া রোজালিন ইসলাম যমুনা গ্রুপের পরিচালক।

কর্মজীবন : তিনি যে শিল্পই গড়ে তুলতে চেয়েছেন, সেখানেই সফল হয়েছেন। ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত দূরদর্শী ছিলেন। দেখতেন অনেক বড় স্বপ্ন। ব্যবসায়িক জীবনে অত্যন্ত সফল এ মানুষটি, উদ্যোক্তা হয়ে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিন্তা লালন করতেন। শিক্ষাজীবনে এসব স্বপ্নের কথা শেয়ার করতেন সহপাঠীদের সঙ্গে। তবে কর্মজীবনের শুরুতে যোগ দেন সেনাবাহিনীতে। এর মধ্যেই শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। অস্ত্রহাতে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু যখন সবাইকে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের আহ্বান জানান, সেই ডাকে সাড়া দিয়ে শুরু করেন ব্যবসা। বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মাতৃভূমির রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যেমন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তেমনি যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে দেশমাতৃকার অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য গভীর দেশপ্রেম নিয়ে তিলে তিলে গড়ে তুলেছিলেন তার শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো। শেষ বয়সে এসেও অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন তিনি। তার ‘অভিধানে’ ছিল না কোনো সাপ্তাহিক ছুটি। সাত দিনই অফিস করতেন দেশের অর্থনীতির এই উজ্জ্বল তারকা।

শিল্প খাতে একটি বিপ্লবের নাম নুরুল ইসলাম : দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিতে নুরুল ইসলাম একজন আধুনিক চিন্তার সাহসী উদ্যোক্তা। স্বাধীন বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প খাতের আলোচিত ও উজ্জ্বল মুখ তিনি। ১৯৭৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা গ্রুপ। কর্মজীবনে অসংখ্য বাধা এসেছে। সব বাধা উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন শিল্প খাতের এই আপসহীন উদ্যোক্তা। এমন কিছু প্রতিষ্ঠান গড়েছেন, যা দেশের মানুষ কখনও কল্পনাও করেনি।

এশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিং মল যমুনা ফিউচার পার্ক, যমুনা ইলেকট্রনিক্স, যমুনা ডিস্টিলারি, বস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স, ওভেন গার্মেন্টস, রাসায়নিক, চামড়া, বেভারেজ টয়লেট্রিজ, মোটরসাইকেল এবং আবাসন খাতসহ যে ব্যবসাতেই হাত দিয়েছেন, সেখানেই সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছেছেন এই কর্মবীর। যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্প ও সেবা খাতে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে। অন্যান্য শিল্পের পাশাপাশি দেশের গণমাধ্যমেও তিনি বিশাল বিনিয়োগ করেছেন। দুই দশক আগে প্রতিষ্ঠা করেন পাঠকপ্রিয় দৈনিক যুগান্তর। এ ছাড়া বিশ্বমানের বাংলাদেশি টেলিভিশন চ্যানেল তৈরি ছিল তার বিশাল এক স্বপ্ন। এরই অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন যমুনা টেলিভিশন।

নুরুল ইসলাম মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশ স্বাবলম্বী হবে, মাথা তুলে দাঁড়াবে। শুরু থেকেই তার আগ্রহের পুরোটাই ছিল ‘মেড ইন বাংলাদেশ’। তাই যমুনা ফ্যান, অ্যারোমেটিক সাবান এবং পেগাসাস কেডসের মতো জনপ্রিয় বাংলাদেশি ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন তিনি। শুধু গার্মেন্টস বা ডেনিম নয়, উৎপাদনে নানা বৈচিত্র্য এনেছিলেন দূরদর্শী এই মানুষটি। গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ফ্রিজ ও মোটরসাইকেলসহ নানা প্রয়োজনীয় সামগ্রী। পণ্যের মানের ব্যাপারে কখনও আপস করতেন না। সব সময় বলতেন, যে পণ্যই তিনি বানাবেন, সেটি হতে হবে ‘নাম্বার ওয়ান’। গুণগত মানের কারণে যিনি একবার ব্যবহার করবেন, তিনি পণ্যের সুনাম ছড়াবেন।

পরিচ্ছন্ন ব্যবসায়ী : ব্যক্তিগত জীবনে নুরুল ইসলাম ছিলেন একজন পরিচ্ছন্ন ব্যবসায়ী। তার সব অর্থ, মেধা ও পরিশ্রম দেশেই বিনিয়োগ করেছেন। খেলাপি ঋণ এবং বিদেশে টাকা পাচারের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার ছিলেন তিনি। মৃত্যুর আগপর্যন্ত কোনো ব্যাংকে তার এক টাকাও খেলাপি ঋণ ছিল না। বিদেশে টাকা পাচারের কোনো অভিযোগ নেই তার বিরুদ্ধে। এ কারণে তার মালিকানাধীন দুটি গণমাধ্যম-দৈনিক যুগান্তর ও যমুনা টিভি খেলাপি ঋণ ও টাকা পাচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সংবাদ প্রচার করছে।

 

ঘটনাপ্রবাহ : যমুনা গ্রুপ চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম