Logo
Logo
×

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

সরেজমিন প্রতিবেদন

রাজধানীতে উৎসবের আমেজে ভোট

Icon

যুগান্তর প্রতিবেদন

প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীতে উৎসবের আমেজে ভোট

সারা দেশের মতো রাজধানী ঢাকার আসনগুলোতেও উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। নির্ভয়ে-নির্বিঘ্নে ভোটাররা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। দিনের শুরুতে উপস্থিতি তুলনামূলক কম থাকলেও দুপুর গড়াতেই বাড়তে থাকে ভোটার। এ কারণে অনেক কেন্দ্রে দেখা যায় দীর্ঘ লাইন। তবে ঢাকা-৮ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগসহ কয়েকটি এলাকায় বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটেছে।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয় ভোটগ্রহণ, শেষ হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়। তবে ভোট উৎসব শুরু হয় ভোরের আলো ফোটার পরপরই। নগরীর বাসিন্দারা দিনের শুরুতেই নিজেদের ভোটকেন্দ্রের সামনে সমবেত হতে শুরু করেন। সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় পরিণত হয় দীর্ঘ সারিতে। নারী-পুরুষ, তরুণ-তরুণীসহ নানা বয়সি ভোটারদের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে ওঠে অধিকাংশ কেন্দ্র। অনেকে ভোট দেওয়ার পর কেন্দ্রের পাশে আড্ডাও দিয়েছেন। সবাই মিলে সেলফিও তুলছেন।

এবারের বহুলপ্রতীক্ষিত ভোটে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছে। ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা দুই হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এক হাজার ৭৫৫, স্বতন্ত্র ২৭৩ জন।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ : ঢাকা-৮ আসন প্রথম থেকেই নানা কারণে আলোচনায় ছিল। এই আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। বেলা ১২টার দিকে শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ ঘটনা ঘটে। পরে সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং পাটওয়ারীকে নিরাপদে বের করে আনেন। তবে হামলা নয়, দুপক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন শাহজাহানপুর থানা পুলিশ। এছাড়াও মির্জা আব্বাস মহিলা ডিগ্রি কলেজ ভোটকেন্দে পাটওয়ারীর শাপলা প্রতীকের এক পোলিং এজেন্টকে ভেতরে ঢুকতে বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়। সকাল ৭টার দিকে গোলাম মোস্তফা নামের ওই এজেন্ট কেন্দ্রে ঢুকতে গেলে তাকে বাধা দেওয়া হয়। পরে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে তিনি ভেতরে ঢুকতে পারেন।

সরেজমিন দেখা গেছে, বেলা ১২টার দিকে শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনি উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ পরিদর্শনে আসেন নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি স্কুলের ভেতরে ঢুকলে বিএনপির নেতাকর্মীরা পেছন থেকে ভুয়া ভুয়া বলে স্লোগান দেন। একপর্যায়ে তাকে ধাওয়া দিয়ে স্কুলের ভেতরে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ সময় এনসিপির কর্মীদের সঙ্গে বিএনপির কর্মীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে এসে তাকে উদ্ধার করে নিরাপদে বাইরে বের করে দেন।

তাসনিম জারার অভিযোগ : ঢাকা-৯ আসনে নানা কারণে আলোচনায় ছিলেন এনসিপি থেকে পদত্যাগকারী ডা. তাসনিম জারা। তিনি এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। তার পোলিং এজেন্টকে বিভিন্ন কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি বলেন, স্থানীয় ভোটার না হওয়ার কারণে আমার অনেক পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। এই আসনের বিএনপির প্রার্থী হাবিবুর রশিদ হাবিব সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বী তাসনিম জারার অভিযোগের ব্যাপারে কিছু পাননি।

জীবনে প্রথমবার ভোট দেওয়ার উচ্ছ্বাস : বেলা দেড়টার দিকে মিরপুর শেরেবাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। এটি ঢাকা-১৫ আসনের অন্যতম একটি বড় ভোট কেন্দ্র। এই কেন্দ্রে ভোট দেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন, সাব্বির, সাইফ আব্দুল্লাহ, আয়েশা ওয়াপি। তিনজনই নতুন ভোটার। প্রথমবার পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরে আনন্দিত তারা। আব্দুল্লাহ আল মামুন বললেন, জীবনে প্রথমবার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিয়েছি। নিজের ভোট নিজে দিতে পেরেছি, এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা।

ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন দলটির আমির ডা. শফিকুর রহমান। তাই এই আসনটিতে ছিল সবার বাড়তি নজর। সকাল সাড়ে ৮টায় মিরপুর-২ নম্বরে অবস্থিত মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে (বালক শাখা) জামায়াতের আমির নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এই আসনের আরেকটি কেন্দ্র মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজে ভোট শুরুর প্রথম দেড় ঘণ্টায় প্রায় ১০ শতাংশ ভোটার ভোট দেন। পুরুষ ভোটারদের এই কেন্দ্রে মোট ভোটার তিন হাজার ৪১৮ জন। এর মধ্যে সকাল ৯টা পর্যন্ত ৩৩৩ জন ভোট দেন।

মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দে ভোটাধিকার প্রয়োগ শেষে ইয়াসমিন নামের একজন ভোটার বলেন, এবারই তিনি প্রথম ভোট দেন। নির্বিঘ্নে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পেরেছি, এটা ভালো লেগেছে।

ভোট দিলেন ৯৩ বছর বয়সি বৃদ্ধা আনু বেগম : ঢাকা-৪ আসনের অন্যতম একটি ভোটকেন্দ্র ঢাকা আইডিয়াল স্কুলে ভোট দেন ৯৩ বছর বয়সি বৃদ্ধা আনু বেগম। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। হাতে-পায়ে তেমন শক্তি নেই। তবুও ছেলের বউয়ের হাত ধরে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেই ব্যালটে সিল মারলেন। গণভোটে রায়ও দিলেন। ভোটাধিকার প্রয়োগ সম্পর্কে জানতে চাইলে যুগান্তরকে তিনি বলেন, প্রতিটি নির্বাচনেই ভোট দিয়েছি। মনে হচ্ছে, এবারই জীবনের শেষ ভোট। এত সুন্দর পরিবেশে আগে কখনো নির্বাচন হয়নি। ভোট যে মার্কাই দেই, গণতন্ত্রের যেন বিজয় হয়।

তরুণদের উচ্ছ্বাস, কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভিড় : সকাল সাড়ে ৮টা থেকেই ঢাকা-১৮ আসনের ষোলহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়।

গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে কথা হয় আব্দুল হালিম নামের একজন ভোটারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ভোটের আগে নানা আতঙ্কের কথা শোনা গেলেও এবার অন্তত সুন্দর পরিবেশে ভোট হয়েছে। মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিয়েছে। কেন্দ্রের ভেতর কিংবা বাইরে কেউ কোনো প্রভাব বিস্তার করেনি। যদিও সকালে ভোটগ্রহণের ধীরগতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ঢাকা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী তানভীর আহমেদ (রবিন)।

এদিকে দুপুর ১২টার দিকে টিকাটুলির কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেন ঢাকা-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন। এ সময় তার সঙ্গে ছোট ভাই ইশফাক হোসেনকেও দেখা যায়। ভোটদান নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে ইশরাক হোসেন বলেন, নির্বাচনের পরিস্থিতি ভালোই মনে হয়েছে। ভোটার উপস্থিতি ভালোই। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী ড. আব্দুল মান্নান সকালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে গেন্ডারিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট দেন। তিনিও নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

উত্তরা ৮ নম্বর সেক্টরের মালেকাবানু আদর্শ বিদ্যানিকেতন কেন্দ্রে ১৯ বছর বয়সি সুমাইয়া আক্তার বলেন, প্রথম ভোট দিলাম। মনে হচ্ছে বড় হয়ে গেছি। একই কেন্দ্রে সদ্য এইচএসসি পাশ করা রাকিব হাসান জানান, সোশ্যাল মিডিয়ায় তর্ক দেখি। কিন্তু ভোট দিতে এসে বুঝলাম, এটা দায়িত্ব।

দুপুর ১২টায় উত্তরখান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কেন্দ্রে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তানজিলা বলেন, আমরা অনেক সময় রাজনীতিকে খারাপ বলি। কিন্তু ভোট না দিলে পরিবর্তন আসবে না।

ভোটের লাইনে নবজাতকসহ মা ও বয়স্কদের প্রাধান্যে স্বস্তি : দুপুর ১২টায় রাজধানীর মেরুল বাড্ডার সিরাজ মিয়া মেমোরিয়াল মডেল স্কুল ভোটকেন্দ্র দুই মাস বয়সি নবজাতককে কোলে নিয়ে ভোট দিতে লাইনে দাঁড়ান মা ফারজানা আক্তার সুমি। তিনি রামপুরা থেকে এসেছেন ভোট দিতে। কোলে নবজাতক বাচ্চা দেখে দ্রুত তার কাছে ছুটে যান সেখানে কর্তব্যরত একজন নারী আনসার সদস্য ও একজন স্বেচ্ছাসেবক। তারা বলেন, আপনাকে কষ্ট করে লাইনে দাঁড়াতে হবে না। তারপর সুমির হাতে থাকা ভোটার স্লিপ দেখে দ্বিতীয়তলার নির্ধারিত ভোট কেন্দ্র নিয়ে যান। এর মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে নিজের ভোট শেষে হাসিমুখে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসেন।

এদিকে চার মাস বয়সি শিশু হুমায়রাকে কোলে নিয়ে ভোটের লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন আরেক মা মাহমুদা আক্তার। তাকেও সিরিয়াল ছাড়াই ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। পরে মাহমুদা আক্তার যুগান্তরকে জানান, তিনি পরিবার নিয়ে উত্তর বাড্ডায় থাকেন। তার জীবনেও প্রথম ভোট এটি। তাই মিস করেননি।

ইসির অ্যাপস জটিলতায় শতাধিক ভোটার ভোট দিতে পারেনি : নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ‘স্মার্ট ইলেকশন অ্যাপ’ জটিলতার কারণে তেজগাঁও ভোটকেন্দ্রে শতাধিক ভোটার ভোট দিতে পারেনি বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচন কমিশনের অ্যাপ অনুযায়ী তাদের ভোটকেন্দ্র তেজগাঁও কলেজ এবং কেন্দ্র নম্বর ৮১। নির্ধারিত কেন্দ্রে গিয়ে তারা সেখানে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। কেননা নির্বাচন কমিশনের অ্যাপসের তথ্য অনুযায়ী ওই কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় ওই ভোটারদের নাম নেই। ঢাকা-১২ সংসদীয় আসনের কেন্দ্র তেজগাঁও কলেজে গিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

এ প্রসঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং অফিসার মো. রোহিনুর ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশনের ত্রুটি। অ্যাপসে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে তাদের কাছে সরবরাহ করা ভোটার নম্বরের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এমন সংখ্যা শতাধিক বলে মনে হয়েছে তার কাছে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম