গরমে নিত্যসঙ্গী এখন এসি
উপশহর ও গ্রামের ভোক্তাদের টার্গেট করে বিপণন কৌশল
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
শহর-বন্দর কিংবা গ্রাম-গ্রীষ্মের গরমে স্বস্তি পেতে এয়ারকন্ডিশন এখন মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। দাম হাতের নাগালে আসায় শহুরে বিলাসী জীবনের অনুষঙ্গ এসি এখন নিম্ন মধ্যবিত্তরা বাসা-বাড়িতে আর দশটা প্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক পণ্যের মতো ব্যবহার করছেন। বৈদ্যুতিক পাখার পরিবর্তে ঘরে ঘরে যুক্ত হচ্ছে এ যন্ত্র। এর কৃতিত্ব দেশীয় ইলেকট্রনিক্স পণ্য নির্মাতা কোম্পানিগুলোর। তারাই আমদানিনির্ভর বিলাসবহুল এ পণ্যটিকে সাশ্রয়ী মূল্যে ভোক্তার দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
দুই যুগ আগেও বাংলাদেশের এসির বাজার ছিল পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। শুরুতে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান থেকে বিদেশি ব্র্যান্ডের এসি আমদানি করা হতো। ২০০০ সালের পর থেকে অবস্থা বদলাতে থাকে। আমদানির সঙ্গে জড়িত অনেকে চীন থেকে নিজস্ব ব্র্যান্ডের এসি আমদানি শুরু করে। এরপর খুচরা যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজন শিল্প স্থাপন করেন। সরকার এ সময় নীতি সহায়তা দেওয়ায় দেশে ইলেকট্রনিক্স শিল্প বিকাশ লাভ করে। দেশে এখন এসি-ফ্রিজ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে যমুনা ইলেকট্রনিক্স, ওয়ালটন, ইলেক্ট্রো মার্ট, এলিট হাইটেক ইন্ড্রাস্ট্রিজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান। চাহিদা থাকায় ঢাকার আনাচে-কানাচে নন-ব্র্যান্ডের এসি সংযোজন কারখানাও গড়ে উঠেছে। এসব কারখানার এসি গুলিস্তানের বিভিন্ন মার্কেটসহ গ্রামাঞ্চলে বিক্রি হচ্ছে।
এসির ক্রমবর্ধমান বাজারের কারণে বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোও জয়েন্ট ভেঞ্চারে বাংলাদেশে শিল্প কারখানা স্থাপন করছে। দেশি ব্র্যান্ডগুলোকে টেক্কা দিতে ঘাঁটি গেড়েছে। একটা সময় পুরো ইউনিট ধরে রপ্তানি হলেও দেশীয় ব্র্যান্ডগুলোর মতো এখন তারা সংযোজন করছে। প্রযুক্তি ও উপাদানের দিক থেকে দেশি-বিদেশি ব্র্যান্ড সমানে সমান টেক্কা দিচ্ছে। বিদেশি ব্র্যান্ডগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে দেশীয় ব্র্যান্ডগুলো।
প্রতিবছর কী পরিমাণ এসি বিক্রি হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালে ৭ লাখ ইউনিট এসি বিক্রি হয়েছে বলে ধারণা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। যার ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দিয়েছে দেশি কোম্পানিগুলো। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। কারণ, ক্রমবর্ধমান তাপপ্রবাহ এবং জীবনযাত্রার মান পরিবর্তন। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর ২০-২৫ শতাংশ হারে বাড়ছে এসির বাজার। শহরের পরিবর্তে এখন উপশহর ও গ্রামকে টার্গেট করে বিপণন কৌশল সাজাচ্ছে তারা। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় এসি পৌঁছে দিতে দেশীয় ইলেকট্রনিক্স কোম্পানিগুলো উপজেলা পর্যায়ে নিজস্ব শো-রুম স্থাপন করছে। এর সঙ্গে ডিলারশিপ তো আছেই। আর সহজে এসি কিনতে কিস্তি, ইএমআই ও ব্যাংক ঋণ সুবিধা দিচ্ছে।
অবশ্য এসির বাজার নিয়ে উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, চাহিদা থাকায় এসির গ্রে মার্কেট দিন দিন বড় হচ্ছে। রাজধানীর আশপাশে ছোট ছোট সংযোজন কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব কারখানায় নন-ব্র্যান্ডের এসি তৈরি হচ্ছে। মূলত প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোক্তাদের টার্গেট করে এরা এসি বানায়। এসব এসি কিনে ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছেন। কেননা এসব প্রতিষ্ঠান বিক্রয়পরবর্তী সেবা দিতে পারে না। অন্যদিকে সরকার রাজস্বও পাচ্ছে না।
বর্তমানে বাজারে ইনভার্টার ও নন-ইনভার্টার-এ দুধরনের এসি বিক্রি হচ্ছে। এর মধ্যে ইনভার্টারের দাম কিছুটা বেশি। তবে এ ধরনের এসিতে বিদ্যুৎ খরচ কম। সাধারণ এসির তুলনায় ইনভার্টার এসি প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় করতে সক্ষম। সাধারণ এও ইনভার্টার এসির মূল পার্থক্য এর কম্প্রেসারের কার্যপদ্ধতিতে। সাধারণ এসি ঘর নির্দিষ্ট মাত্রায় ঠান্ডা করার পর কম্প্রেসারটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় এবং ঘরের তাপমাত্রা বাড়লে আবার পূর্ণ শক্তিতে চালু হয়। বারবার চালু এবং বন্ধ হওয়ার এ প্রক্রিয়ায় প্রচুর বিদ্যুৎ অপচয় হয়। অন্যদিকে ইনভার্টার এসি কখনোই পুরোপুরি বন্ধ হয় না। এটি ঘরের তাপমাত্রা অনুযায়ী নিজের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। যখন ঘর কাঙ্ক্ষিত তাপমাত্রায় পৌঁছায়, তখন কম্প্রেসারটি অত্যন্ত ধীরগতিতে চলতে থাকে। ফলে বারবার স্টার্ট নেওয়ার বাড়তি বিদ্যুৎ খরচ হয় না।
বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দেশে আবাসিক বাসা-বাড়িতে এক টন ও দেড় টন এসি বেশি ব্যবহৃত হয়। দুই টন এসিও ব্যবহৃত হয়, তবে সংখ্যা কম। ব্র্যান্ডভেদে এক টন নন-ইনভার্টার এসি ৩৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে ইন্সটলেশন সুবিধা দিচ্ছে কেউ কেউ। ইনভার্টার এসি বিক্রি হচ্ছে ৪২ হাজার টাকায়। দেড় টন নন-ইনভার্টার এসি ৪৮ হাজার টাকা, ইনভার্টার এসি ৫৫ হাজার টাকা এবং দুই টন নন-ইনভার্টার এসি ৬২ হাজার টাকা, ইনভার্টার এসি ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ব্র্যান্ড এও স্পেসিফিকেশন ভেদে এসির দামে তারতম্য রয়েছে।
