Logo
Logo
×

আনন্দ নগর

ঢালিউডের নতুন জাগরণ : বড় বাজেট প্রযুক্তি ও গল্প বলার পরিবর্তন

একসময় বাংলাদেশের সিনেমা মানেই ছিল সীমিত বাজেট, পরিচিত ফর্মুলা আর নির্দিষ্ট দর্শকগোষ্ঠী। কিন্তু গত এক দশকে দৃশ্যপট বদলেছে। ঢালিউড এখন নতুন এক জাগরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বড় বাজেটের বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং গল্প বলার ধরনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এ শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। দর্শকরাও বদলেছেন; তাদের রুচি, প্রত্যাশা এবং দেখার মাধ্যম-সবকিছুই এখন ভিন্ন। এ পরিবর্তনের ঢেউ সামাল দিতে গিয়েই ঢালিউডে শুরু হয়েছে নতুন অধ্যায়। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।

Icon

এফ আই দীপু

প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশি সিনেমায় বড় বাজেটের বিনিয়োগ একসময় বিরল ছিল। কালেভদ্রে দু-একবার দেখা যেত বিগ বাজেটের সিনেমা। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েকটি সিনেমা প্রমাণ করেছে, ভালো গল্প ও মানসম্মত নির্মাণে বিনিয়োগ করলে দর্শক সাড়া দেন। উদাহরণ হিসাবে ‘হাওয়া’র কথা বলা যায়। মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত এ চলচ্চিত্রটি শুধু ব্যবসায়িক সফলতাই পায়নি, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। সমুদ্রের প্রেক্ষাপটে নির্মিত এ সিনেমায় প্রযোজনার মান, সিনেমাটোগ্রাফি ও আবহসংগীত দর্শকদের নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। ‘প্রিয়তমা’ নামে একটি বিগ সিনেমাও দারুণ সাফল্য এনে দিয়েছেন প্রযোজনা সংস্থাকে। একইভাবে ‘পরাণ’ এবং ‘সুড়ঙ্গ’র মতো প্রজেক্ট বড় পরিসরে মুক্তি পেয়ে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক টানতে সক্ষম হয়েছে। এসব সিনেমায় তারকানির্ভরতার পাশাপাশি গল্প ও নির্মাণশৈলীতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযোজকরা এখন বুঝতে পারছেন, মানসম্মত কনটেন্টই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক। গত দুই বছরে বিগ বাজেটে নির্মিত হয়েছে ‘তুফান’, ‘রাজকুমার’, ‘দরদ’, ‘বরবাদ’, ‘জংলী’সহ আরও কিছু সিনেমা। এ সময়ে এসে আরও কিছু বড় বাজেটের সিনেমা নির্মিত হচ্ছে। নির্মাতা প্রযোজকদের বড় বাজেটের এ সাহসী পদক্ষেপ ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে নতুন জাগরণের পথে ধাবিত করছে।

* প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নতুন রূপ

প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ঢালিউডের এ জাগরণের অন্যতম চালিকাশক্তি। উন্নত ক্যামেরা, কালার গ্রেডিং, সাউন্ড ডিজাইন ও ভিএফএক্সের ব্যবহার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি পেশাদার। একসময় যে দৃশ্য তৈরি করতে বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন দেশেই তা সম্ভব হচ্ছে। ডিজিটাল সিনেমাটোগ্রাফি ও ডিআই (ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়েট) প্রযুক্তির কারণে ঢাকাই সিনেমার ভিজ্যুয়াল মান আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছেছে বলা যায়। অ্যাকশন দৃশ্যে স্টান্ট কোরিওগ্রাফি ও গ্রাফিক্সের ব্যবহার বেড়েছে। গত এক দশক ধরে সাউন্ড ডিজাইনে ডলবি অ্যাটমস প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছু সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, যা প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের নতুন অভিজ্ঞতা দিয়েছে। এ ছাড়া মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতির বিস্তারও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। উন্নত সাউন্ড সিস্টেম ও প্রজেকশন প্রযুক্তির কারণে দর্শক এখন সিনেমা হলে গিয়ে বিশ্বমানের অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন। ফলে হলমুখী দর্শকের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে। তবে দেশের দর্শক এবং চাহিদার তুলনায় মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা খুবই কম।

* গল্প বলার ধরনে পরিবর্তন

ঢালিউডের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গল্প বলার ধরনে। আগে যেখানে প্রেম, প্রতিশোধ বা পারিবারিক নাটক ছিল প্রধান বিষয়, এখন নির্মাতারা সমাজের নানা জটিল বাস্তবতা তুলে ধরছেন। থ্রিলার, মনস্তাত্ত্বিক ড্রামা, বায়োপিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের গল্প-সবই এখন দর্শকের সামনে আসছে। গত কয়েক বছরে একাধিক সিনেমা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হয়েছে তার ভিন্নধর্মী কাহিনির জন্য। অন্যদিকে ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ নামে একটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়ে দেশের সিনেমাকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে। এসব সিনেমা প্রমাণ করেছে গভীর ও সংবেদনশীল গল্পও দর্শক গ্রহণ করেন। অন্যদিকে চরিত্র নির্মাণেও এসেছে নতুনত্ব। নায়ক-নায়িকার প্রচলিত ছক ভেঙে এখন ধূসর চরিত্র, অ্যান্টি-হিরো বা শক্তিশালী নারী চরিত্র তুলনামূলক বেড়েছে। এসব চরিত্রের বাস্তবধর্মী সংলাপ ও ন্যাচারাল অ্যাক্টিং দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করছে।

* ওটিটির প্রভাব

ওটিটি প্ল্যাটফর্মের উত্থান ঢালিউডের এ পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। দেশীয় প্ল্যাটফর্মগুলো নতুন নির্মাতাদের সুযোগ দিচ্ছে এবং সাহসী গল্প বলার ক্ষেত্র তৈরি করছে। ওয়েব ফিল্ম ও সিরিজের মাধ্যমে নির্মাতারা পরীক্ষামূলক কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন, যা পরে বড় পর্দায়ও প্রভাব ফেলছে। এদিকে ওটিটি দর্শকদের রুচিতেও বৈচিত্র্য এনেছে। আন্তর্জাতিক কনটেন্টের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দেশীয় নির্মাতারা মান উন্নয়নে মনোযোগী হয়েছেন। ফলে সিনেমার চিত্রনাট্য, সম্পাদনা ও প্রযোজনায় এসেছে পেশাদারত্ব।

* নতুন প্রজন্মের নির্মাতা ও শিল্পী

ঢালিউডের নতুন জাগরণের পেছনে রয়েছে তরুণ নির্মাতা ও অভিনয়শিল্পীদের অবদান। তারা বিশ্বসিনেমা দেখছেন, নতুন প্রযুক্তি শিখছেন এবং সাহসী গল্প বলতে আগ্রহী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে দর্শকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে, যা ফিডব্যাক পেতে সাহায্য করছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের চরিত্র নির্বাচনে সচেতনতা। শুধু বাণিজ্যিক সাফল্যের কথা না ভেবে তারা চ্যালেঞ্জিং চরিত্রে কাজ করছেন। ফলে অভিনয়ের মানও উন্নত হচ্ছে। যদিও বড় বাজেটের সিনেমাগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, শুধু পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরাই কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।

* চ্যালেঞ্জও কম নয়

তবে এ জাগরণের পথ মসৃণ নয়। প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা এখনো সীমিত, পাইরেসি বড় সমস্যা এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি রয়ে গেছে। অনেক সময় বড় বাজেটের সিনেমা প্রত্যাশিত ব্যবসা করতে না পারলে প্রযোজকরা হতাশ হন। তা ছাড়া সেন্সর, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংবেদনশীলতা নিয়েও নির্মাতাদের ভাবতে হয়। তারপরও আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়ছে, বিদেশি দর্শকও আগ্রহ দেখাচ্ছেন। এতে করে যৌথ প্রযোজনার সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

* ভবিষ্যতের দিগন্ত

ঢালিউডের নতুন জাগরণ শুধু সাময়িক প্রবণতা নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বড় বাজেট, আধুনিক প্রযুক্তি ও শক্তিশালী গল্প-এ তিনের সমন্বয়ই পারে বাংলাদেশের সিনেমাকে বিশ্বমানের প্রতিযোগিতায় টিকিয়ে রাখতে। প্রয়োজন পরিকল্পিত বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ। দর্শক এখন মানসম্মত কনটেন্ট চান। তারা বিশ্বসিনেমা দেখেন, তুলনা করেন এবং ভালো কাজকে সমর্থন করেন। এই সচেতন দর্শকই ঢালিউডের সবচেয়ে বড় শক্তি। যদি নির্মাতারা এ আস্থার মর্যাদা রাখতে পারেন, তবে বাংলাদেশের সিনেমা শিল্প সামনে আরও উজ্জ্বল সময়ের সাক্ষী হবে। ঢালিউড আজ আর শুধু স্থানীয় বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক। নতুন জাগরণের এ সময়ে দাঁড়িয়ে বলা যায়, বাংলাদেশি সিনেমা তার নিজস্ব ভাষা ও স্বর খুঁজে পাচ্ছে। বড় বাজেটের সাহস, প্রযুক্তির আধুনিকতা এবং গল্প বলার বৈচিত্র্য মিলেই তৈরি হচ্ছে নতুন ঢালিউড, যা ভবিষ্যতের পথচলায় আরও দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম