মাল্টিপ্লেক্স বৃদ্ধিই হতে পারে দেশের প্রেক্ষাগৃহে দর্শক ফেরানোর অন্যতম হাতিয়ার
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সিনেমা হল ও বিনোদন শিল্প এক গভীর পরিবর্তনের মুখে আছে। অতীতের সোনালি সময় থেকে শুরু করে আজকের ডিজিটাল যুগ- এ দীর্ঘ সময় দর্শকের অভিজ্ঞতা বদলেছে, রুচি বদলেছে, সঙ্গে বদলেছে সিনেমা দেখার ধরনও। সেই পরিবর্তনের অন্যতম প্রতিফলন হলো মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি এবং অনেকের কাছে এখন এই মাল্টিপ্লেক্সই দর্শককে আবার সিনেমা হলে ফিরিয়ে আনতে পারে এমন এক আশার আলো। বিস্তারিত রয়েছে এ প্রতিবেদনে।
এফ আই দীপু
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বাধীনতাপূর্ব ও পরবর্তী বাংলাদেশে ৯০-এর দশকেও সিনেমা হল ছিল সামাজিক মিলনমেলার জায়গা। পরিবার, আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে সিনেমা দেখা একটি উৎসবের মতো অভিজ্ঞতা ছিল। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বেশকিছু অভিজাত ও সাধারণ সিনেমা হল ছিল, যেগুলোর সবই সিঙ্গেল স্ক্রিন। কিন্তু গত কয়েক দশকে সেই হলগুলোর সংখ্যা দ্রুত কমেছে। ১৯৯০-এর দশকে প্রায় ১,২০০ থেকে ১,৪০০ সিনেমা হল ছিল দেশজুড়ে। আজ ক্রমেই সেই সংখ্যা একেবারে কমে এসেছে, যার সংখ্যা মাত্র ৫০ থেকে ৭০। বিশেষত সিঙ্গেল-স্ক্রিন হলগুলো বছরেরর পর বছর ধরে লোকসান এবং কম দর্শকের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে বা আসে-যায় অবস্থায় রয়েছে। এ অবনমন করোনাকালীন আরও তীব্র হয়েছিল, যখন লকডাউনের কারণে দর্শক একেবারেই সিনেমা হলে যাওয়ার সুযোগ পায়নি। এরইমধ্যে নতুন করে এই শিল্পে আশার আলো জাগাচ্ছে মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতি। গত কয়েক বছর ধরে যেসব সিনেমা হিট বা ব্লকবাস্টার হচ্ছে, তার অধিকাংশ আয় এসেছে মাল্টিপ্লেক্স থিয়েটার থেকে।
* মাল্টিপ্লেক্স : নতুন বিনোদন কেন্দ্র
২০০২ সালে স্টার সিনেপ্লেক্স প্রথম মাল্টিপ্লেক্স হিসাবে বাংলাদেশে পথচলা শুরু করে। এটি তখন মাত্র ৫ কোটি (আনুমানিক) টাকার বিনিয়োগ থেকে শুরু হয়েছিল, আজ সেই বিনিয়োগ প্রায় ৬০ কোটি (আনুমানিক বাজারমূল্য) টাকার পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে, যা প্রায় ১২ গুণ বৃদ্ধি। বর্তমানে এটিই দেশের বড় মাল্টিপ্লেক্স চেইন। এর শাখা রয়েছে রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি, সীমান্ত সম্ভার, এসকেএস টাওয়ার (মহাখালী), সনি স্কয়ার, মিলিটারি মিউজিয়াম এবং বালি অর্কেড (চট্রগ্রাম), হাইটেক পার্ক (রাজশাহী)-এ। এ ছাড়া আরও শাখা ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে বগুড়া ও নারায়ণগঞ্জে। স্টার সিনেপ্লেক্সের পর রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি নিয়ে চালু হয় ‘ব্লকবাস্টার সিনেমাস’। সাতটি থ্রিডি স্ক্রিন নিয়ে এ মাল্টিপ্লেক্সটি চলছে মহাসমারোহে। এ ছাড়া রাজধানীর পুরান ঢাকায় আছে জয়-লায়ন্স সিনেমাস, ও নারায়ণগঞ্জে সিনেস্কোপ (যদিও ছোট আকারের, তবে এটি নারায়ণগঞ্জে একটি আধুনিক থিয়েটার হিসাবে পরিচিত)।
* দর্শকদের প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা
মাল্টিপ্লেক্সে সিনেমা দেখা মানে শুধু সিনেমা দেখাই নয়, সেটি এখন একটি দারুণ অভিজ্ঞতা। এখানে উন্নত সেটিং, আধুনিক ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম, আরামদায়ক সিট, ক্লিন লবি, একাধিক স্ক্রিন, থ্রিডি/লাইসেন্সড প্রযুক্তি, প্রিমিয়াম ফুড কনসেশন, অনলাইন টিকিটিং সুবিধা-এসব একসঙ্গে দর্শকদের সিনেমা দেখার এক ‘প্রিমিয়াম’ অভিজ্ঞতা দেয়। সব মিলিয়ে দর্শকদের কাছে এটি এখন আরও আকর্ষণীয়। মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে শুরুতে প্রতি সপ্তাহে শো-এর সংখ্যা কম থাকলেও, এখন বিভিন্ন সময় দর্শক এখানেই সিনেমা দেখতে ভিড় করছেন এবং ঈদের মতো উৎসবের সময়ে শো দ্রুত বুক হয়ে যাচ্ছে। দেখা গেছে, ঈদের সময় মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে দর্শক হলিউড এবং দেশীয় সিনেমার শোর জন্য লাইন ধরে দাঁড়াচ্ছেন। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো সময় হলিউড সিনেমার শো কমিয়ে কর্তৃপক্ষ দেশি সিনেমার স্ক্রিন সংখ্যা ও শো বাড়াচ্ছেন দর্শকের চাপ সামাল দিতে।
* মাল্টিপ্লেক্স বনাম সিঙ্গেল-স্ক্রিনের সংগ্রাম
মাল্টিপ্লেক্স যে দর্শক টানছে, তা পরিসংখ্যানেও পরিষ্কার। গত এক দশকে সিঙ্গল-স্ক্রিন হলের প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি বন্ধ হয়ে গেছে, যেখানে মাল্টিপ্লেক্স সংখ্যা বেড়েছে, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জে। সিঙ্গেল-স্ক্রিন হলগুলো এখন প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। কারণ এগুলো এখন আর আধুনিক প্রযুক্তি, কমফোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্রের মতো পরিবেশ দিতে পারছে না, ফলে দর্শক এসব সিনেমা হল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
* দর্শক ফেরানোর কৌশল : মাল্টিপ্লেক্সের ভূমিকা
ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, মাল্টিপ্লেক্স নিজেই দর্শক ফেরানোর এক বড় কৌশল। তবে এটিকে শুধু বাড়িয়ে দেওয়া নয়, আরও কর্মপন্থা ও কৌশল অবলম্বন করাই হবে দর্শক টানার চাবিকাঠি। এরমধ্যে রয়েছে-
► সঠিক মূল্যায়ন ও ফ্লেক্সিবল টিকিট দাম : মাল্টিপ্লেক্সের টিকিটের দাম সাধারণত সিঙ্গেল-স্ক্রিনের তুলনায় অনেক বেশি। ঢাকায় মাল্টিপ্লেক্সে টিকিট দাম প্রায় ৪০০ থেকে শুরু করে ১২০০ টাকা পর্যন্ত, যেখানে সিঙ্গেল-স্ক্রিনে টিকিট ছিল ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। এ পরিপ্রেক্ষিতে মাল্টিপ্লেক্সগুলো আরও বেশি আরও বেশি দর্শক টানার জন্য সম্ভাব্য কৌশল হিসাবে মর্নিং শো, স্টুডেন্ট ডিসকাউন্ট বা অফ-পিক সময়ের টিকিট কম দামে রাখতে পারেন।
► স্থানীয় কনটেন্টের বিকল্প শো : শুরুতে মাল্টিপ্লেক্সগুলো বিদেশি সিনেমাই বেশি প্রদর্শন করত। বিশেষ করে স্টার সিনেপ্লেক্সে দেশি সব তারকার সিনেমা প্রদর্শন করা হতো না। এফডিসিকেন্দ্রিক বাণিজ্যিক সিনেমার প্রতি তারা যথেষ্ট অবহেলা দেখিয়েছে। পরে দেশি সিনেমার জোয়ার আসলে তখন তারাও সেটার প্রতি আগ্রহী হয়। মূল কথা হচ্ছে স্থানীয় কনটেন্ট ও আন্তর্জাতিক, দুধরনের সিনেমা একসঙ্গে প্রদর্শন করলে দর্শক নিজের পছন্দ অনুযায়ী সিনেমা দেখার সুযোগ পাবেন। যদিও বর্তমানে দেশের প্রায় সবকটি মাল্টিপ্লেক্সেই এ পদ্ধতি চালু আছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত কয়েকটি ঈদে জনপ্রিয় বাংলা সিনেমা যেমন ‘পরাণ’, ‘হাওয়া’, ‘প্রিয়তমা’ ‘সুড়ঙ্গ’-এর মতো সিনেমাগুলো মাল্টিপ্লেক্সে দর্শক টেনে এনেছিল। যখন তারা এসব সিনেমার টিকিট পাননি, তখন সিনেমা হলে এসে অন্য কনটেন্ট দেখেছেন।
► জনসংযোগ ও কমিউনিটি ইভেন্ট : মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে শুধু সিনেমা নয়-থিমড ইভেন্ট, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, নতুন সিনেমার প্রিমিয়ারসহ নিজস্ব অনুষ্ঠান করা হলে দর্শক আরও বেশি আকৃষ্ট হবে। এ পদ্ধতিও ব্লকবাস্টার সিনেমাস এবং স্টার সিনেপ্লেক্স প্রায়ই অনুসরণ করে থাকে।
► প্রযুক্তিভিত্তিক উন্নয়ন : আইম্যাক্স বা ডলবি অ্যাটমসের মতো আধুনিক সাউন্ড ও প্রক্ষেপণ প্রযুক্তি হলে দর্শকদের সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হয়, ফলে ঘরে বসে ওটিটি দেখার সম্ভাবনা কমে যায়। বর্তামানে ব্লকবাস্টার সিনেমাসে সর্বাধুনিক ৫.১ ও ৭.১ ডলবি সারাউন্ড সাউন্ড সিস্টেম প্রযুক্তি বিদ্যমান।
* সিনেমা হলে দর্শকদের মন ফেরানো কী সম্ভব
দেশে মাল্টিপ্লেক্সের সংখ্যা বৃদ্ধি ও পরিবর্তিত দর্শক উপস্থিতি নতুন ধাঁচের সিনেমা হল তৈরির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তবে, সিঙ্গেল-স্ক্রিন বা ছোট শহরগুলোতেও মানুষ যদি আধুনিক প্রযুক্তিতে সিনেমা দেখার সুযোগ ও মানসম্মত পরিবেশ পায়, তাহলে সিনেমা হলে দর্শক ফেরার গতি আরও ত্বরান্বিত হবে। সর্বোপরি, মাল্টিপ্লেক্স প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ব্যবসায় নতুন কৌশল, প্রযুক্তি ও দর্শকসেবায় মনোনিবেশ করতে পারে, সেটাই বাংলাদেশের সিনেমা হলে দর্শক ফেরানোর অন্যতম বড় হাতিয়ার হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
