ইউটিউব শিল্পীদের জন্য আশীর্বাদ
আনন্দনগর প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একসময় বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পথ ছিল দীর্ঘ ও কঠিন। নতুন শিল্পীদের জন্য রেডিও, টেলিভিশন কিংবা বড় কোনো অডিও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া বিকল্প ছিল না। গান রেকর্ডিং, অ্যালবাম প্রকাশ, প্রচারণা-সবকিছুই নির্ভর করত প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের ওপর। কিন্তু প্রযুক্তির বিকাশ এবং ইউটিউবের বিস্তার সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে।
বর্তমানে একটি স্মার্টফোন, একটি ভালো গান এবং ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেই একজন শিল্পী নিজের সৃষ্টি বিশ্বের কোটি মানুষের সামনে তুলে ধরতে পারছেন। বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে গত এক দশকে যে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের উত্থান ঘটেছে, তাদের বড় একটি অংশের জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি ইউটিউব। বিশেষ করে ফোক, পপ, আধুনিক ও ব্যান্ডধারার গান সবচেয়ে বেশি দর্শক-শ্রোতা পেয়েছে এ প্ল্যাটফর্মে।
সংগীতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউটিউব শুধু একটি ভিডিও প্ল্যাটফর্ম নয়; এটি এখন একটি পূর্ণাঙ্গ মিউজিক মার্কেট। আগে যেখানে গান বিক্রি হতো ক্যাসেট, সিডি বা অডিও অ্যালবামের মাধ্যমে, এখন দর্শকসংখ্যা, সাবস্ক্রাইবার, স্ট্রিমিং এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপন আয়ের ওপর নির্ভর করছে শিল্পীর সাফল্য।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধির ফলে ইউটিউবভিত্তিক সংগীতের বাজারও প্রসারিত হয়েছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও এখন স্মার্টফোনের মাধ্যমে নতুন গান শোনা ও ভিডিও দেখার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে একজন শিল্পীর গান প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে ইউটিউবনির্ভর সংগীত তারকার প্রসঙ্গ উঠলে প্রথম সারিতেই আসে আরমান আলিফের নাম। ‘অপরাধী’ গানটি প্রকাশের পর তিনি রাতারাতি আলোচনায় চলে আসেন। প্রেম, অভিমান ও বিচ্ছেদের অনুভূতিকে কেন্দ্র করে তৈরি গানটি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। গানটির জনপ্রিয়তা এতটাই ছিল যে, এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ার হতে থাকে। ইউটিউবের ভিউ সংখ্যা দ্রুত বাড়তে বাড়তে কোটি ছাড়িয়ে যায়। সংগীত বিশ্লেষকদের মতে, ‘অপরাধী’ ছিল এমন একটি গান, যা দেখিয়েছে, একটি সফল ডিজিটাল হিট একজন অচেনা শিল্পীকেও জাতীয় পর্যায়ের তারকায় পরিণত করতে পারে। যদিও পরবর্তী সময়ে ‘অপরাধী’র ট্রেন্ড থেকে বের না হতে পেরে এখন অনেকটা হারিয়েই গেছেন এ সংগীতশিল্পী।
গগন সাকিব নামে আরও একজন শিল্পী জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে ইউটিউবের বড় ভূমিকা। ‘তোর মনের ভেতর আমি’, ‘বুক চিরে দেখ’সহ একাধিক গান তাকে তরুণদের প্রিয় কণ্ঠে পরিণত করেছে। তার গানের মূল শক্তি হলো সহজ ভাষা, আবেগপূর্ণ উপস্থাপন এবং সম্পর্কভিত্তিক গল্প। ডিজিটাল যুগের শ্রোতারা যে ধরনের অনুভূতির গান খোঁজেন, গগন সাকিব ঠিক সেই জায়গাটিই ধরতে পেরেছেন। ফলে ইউটিউবে তার গান নিয়মিত কোটি ভিউয়ের ঘর স্পর্শ করেছে।
দেশের তরুণদের হৃদয়ে আরও একজন শিল্পী ইউটিউবের কল্যাণে জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি সামজ ভাই। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বদৌলতে জনপ্রিয়তা পাওয়া শিল্পীদের অন্যতম তিনি। তার রোমান্টিক ও বিষণ্ন আবহের গান তরুণ শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষভাবে সমাদৃত। সংগীতবোদ্ধাদের মতে, ইউটিউবের যুগে শিল্পী ও শ্রোতার দূরত্ব অনেক কমে গেছে। সামজ ভাইয়ের জনপ্রিয়তা তারই উদাহরণ। শ্রোতারা সরাসরি তার গান শুনছেন, মন্তব্য করছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করছেন। এই সরাসরি যোগাযোগ জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তাসরিফ খান ইউটিউবের মাধ্যমে পরিচিতি পাওয়া শিল্পীদের মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী নাম। ব্যান্ড ‘কুঁড়েঘর’-এর ভোকাল হিসাবে ‘মায়া’ এবং ‘তোমায় নিয়ে’ গান দিয়ে তিনি শ্রোতাদের নজর কাড়েন। লোকজ সুর, আধুনিক সংগীতায়োজন এবং সহজ কথার মিশেলে তৈরি তার গানগুলো দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে সংগীতের বাইরে মানবিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা রেখে তিনি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। ফলে ইউটিউব-তারকা পরিচয়ের পাশাপাশি একজন সামাজিকভাবে সচেতন শিল্পী হিসাবেও তিনি পরিচিতি পেয়েছেন।
জিসান খান শুভও ইউটিউব প্রজন্মের সফল শিল্পীদের একজন। ‘ভুলিনি তোমায়’ এবং ‘মন মাঝে’ গানের মাধ্যমে তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো নিজস্ব সুর ও গায়কী। বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়াই তিনি নিজের শ্রোতাগোষ্ঠী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান সময়ের অনেক তরুণ শিল্পীর কাছে এটি একটি অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
ইউটিউব কেন নতুন শিল্পীদের জন্য আশীর্বাদ? বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউটিউব নতুন শিল্পীদের জন্য একাধিক বড় সুযোগ তৈরি করেছে। এ উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যে কেউ নিজের গান প্রকাশ করতে পারেন। কম খরচে প্রচার করতে পারেন অর্থাৎ টেলিভিশন বা প্রচলিত বিজ্ঞাপনের তুলনায় ব্যয় অনেক কম। এর মাধ্যমে দেশের বাইরে থাকা বাংলা ভাষাভাষী শ্রোতার কাছেও সহজে পৌঁছানো যায়। মন্তব্য ও শেয়ারের মাধ্যমে শ্রোতাদের সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানা যায়। সর্বোপরি বিজ্ঞাপন, স্পন্সরশিপ ও ডিজিটাল স্ট্রিমিং থেকে আয় করা সম্ভব।
তবে ইউটিউবনির্ভর জনপ্রিয়তার কিছু নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা, কপিরাইট জটিলতা, অ্যালগরিদমের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং মানের চেয়ে ট্রেন্ডকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। সংগীতসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়তে হলে শুধু ভাইরাল হওয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিয়মিত মানসম্মত কাজ এবং নিজস্ব শিল্পীসত্তার বিকাশ।
তবে এটা ঠিক, বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে ইউটিউব এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। এটি শুধু গান প্রকাশের মাধ্যম নয়; বরং নতুন শিল্পী আবিষ্কার, শ্রোতা তৈরি এবং সংগীত ব্যবসার নতুন মডেল গড়ে তোলার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।
