মৌলভীবাজার-৪ আসন
কোন ম্যাজিকে বিপুল ভোটে জয়ী মুজিব
সৈয়স সালাউদ্দিন, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার)
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মৌলভীবাজার-৪ (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ) আসন চা-বাগান শ্রমিক ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ভোটার এলাকায় এবারের নির্বাচনে কোন ম্যাজিকে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) এত ভোট পেয়ে বিজয়ী হলেন। এর নেপথ্যের কারণ খুঁজতে গিয়ে অনুসন্ধানে ওঠে আসে বিভিন্ন তথ্য। জানা যায়, ২০০১ সালে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে তিনি দুই উপজেলায় ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ করেন। এর মধ্যে প্রতিটি চা বাগানে চা শ্রমিক ও বাঙালি হিন্দুদের নাচঘর ও মন্দির নির্মাণ করে দেন। ঠিক একইভাবে মুসলিমদের মসজিদ, ঈদগাহ, মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজ, এতিমখানা নির্মাণ ও চিকিৎসা শিবিরের মাধ্যমে বিনামূল্যে ওষুধ প্রদান করে যান। এছাড়া বন্যা পুনর্বাসন বাঁধ নির্মাণসহ মানুষের সামাজিক কল্যাণে কাজ করে যান হাজী মুজিব ফাউন্ডশনের মাধ্যমে। এসব সামাজিক কর্মকাণ্ডে তিনি মানুষের মনের মণিকোঠায় চলে আসেন। ২০০৯ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় হাজী মুজিবের ওপর মামলা, হামলা ও নির্যাতন। শতাধিক মামলা হয় তার বিরুদ্ধে। এসব মামলায় তিনি প্রায় চার বছর জেল খাটেন। ঈদের দিন হাজী মুজিবকে ঈদের জামাতে অংশ না দিতে দেওয়া, ইফতার মাহফিলের খাবারে কেরোসিন ঢেলে দেওয়া, একরকম নিষিদ্ধ ছিল বিএনপির কার্যক্রম। এসব কারণে মানুষের সহানুভূতি পান হাজী মুজিব। ২০০১ সালের নির্বাচন থেকে ২০১৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ওই আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আ.লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী সাতবারের এমপি সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে পুলিশ রাতে নৌকায় সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরে রাখলেও সকালের এক ঘণ্টার সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনি প্রায় এক লাখ ভোট পান। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরা বলেন, ‘আমরা হাজী মুজিবকে আমাদের চা শ্রমিকের বন্ধু হিসাবে ভাবি। চা শ্রমিকের কল্যাণে আমরা তাকে অতীতেও ভোট দিয়েছি এবার দিয়েছি ঢালাওভাবে।’ রোববার শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন চা বাগান ঘুরে শ্রমিকদের সঙ্গে কথা হয়। ভাড়াউড়ার চা বাগানের নারী শ্রমিক মিনতি হাজরা বলেন, ‘হাজী মুজিব বহু বছর ধরে তাদের কাছে আসছেন। তাই এবার তাকে আমরা নিরাশ করিনি।’ তারা চান, তিনি সংসদে তাদের ন্যায্য অধিকারের কথা তুলে ধরবেন। এ ব্যাপারে বাঙালি হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা শহরের জয়নগর পাড়ার বাসিন্দা সুজিত রায় বলেন, ‘বিগত ১৭ বছর থেকে হাজী মুজিব জুলুমের শিকার হয়ে আসছেন। তার সততা, সরলতা আমাদের মুগ্ধ করেছে এবং হিন্দু কমিউনিটির প্রতি তার প্রদত্ত নিরাপত্তার কথা আমরা আমলে নিয়ে ধানের শীষে একচেটিয়া ভোট দেই এবারের নির্বাচনে।’ ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, দুই উপজেলায় ১৮টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভায় ধানের শীষ একচেটিয়া ভোট পায়। যেখানে মুসলিম ভোটের আধিক্য বেশি। অথচ সিলেট বিভাগের মধ্যে বহুল পরিচিত এ এলাকার মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত বরুনার পীর সাহেব বলে খ্যাত তার নাতি ও ১১ দলীয় জোটের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা শেখ নূরুল আলম হামিদী, বিএনপির আরেক বিদ্রোহী (বহিষ্কৃত) প্রার্থী সাবেক মেয়র শিল্পপতি মহসিন মিয়া মধু ও এনসিপির প্রীতম দাশ বিশাল ভোটের ব্যবধানে শোচনীয়ভাবে ধরাশায়ী হন হাজী মুজিবের সঙ্গে। প্রীতম দাসসহ আরও দুই প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। মুসলিমরাও একচেটিয়াভাবে ধানের শীষে ভোট দেন এবারের নির্বাচনে। যেহেতু আ.লীগ নেই এবারের নির্বাচনে তাই সবাই ভেবেছিলেন হয়তো আ.লীগ সমর্থিত ভোটাররা ভোট বর্জন করবেন। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে নির্বাচনের সময় দেখা যায় এর উলটো চিত্র। সব দল ও মতের মানুষ একাকার হয়ে যান হাজী মুজিবকে ভোট দিতে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা আ.লীগের এক প্রভাবশালী নেতা বলেন, নির্যাতিত ব্যক্তি হাজী মুজিব, মানবিক দায়বদ্ধতা ও এলাকার উন্নয়নের স্বার্থের কারণে এবার তিনি ও তার সমর্থিত বলয়ের সবাই ধানের শীষে ভোট দিয়েছেন। এছাড়া দুই উপজেলায় বিএনপির দলীয় নেতাকর্মীরা দল ঘোষিত ৯টি নাগরিক সুবিধা বিশেষ করে ফ্যামেলি কার্ড ও কৃষিকার্ডের সুবিধা সভা-সমাবেশে ফলাও করে প্রচার করেন। এতে সুবিধাবঞ্চিত ভোটারদের টনিকের মতো আকর্ষণ করে বলে স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। জেলা নির্বাচন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, এ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব) পেয়েছেন এক লাখ ৭০ হাজার ৮৭৭ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী শেখ নূরুল আলম হামিদী পেয়েছেন ৫০ হাজার ২০৪ ভোট। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন হাজী মুজিব। এটি সিলেট বিভাগের ১৯ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে বিএনপি প্রার্থী হাজী মুজিবের বিজয়ের রেকর্ড হয়েছে।
