আলোচনায় মব ভায়োলেন্স ও আক্রান্ত পুলিশ
সিরাজুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দেয়। নতুন সরকারের ১০০ দিনের মধ্যে দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্র, মাদক ও চাঁদাবাজিবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। তবে এই অভিযানে গিয়ে বারবার আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশ। ইমেজ পুনরুদ্ধার এবং বাহিনী রূপান্তরের চ্যালেঞ্জ নিয়ে তারা দায়িত্ব পালন করলেও বাড়ছে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ নানা অপরাধ। মাদকাসক্ত ও ছিনতাইকারীকে ধরতে গিয়ে র্যাব সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ছোট্ট শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও গলা কেটে হত্যার বিষয়টি এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। নানা নৃশংস ঘটনার পাশাপাশি মব ভায়োলেন্স এবং পুলিশ আক্রান্তের ঘটনাগুলো এ মুহূর্তে ব্যাপক আলোচনার বিষয়। এ বিষয়গুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মনস্তাত্ত্বিক সংকটে ফেলে দিয়েছে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জামিনে মুক্ত হওয়া কিছু শীর্ষ সন্ত্রাসীর অপতৎপরতা নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। হত্যাকাণ্ডসহ নানা অপরাধের মাধ্যমে তারা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে। রাজধানীর নিউমার্কেটে শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন হত্যাকাণ্ডের ঘটনা অন্যতম উদাহরণ। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিন মাসে (ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল) সারা দশে ৮৫৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর (১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২১ মে) ৭১টি রাজনৈতিক ঘটনায় খুন হয়েছেন ৭৫ জন। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল-তিন মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা রেকর্ড হয়েছে ৪ হাজার ৬৭৭টি। একই সময়ে পুলিশ আক্রান্তের ঘটনা ১৭৬টি।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং সরকার পরিবর্তনের পর দেশের পুলিশবাহিনী চরম সংকটে পড়েছিল। সেই বিপর্যয় কাটিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর করার চেষ্টা চালায় অন্তর্বর্তী সরকার। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও পুলিশ প্রশাসন সংস্কার ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি বা ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেছে। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অপরাধ ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরা এবং স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক ফাইনিং সিস্টেম চালু করেছে, যা অপরাধী শনাক্তকরণে গতি এনেছে।
১ মে থেকে সারা দেশে শুরু হয়েছে অপরাধবিরোধী বিশেষ অভিযান। এ অভিযানে ২৩ মে পর্যন্ত ২২২ জন অবৈধ অস্ত্রধারী, ৮ হাজার ৯৩০ জন চোরাকারবারি ও মাদক ব্যবসায়ী, ১ হাজার ৫৪২ জন ছিনতাইকারী-দস্যু-ডাকাত, ৬১৬ চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসীসহ ১২ হাজার ১৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সিলেটে আসামি ধরতে গিয়ে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে ইমন আচার্য নামের এক র্যাব সদস্য নিহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে জুয়া ও মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে স্থানীয় অপরাধীচক্রের ধারালো অস্ত্রের হামলায় চার পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। ঢাকার মোহাম্মদপুর এবং ধানমন্ডি এলাকায় মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীদের হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশ সদস্যরা। পল্লবীতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে ব্যাপক হামলার শিকার হন তারা। নাটোরের লালপুরে হামলা চালানো হয়েছে র্যাব সদস্যদের ওপর। নরসিংদীতে পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিগত ১৫ বছরে পুলিশের একটি অংশের অতি রাজনৈতিক ভূমিকার কারণে জনগণের একাংশের মধ্যে বাহিনীর প্রতি যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, তা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। নবগঠিত সরকার মানবিক রাষ্ট্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় জানালেও মাঠপর্যায়ে সেই বার্তা পৌঁছাতে সময় লাগছে। পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজিপি বলেন, পুলিশ যদি কঠোর প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেয়, তবে অনেক সময় তা মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে। আবার ব্যবস্থা না নিলে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে পড়ে। এ দ্বিধাদ্বন্দ্বই মাঠের পুলিশকে দুর্বল করছে।
পুলিশের একজন ডিআইজি জানান, বর্তমান ‘মব ভায়োলেন্স’ রাতারাতি তৈরি হয়নি। দেড় দশক ধরে বিচারব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের যে অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, এর ফলে সমাজে ‘নিজেই বিচার করার’ একটি বিপজ্জনক মানসিকতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশ প্রশাসন যে তীব্র সংকটে পড়েছিল, তা থেকে তারা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
নতুন সরকারের ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সফলতার বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২২ মে পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে পুলিশ ৪১৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৭ হাজার ১৪৮ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ উদ্ধার করেছে। এসব ঘটনায় ৩৬৫টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে ৫৩৯ জনকে।
