মানবাধিকার প্রশ্নে উলটো যাত্রা সরকারের
প্রণীত খসড়া আইনে পরিণত হলে কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হবে * সরকার নিয়ন্ত্রিত আমলানির্ভর কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে কমিশন
বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৬ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিপুল জনসমর্থনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও অজ্ঞাত কারণে মানবাধিকার প্রশ্নে অনেকটাই উলটোপথে হাঁটছে সরকার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তী সরকারের মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ পাশ না হওয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে সরকারের তরফে নতুন করে আইন প্রণয়নের ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে সম্প্রতি নতুন আইনের যে খসড়া তৈরি করা হয়েছে তাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অথচ মানবাধিকার সমুন্নত রাখার ব্যপারে নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপির সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণ-অভুত্থানের মুখে পতনের আগ পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বিএনপির বহু নেতাকর্মী দীর্ঘ সময় ধরে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হন। সরকারের আজ্ঞাবহ গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গুম ও খুনের শিকার হয়েছে অনেকে। এমনকি খোদ দলটির সদ্য প্রয়াত চেয়ারপারসনসহ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন থেকে রেহাই পাননি। অথচ সরকার গঠনের পর সেই বিএনপি এখন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন কার্যকর হতে দিচ্ছে না।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ বাতিলের পর বিএনপি সরকার এখন নতুন করে যে আইন করতে যাচ্ছে, তাতে কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হতে পারে। নতুন আইনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে কমিশনকে সরকার ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর ওপর নির্ভরশীল করা হচ্ছে। এতে করে কমিশনের স্বাধীনভাবে কাজের ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে প্রণীত খসড়ায় কমিশনকে স্বপ্রণোদিত হয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্তের এখতিয়ার দেওয়া হয়নি। এছাড়া গোয়েন্দা সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য আটকস্থল অনুসন্ধান, পরিদর্শন ও তদন্তের যে সুযোগ অধ্যাদেশে ছিল-তাও বাদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া কমিশনের মোট জনবলের ৩০ শতাংশ প্রেষণে নিয়োগ এবং চাকরিরত সরকারি কর্মকর্তাকে ছুটিতে কমিশনার হিসাবে নিয়োগের সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে। এতে কমিশনের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক কমিশনার ড. নাবিলা ইদ্রিস সোমবার যুগান্তরকে বলেন, বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বৈশ্বিক মান অর্জন করতে হলে কিছু শর্ত প্রতিপালন করতে হয়। এর মধ্যে একেবারেই প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে মানবাধিকার কমিশনের ওপর সরকারের নির্বাহী বিভাগের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকতে পারবে না। কারণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকলে কমিশনের পক্ষে স্বাধীনভাবে কাজ করা সম্ভব নয়। এখন নতুন খসড়ায় যা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, কমিশন ফের আওয়ামী লীগের সেই আগের অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে।
সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর এক বিবৃতিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশে মানবাধিকার কমিশনকে গুম, খুনসহ যে কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ করার সুযোগও ছিল। কিন্তু নতুন খসড়া আইনে ২০০৯ সালের আইনের ১৮ ধারা পুনর্বহালের মাধ্যমে সেই ক্ষমতা সীমিত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন খসড়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কমিশনকে সরকার বা বাহিনীপ্রধানের প্রতিবেদনের ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে। অথচ পুরো ফ্যাসিস্ট আমলজুড়ে গুম-খুনসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। ফলে বর্তমান খসড়ায় ওই বিধান বহাল থাকলে তা অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে এ সংক্রান্ত খসড়া সংসদে ওঠার আগ পর্যন্ত চুড়ান্ত কোনো মন্তব্য করতে রাজি নন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। সোমবার তিনি যুগান্তরকে বলেন, এটি যেহেতু এখনো খসড়া পর্যায়ে আছে। তাই সংসদে ওঠার পর বিরোধী দলের কী ধরনের প্রতিক্রিয়া আসে সেটি দেখতে হবে। হয়তো খসড়াটি আরও সংশোধিত হতে পারে। তবে তেমন কিছু যদি না হয় তখন হয়তো এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যাবে।
