Logo
Logo
×
   

ক্যাম্পাস তারুণ্য

ফিরে দেখা

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান: এক সংগ্রামী ক্যানভাস

Icon

শরীফুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই এলেই মনে জেগে ওঠে এক অগ্নিঝরা সময়ের প্রতিচ্ছবি। যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা ও গবেষণার কেন্দ্র হয়ে থাকেনি, হয়ে উঠেছিল গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা আর প্রতিবাদের এক জীবন্ত ক্যানভাস। ২০২৪ সালের সেই উত্তাল জুলাইয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় জ্বলে উঠেছিল এক অনন্য দীপ্তিতে। সর্বত্র দানা বাঁধছিল দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ, যা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়েছিল ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী-সবার মাঝে। সেই দিনগুলো ছিল না শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখে বাঁধা কোনো সময়; ছিল এক জীবন্ত অভ্যুত্থান, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে তৈরি হচ্ছিল নতুন ইতিহাস।

৭ জুলাই ২০২৪। দিনটি আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। সেদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিদ্রোহী শিক্ষার্থীরা প্রথমবারের মতো একত্রিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ক্লাসের রুটিন কিংবা পরীক্ষার প্রস্তুতির চেয়ে সেদিনের ক্যাম্পাস বেশি মুখর ছিল প্রতিবাদের জোরালো স্লোগানে। ক্যাম্পাসের ক্যান্টিন থেকে লাইব্রেরি, খেলার মাঠ থেকে আবাসিক হল-সবখানেই একটাই আলোচনা : কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা যায়, কীভাবে জোরালো করা যায় গণআবেগের কণ্ঠস্বর। শিক্ষার্থীদের হাতে ছিল ব্যানার, মুখে ছিল স্লোগান, চোখে ছিল আগামীর দৃশ্যপট। ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক’-এই স্লোগানগুলো শুধু মিছিলের আওয়াজ ছিল না, ছিল ভেতর থেকে উঠে আসা তীব্র এক মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। আর এ আন্দোলনে কিছু শিক্ষকও নেমে এসেছিলেন অভিভাবকের ভূমিকায়; পাশে দাঁড়িয়েছেন, অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, সাহস জুগিয়েছেন।

১০ জুলাই ২০২৪। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে দিয়েছিল, তা যেন একটি বিস্মরণীয় ঘটনার চেয়েও বেশিকিছু। একটি প্রতীকী ভাষা, যা বুঝিয়ে দিয়েছিল যে শিক্ষার্থীরা আর থেমে থাকবে না। সেদিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাসের সুবিধা না থাকলেও, হেঁটে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল শতশত ছাত্রছাত্রী। মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল আগুনঝরা স্লোগান, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দেব রক্ত’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে।’ ১৭ জুলাই রাতে প্রশাসনের এক ঘোষণায় আবাসিক হলগুলো হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও আশ্রয়ের আশাটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও থামেনি আন্দোলন। কেউ আশপাশের মেসে, কেউ পরিচিতদের বাসায় থেকে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন। দিনের বেলায় ময়মনসিংহ শহরে মিছিল-মিটিং, রাতে গোপনে মেসে ফিরে যাওয়া-সেই দিনগুলো ছিল সাহস ও সংগ্রামের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

মেসগুলোয়ও চলেছে তল্লাশি, হয়েছে ভয়ভীতি প্রদর্শন। তবুও কেউ পিছিয়ে যাননি। কেউ গেছেন নিজ এলাকায়, কেউ থেকেছেন শহরে-কিন্তু যে যেখানে ছিলেন, আন্দোলনের সুরেই গেয়েছেন একতা ও প্রতিবাদের গান। এ আন্দোলনে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, বরং হয়ে উঠেছিল অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক অটল দুর্গ। আজও যখন জুলাই আসে, সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই মুখগুলো-যারা ক্লান্তি, ভয়, প্রতিহিংসার ভয়াল ছায়া উপেক্ষা করে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিল মুক্তির সংগ্রামে। সেই ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাত্মতা ছিল এ অভ্যুত্থানের আসল শক্তি। তারা প্রমাণ করে দিয়েছিল-একটি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু বইপত্রের আলোতেই আলোকিত হয় না, বরং ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসিকতায়ও হয় দীপ্ত।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলনের নাম নয়, এটি আমাদের তারুণ্যের শপথ, প্রতিবাদের প্রতিজ্ঞা এবং একটি নতুন সম্ভাবনার সূচনা। নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় সেই সময়টায় যা করেছে, তা ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে; প্রতিবাদের, স্বপ্নের এবং সাহসিকতার এক অনন্য ক্যানভাস হিসাবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .