Logo
Logo
×

নগর-মহানগর

গাছ আলু চাষে বদলে যাচ্ছে টানাপোড়েনের জীবন

রপ্তানির স্বপ্নের হাতছানি

Icon

এটিএম নিজাম, কিশোরগঞ্জ

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গাছ আলু চাষে বদলে যাচ্ছে টানাপোড়েনের জীবন

কিশোরগঞ্জে গাছ আলু চাষে কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে। বদলে যাচ্ছে টানাপোড়েনের জীবন। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে এবার তাদের সামনে দেশ-বিদেশে রপ্তানির স্বপ্নের হাতছানি। কম খরচে উৎপাদন করে অধিক মূল্যে বিক্রি করে লাভবান হওয়ার কারণে দিন দিন কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে গাছ আলু চাষের আগ্রহ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গাছ আলু চাষে এগিয়ে রয়েছে কিশোরগঞ্জের ব্রহ্মপুত্র নদতীরবর্তী পাকুন্দিয়া উপজেলা। শুধু এ উপজেলায়ই চলতি মৌসুমে ৩ হাজার বিঘা জমিতে গাছ আলুর আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০০ টন। কৃষকের মধ্যে নতুন করে স্বপ্ন জাগানিয়া এ ফসল স্থানীয় কৃষকের জীবনমান উন্নত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেরও বড় উৎস হয়ে দাঁড়াতে পারে। পাকুন্দিয়ায় উপজেলার কৃষকদের জীবনে গাছ আলু চাষ এখন বিশেষ করে জায়গা করে নিয়েছে। এ আলু চাষের আয়ের অর্থ পালটে দিচ্ছে তাদের টানাপোড়েনের জীবন। এ উপজেলায় মাটির নিচের গোল আলুরও ব্যাপক চাষের খ্যাতি দীর্ঘদিনের। তবে গাছ আলু সাধারণ গোল আলুর মতো মাটির নিচে চাষ হয় না। মাটিতে মাচা তৈরি করে তার ওপর অথবা গাছে গাছে উৎপাদন হয় এ আলু। মাচার ওপর এবং গাছে গাছে থরে থরে ঝুলে থাকে এই আলু। এর পাতা দেখতে অনেকটা পানের মতো দেখা যাওয়ার কারণে কেউ একে পান আলু আর কেউ বা গাছ আলু বলে ডাকে। কয়েক বছর আগেও যেখানে এ ফসলটি পরীক্ষামূলকভাবে সীমিত পর্যায়ে চাষ হতো। কিন্তু ব্যাপক চাহিদা এবং লাভজনক জনপ্রিয় ফসল হওয়ার কারণে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে কৃষকের স্বপ্ন পূরণের ঠিকানা হয়ে উঠেছে। দিন দিন ব্যাপক বিস্তৃতি পাচ্ছে গাছ আলু চাষের।

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের চর থেকে জেগে ওঠা পাকুন্দিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এখন চোখে পড়ছে গাছ আলুর মাচার সবুজ সারি। মাচায় মাচায় ঝুলছে কৃষকের স্বপ্নের ফসল গাছ আলু। চিচিঙ্গা, করলা ইত্যাদি ফসল তোলার পর একই মাচায় গাছ আলুর চারা রোপণ করা হয়। মাত্র তিন থেকে চার মাসের মধ্যেই মেলে আশাতীত ফলন। গাছ আলু চাষে খরচ অনেক কম। সার বা কীটনাশকেরও তেমন প্রয়োজন হয় না।

পাকুন্দিয়া উপজেলার চর ফরাদী ইউনিয়নের মালুয়ার চর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদেরের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘এক বিঘা জমিতে আমার খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। আলু বিক্রি করে পেয়েছি এক লাখ টাকার মতো।’ অপর কৃষক রহিম মিয়া বলেন, ‘বর্ষার শেষে বাজারে যখন সবজির সরবরাহ কম থাকে, তখন পাই গাছ আলুর ফলন। বাজারে প্রচুর চাহিদা থাকে, তাই দামেরও কমতি নেই। এখন কেজিপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি করছি।’

বর্তমানে সাধারণ আলু যেখানে কেজিপ্রতি ২৫ টাকা বিক্রি হচ্ছে, সেখানে গাছ আলুর দাম প্রায় দেড়গুণ বেশি। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা খরচ করে এক মৌসুমে লাখ টাকার মুনাফা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে। এ অতিরিক্ত লাভের কারণেই কৃষকরা গাছ আলু আবাদে ঝুঁকছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের চররফরাদী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, ‘গাছ আলু এ এলাকার কৃষকদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত করেছে। খুব অল্প খরচে ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে, আবার বাজারেও এর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। আমরা নিয়মিত কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি যেন তারা সঠিক সময়ে চারা রোপণ করে এবং মাচার যত্ন নেয়। এ ফসল শুধু কৃষকের আয় বাড়াবে না, বরং পাকুন্দিয়াকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের জন্যও একটি আদর্শ মডেল হিসাবে গড়ে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে কৃষকের জীবনমান আরও উন্নত হবে।’

কিশোরগঞ্জের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (খামারবাড়ি) উপপরিচালক ড. সাদেকুর রহমান বলেন, ‘গাছ আলু একটি পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু সবজি। বর্ষার শেষে অন্য ফসল না থাকলেও এটি ভালো ফলন দেয়। আমরা ইতোমধ্যেই কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় এর আবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছি। যেহেতু এটি দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য, তাই বিদেশেও রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে।’

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম