রাজশাহী-৪ আসন
বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে বিএনপি প্রার্থী জিয়ার পরাজয়
তানজিমুল হক, রাজশাহী
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপির দুর্গ হিসাবে পরিচিত রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে এবার হানা দিয়েছে জামায়াত। বিএনপির প্রার্থী ডিএম জিয়াউর রহমান জিয়াকে পরাজিত করে আসন দখলে নিয়েছেন জামায়াত প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী। বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, মনোনয়ন ত্রুটি এবং জিয়ার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ইমেজ সংকটের কারণেই তার পরাজয় ঘটেছে। পাশাপাশি প্রচারের সময় জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে লাগামহীন বেফাঁস ও কাণ্ডজ্ঞানহীন মন্তব্যে ধরাশয়ী হয়েছেন জিয়া।
পরাজয়ের পর স্থানীয় বিএনপির আলোচনায় বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই ডিএম জিয়ার কর্মকাণ্ড নিয়ে শুরু হয় চরম বিতর্ক। জমি ও পুকুর দখল, মামলা বাণিজ্য, পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত ও হেনস্তা, আপন ভাইকে নিয়ে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী গঠন, বিএনপি ও ছাত্রদলের বহিষ্কৃতদের নিয়ে চলাফেরা, নিজ দলের নেতাকর্মীদের নির্যাতনসহ নানা কারণে তিনি গ্রহণযোগ্যতা হারান। এ কারণে নেতাকর্মীরা জিয়াকে মেনে নিতে পারেননি।
বিএনপির হাইকমান্ড প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পর আরও বেপয়োরা হয়ে ওঠেন জিয়া ও তার অনুসারীরা। জিয়ার মনোনয়নে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা মিষ্টি বিতরণ করেন। জিয়াকে নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন বিএনপির নেতাকর্মীরা। মনোনয়ন পাওয়ার পরেও নির্বাচনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারেননি। মেটাতে পারেননি তাদের সঙ্গে মানসিক দূরত্ব।
নেতাকর্মীরা বলছেন, নির্বাচনের সময় দলের স্বচ্ছ, ত্যাগী এবং পরীক্ষিতদের বাদ দিয়ে জিয়া তার বাহিনীর সদস্য এবং অনুসারীদের প্রায়োরিটি দিয়েছেন। এ বাহিনীর হাতে নির্যাতিত নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি। বিশেষ করে সাধারণ ভোটাররা মনে করেছেন, জিয়া বিজয়ী হলে আরও ভয়ংকর হয়ে উঠবেন। বরং জামায়াত প্রার্থী বিজয়ী হলেই তারা নিরাপদে থাকবেন। এ কারণে জিয়ার পরাজয় ঘটেছে। এদিকে জিয়ার পরাজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে উঠেছে সমালোচনার ঝড়। স্থানীয় একজন যুবদল নেতা ফেসবুকে লিখেছেন, ‘তারা (জিয়া ও তার অনুসারীরা) যে অন্যের ওপর দোষ চাপাচ্ছে, তাদের মনে রাখা উচিত ৫ আগস্টের পর যে পরিমাণ চাঁদাবাজি, মামলা বাণিজ্য, বিল ও পুকুর দখল করেছেন-তারপরও মানুষ প্রতীক দেখে এই পরিমাণ ভোট দিয়েছেন, এটাই অনেক। তার যে অঙ্গভঙ্গি ও কথাবার্তা-আসলে তার মতো লোক এই পদ কীভাবে ডিজার্ভ (আশা) করেন? জনগণ তাকে লাল কার্ড দেখিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে তার আশপাশের চাঁদাবাজ, চিটার, বাটপারদেরও লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছে।’ ৩ নভেম্বর প্রাথমিক মনোনয়ন ঘোষণার পরেই ১৮ নভেম্বর জিয়ার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বাগমারা উপজেলা ও এলাকার দুই পৌর বিএনপির ৩৭ পদধারী বিএনপি নেতা দলের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগনামায় স্বাক্ষরকারী উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর গাফ্ফার মাস্টার সে সময় যুগান্তরকে বলেছিলেন, ‘বাগমারাকে এক সময় রক্তাক্ত জনপদ বলা হতো। বাগমারার মানুষ অতীতে বিভিন্ন সময়ে নৃশংস সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন। দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে তার সন্ত্রাসী বাহিনীর নৃশংসতার শিকার হচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরাও। এই প্রার্থীর কারণে আমরা সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চাইতে পারছি না।’
বাগমারা উপজেলা বিএনপির আরেকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে নেতাকর্মীরা জিয়ার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। নির্বাচনি প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে জিয়া তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে লাগামহীন বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজও (অঙ্গভঙ্গি) ছিল অশোভনীয়। অন্যদিকে তার প্রতিপক্ষ জামায়াত প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী বাগমারায় একজন সমাজসেবক হিসাবে পরিচিত। তিনি চিকিৎসক হিসাবে দীর্ঘদিন থেকে মানুষের সেবা করছেন। তার রয়েছে ক্লিন ইমেজ এবং গ্রহণযোগ্যতা। ফলে জিয়া সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা হারান। অনিবার্যভাবেই তার পরাজয় নিশ্চিত হয়ে ওঠে। নির্বাচনে পরাজয় এবং দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ সম্পর্কে বক্তব্যের জন্য জিয়াকে ফোন করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি। তবে তার অন্যতম সহযোগী এবং প্রধান নির্বাচনি এজেন্ট বাগমারা উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব শামসুজ্জোহা সরকার বাদশা বলেন, দলীয় নেতারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। জিয়ার সঙ্গে কিছু নেতাকর্মীর হয়তো সামান্য মানসিক দূরত্ব ছিল। তিনি তাদের কাছে গেছেন। কিন্তু দলের নেতারা আন্তরিক ছিলেন না। এ কারণে ধানের শীষের প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে।
