খুলনা-২ আসন
মঞ্জুর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে কপাল খুলেছে জামায়াতের
আহমদ মুসা রঞ্জু, খুলনা
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিএনপির ‘অভেদ্য দুর্গ’ হিসাবে পরিচিত খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সমীকরণ এবার ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী চারটি সংসদ নির্বাচনে যেখানে টানা জয় পেয়েছিলেন বিএনপির প্রার্থীরা, সেখানে এবার বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মাঠের রাজনীতিতে তিন দশকের বেশি সময় সক্রিয় সাবেক সংসদ-সদস্য ও বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে অল্প ব্যবধানে পরাজিত করে জয় পেয়েছেন জামায়াতের খুলনা মহানগর সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও খোদ বিএনপির নেতাকর্মীদের মতে, এই পরাজয়ের পেছনে মূলত কাজ করেছে মঞ্জুর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং দলের দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে খুলনা-২ আসন ছিল বিএনপির দখলে। এমনকি ২০০৮ সালের রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও এই আসনে জয়ী হয়েছিলেন মঞ্জু। আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের সময়েও মঞ্জু ছিলেন একেবারে ওয়ান ম্যান আর্মির মতো। সব মিলিয়ে জনপ্রিয়তায় তিনি ছিলেন অন্য সব আসনের থেকে আলাদা। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ছিল না। ফলে মঞ্জু এবং তার বলয়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে একধরনের আত্মতৃপ্তি ও অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছিল বলে মনে করছেন তৃণমূল নেতারা। যে কারণে প্রার্থী ঘোষণার পরও প্রথমদিকে তাকে সেভাবে নির্বাচনি কার্যক্রম চালাতে দেখা যায়নি।
টুটপাড়ার বাসিন্দা মনোয়ার হোসেন বলেন, প্রার্থী ঘোষণার পরও মঞ্জু ভাইকে প্রথম পর্যায়ে মাঠে দেখা যায়নি। নির্দিষ্ট কার্যক্রমের বাইরে নেতাকর্মীদের ডোর টু ডোর ওয়ার্ক করতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী হেলাল ছিলেন মাঠে-ময়দানে সক্রিয়। তাই রেজাল্ট যা হওয়ার তা-ই হয়েছে।
জামায়াত প্রার্থী শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল ছিলেন পরিকল্পিত ও কৌশলী। দলের কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচার চালিয়েছে, বিশেষ করে নারী ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে তাদের ছিল বিশেষ উদ্যোগ। বিএনপির প্রচারণা যেখানে প্রধানত মূল সড়ক ও বাজারকেন্দ্রিক ছিল, জামায়াত সেখানে অলিগলি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল।
এছাড়াও বিএনপির পরাজয়ের অন্যতম বড় কারণ হিসাবে উঠে এসেছে দলীয় গ্রুপিং। ২০২১ সালে খুলনা মহানগর বিএনপির কমিটি ভেঙে দেওয়ার পর থেকেই মঞ্জুর সঙ্গে বর্তমান নেতৃত্বের দূরত্ব তৈরি হয়। মহানগর, থানা ও ওয়ার্ড কমিটি থেকে মঞ্জু অনুসারীদের বাদ দেওয়া নিয়ে যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল, তা নির্বাচনের সময়েও শুকায়নি। বর্তমান কমিটির অনেক নেতাই তার পক্ষে মাঠে নামেননি। নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্যের ছবি দেখা গেলেও বাস্তবে সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল প্রকট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিএনপি নেতা বলেন, আমরা ধানের শীষের জন্য কাজ করেছি; কিন্তু প্রার্থীর নিজের বলয় আমাদের সেভাবে মূল্যায়ন করেনি। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক সেকেন্দার আলী খান সাচ্চু কোন্দলের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, কোন্দলের জন্য প্রভাব পড়েছে বেশি। নির্বাচনের আগে আমরা দুই অংশ এক হলেও সবাই সেভাবে কাজ করেনি।
বিএনপির গ্রুপিং-কোন্দলের মধ্যেই মাঠ গুছিয়ে নিয়েছে জামায়াত। ১৯৯৬ সালের পর দীর্ঘ সময় এই আসনে প্রার্থী না দিলেও এবার পরিকল্পিতভাবে মাঠে নামে জামায়াত। দলের কর্মী জিকু আলম জানান, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বিষয়টি আমাদের মাথায় ছিল। ভোটাররা বিএনপির ওপর আস্থা রাখলেও তাদের বিশৃঙ্খলার সুযোগ আমরা কাজে লাগিয়েছি।
ছোট ছোট ইউনিটে ভাগ হয়ে পাড়া-মহল্লাভিত্তিক কাজ, ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করাই ছিল জামায়াতের মূল কৌশল। খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, এ আসনে এবার তুলনামূলক ভোট কম পড়েছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতা ভোটের ফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, এখনো বুঝে উঠতে পারছি না কেন হারলাম। হিসাব মিলছে না। বিষয়টি নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করছি।
