সুষ্ঠু ভোটে স্বস্তি
চট্টগ্রামে ‘মব সন্ত্রাস’ ও ‘মামলা বাণিজ্য’ থেকে মুক্তির প্রত্যাশা
এম এ কাউসার, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে বৃহস্পতিবার উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছিল চট্টগ্রাম। ভোটের ফল কি হচ্ছে তা নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত নগরীর অলিগলি ও পাড়া-মহল্লা ছিল সরব। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি সরকার গঠন করছে, রাতের মধ্যেই এ তথ্য পেয়েছে সাধারণ ভোটাররা। শুক্রবার সকালে বেসরকারি ঘোষণা পাওয়ায় এলাকায় এলাকায় সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। তবে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা থাকায় কোথাও আনন্দ মিছিল দেখা যায়নি। সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা, বিএনপি সরকার ‘মব সন্ত্রাস’ ও ‘মামলা-বাণিজ্য’ কঠিন হস্তে দমন করতে সক্ষম হবে। অপরদিকে সব মব ভায়োলেন্সের বিচার দাবি করেছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, বিএনপির ইশতেহার যেন ‘কাজির গরু’ না হয়। প্রথমেই যেন দুর্নীতি প্রতিরোধে জোর দেওয়া হয়। শুক্রবার শ্রমজীবী, পেশাজীবী, সাধারণ ভোটার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলে এসব কথা জানা গেছে।
সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তারা ব্যক্তি স্বার্থ, পারিবারিক, ব্যবসায়িক ও পূর্ব শত্রুতা হাসিলে ব্যস্ত ছিল। রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়েও চলেছে এমন অরাজকতা। বৈষম্যবিরোধী মামলাসহ মিথ্যা মামলা দিয়ে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে ফাঁসানোর ঘটনা ঘটেছে। জিম্মি করে আদায় করা হয়েছে টাকা। দখল করা হয়েছে মানুষের জায়গা-জমি ও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান। বাদ যায়নি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও। খুনোখুনি ও রক্তপাতের ঘটনাও কম ঘটেনি। আর এসব অপকর্মের দায়ভার ওঠেছে অন্তর্বর্তী সরকারের কাঁধে।
নগরীর হালিশহর থানাধীন নয়াবাজার মোড় এলাকায় কথা হয় সিএনজি অটোরিকশাচালক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি পাহাড়তলী থানাধীন আবদুরপাড়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন। ভোলার বাসিন্দা হলেও ৩০ বছর ধরে সেখানে বসবাস করার সুবাদে ভোটারও হয়েছেন। ভোট দিয়েছিলেন কি না এবং বিজয়ী দলের কাছে প্রত্যাশা কি জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘সকালেই আমার স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ভোট দিয়েছি। ভোট দেওয়ার পর সিএনজি নিয়ে বের হয়েছি। নগরীর কোথাও তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা দেখিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খেটে খাওয়া মানুষ। যেদিন সিএনজি চালাতে পারি, সেদিন ভালোভাবে চলতে পারি। না হয় ধারদেনা করে চলতে হয়। আমরা চাই, দেশে শান্তি ফিরে আসুক। আর যেন রাজনৈতিক কারণে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ না হয়। আগামীকাল গাড়ি চালাতে পারব কি না-এমন শঙ্কা নিয়ে যেন থাকতে না হয়। এছাড়া আমাদের কষ্টে উপার্জিত টাকার ভাগ যেন বিনা কারণে কাউকে দিতে না হয়।’ নগরীর কাজির দেউরি কাঁচাবাজার এলাকায় অস্থায়ীভাবে গড়ে তোলা চা দোকানি মিন্টু আহমদ বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ দেখে আমার স্ত্রীকে ভোট দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছি। এবারই সে প্রথম ভোট দিয়েছে এবং ভোট দিতে পেরে অনেক খুশি হয়েছে। এমন সুশৃঙ্খল পরিবেশ আগে কখনো দেখিনি।’ ঢাকা থেকে নিজের জন্মস্থান নগরীর পাহাড়তলীতে ভোট দিতে আসা মোবাইলফোন ব্যবসায়ী এইচআর মুরাদ বলেন, ‘দেশে নির্বাচিত সরকার না থাকলে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ে। যেটি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দুঃখ-কষ্ট বুঝানোর সুযোগ ছিল না। সব অন্যায়-অবিচার মুখ বুঝে সহ্য করতে হয়েছে। ব্যবসায়ীরা মব সন্ত্রাসের শিকার হয়েছে। নির্বাচিত সরকার গঠন হলে এ মব সন্ত্রাস থেকে মুক্তি পাবে ব্যবসায়ীরা।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক ও আইনজীবী আখতার কবীর চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি এবং স্বল্পমেয়াদি অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করবেন। কিন্তু তাদের কাছে আমাদের আশা, তাদের ইশতেহার যেন ‘কাজির গরু’ না হয়। সেটার বাস্তবায়ন চাই। আমরা চাই, প্রথমেই যেন দুর্নীতি দমনের ওপর যেন জোর দেওয়া হয়। দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার জন্য বা দুর্নীতিকে সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য বাস্তবিক অর্থে যেন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। সেটা যেন গত সরকারের মতো মুখে মুখে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ না হয়। সেটা যেমন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বা প্রশাসনের ওপর থাকতে হবে, তেমনি নিজের দলের মধ্যেও সে শুদ্ধাচারের প্রয়োগ থাকতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের আগে-পড়ে মানুষ যেভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অসহায় হয়ে গেছে, সেই পরিস্থিতির যেন পুনরাবৃত্তি না হয়। মব ভায়োলেন্স যেন আর ফিরে আসে। সব মব ভায়োলেন্সের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সরকার যেন মনে না করে, যখন অপরাধ হয়েছে তখন আমি ক্ষমতায় ছিলাম না। এটা মনে করে বিচার না করার সুযোগ নেই। তাছাড়া গায়েবি মামলাগুলোর মাধ্যমে নানাভাবে পুলিশ প্রশাসন মানুষকে হয়রানি করছে। তারা জেনে বুঝেই করছে। এগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। নতুন সরকারকে প্রতিশোধ পরায়ণ মনোভাব থেকে বের হয়ে আসতে হবে।’
