রাজশাহী বিভাগের ৩৯ আসন
ভোট শান্তিপূর্ণ হলেও পরবর্তী সহিংসতায় জনমনে আতঙ্ক
রাজশাহী ব্যুরো
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রাজশাহী বিভাগের ৩৯টি আসনেই ভোট শান্তিপূর্ণ হয়েছে। তবে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় বিভিন্ন এলাকায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। গত তিন দিনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা-ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা এলাকায় বোমা তৈরিকালে দুজন নিহত ও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ভোটের পরের দিন শিবগঞ্জ উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে ১০টি বাড়িতে হামলা ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। শনিবার রাতে রাজশাহী মহানগরীর মতিহার থানার খোজাপুরে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। নাটোরের বড়াইগ্রামের ধানাইদহ বাজার এলাকায় দফায় দফায় নির্বাচনি সহিংসতার শিকার হয়েছে অনেক পরিবার। স্থানীয় বাজারে লুটপাটও হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, এতদিন অনেকে মব সন্ত্রাসের শিকার হলেও পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এখনো পুলিশ হঠাৎ করেই একটি রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেও নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা পাচ্ছেন না। পুলিশ ক্ষেত্রবিশেষে আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন তবে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের নির্দেশ মতো হচ্ছে সাজানো মামলা। ফলে প্রকৃত অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে আইনের আওতার বাইরে।
এ বিষয়ে রাজশাহী রেঞ্জ পুলিশের ডিআইজি ড. মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিচ্ছিন্ন কিছুটা ঘটেছে বিভাগের বিভিন্ন জেলায়। পরাজিত প্রার্থী ও বিজয়ী প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে অধিকাংশ সহিংসতা ঘটছে। নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে পুলিশকে প্রতিটি ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারা এসব সহিংসতায় জড়িত তাদেরও গ্রেফতারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারও চাপে বা প্রভাবে নিরীহ কাউকে যেন পুলিশ হয়রানি না করে সেটাও আমি সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বলেছি। জানা গেছে, শনিবার ভোরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের ফাটাপাড়া গ্রামে বোমা তৈরির সময় জিহাদ ও আল আমিন শুভ নামের দুই যুবক নিহত হয়। এ ঘটনায় আরও চারজন গুরুতর জখম হয়েছে। এলাকাবাসী জানায়, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক চেয়ারম্যান ওমর আলীর নেতৃত্বে একাংশ এবারের নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হারুনের পক্ষে এবং বর্তমান চেয়ারম্যান শহিদ রানা টিপুর অনুসারীদের একাংশ জামায়াতের নুরুল ইসলামের পক্ষে প্রকাশ্যে ভোট করেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় গোঠাপাড়ায় দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তারই জের ধরে ফাটাপাড়া আওয়ামী লীগ নেতা কালামের ভাই দুলালের বাড়িতে বোমা তৈরির সময় বিস্ফোরণে হতাহতের এসব ঘটনা ঘটে।
শনিবার রাতে সদর থানার এসআই বিল্লাল হোসেন বাদী হয়ে বিস্ফোরক ও হত্যার অভিযোগে একটি মামলা করেন। সেই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে টিপু চেয়ারম্যান ও তার কলেজশিক্ষক ভাইসহ ১০ জনকে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে প্রকৃত যারা জড়িত তাদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক কারণে পলাতক চেয়ারম্যানসহ তার অনুসারীদের আসামি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির লতিফুর রহমান বলেন, পুলিশ একজন নেতার বয়ানের ওপর ভিত্তি করে মামলায় আসামি করবে এটা কেমন কথা। পুলিশকে ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। যেই দোষী হোক তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে।
এদিকে শনিবার নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার ধানাইদহ বাজারে বিএনপি-জামায়াত সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়েছেন। এ সময় বাজারে বিভিন্ন দোকানপাটে হামলা ও লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে। এলাকায় বিরাজ করছে উত্তেজনা। তবে বড়াইগ্রাম থানার ওসি আব্দুস সালামের দাবি, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক। শিবগঞ্জ উপজেলার জগন্নাথপুর গ্রামে শুক্রবার সকালে কেন্দ্রে ভোট কম পাওয়া কেন্দ্র করে বিএনপির এক পক্ষের নেতাকর্মীরা আরেক পক্ষের নেতাকর্মীদের বাড়ি ঘরে হামলা অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। ভোটের রাত থেকেই এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ হয় দুপক্ষের। স্থানীয় বিএনপি নেতা বাবর আলী বলেন, তিনি ১৯৭৮ সাল থেকে বিএনপি করেন। সেই বিএনপি লোকেরাই আমার ও আমার চাচাত ভাই সাদিকুলের বাড়িসহ বেশ কিছু বাড়িতে হামলা ভাঙচুর লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেছে।
শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) হুমায়ুন কবীর বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কেউ অভিযোগ না করায় পুলিশ কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেনি। তবে এখন পরিস্থিতি শান্ত। বগুড়ার নন্দীগ্রামে শনিবার প্রতিপক্ষের হামলায় ৫ জন বিএনপি ও যুবদল নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। বগুড়ায় আরও কয়েকটি স্থানে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় জামায়াতের লোকজনও আক্রান্ত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন জেলা জামায়াতের আমির আবিদুর রহমান। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহিংসতা বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
একই দিন রাত ৮টার দিকে রাজশাহীর মতিহার থানার খোজাপুর এলাকায় মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়ার সময় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন গোলাম মোস্তফা। নিহতের স্ত্রী নাজেরা বেগমের দাবি, নির্বাচনে ভোট দেওয়ার বিরোধকে কেন্দ্র করেই তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। তবে আরএমপির মুখপাত্র উপ-কমিশনার গাজিউর রহমান বলেন, এটি নির্বাচনকেন্দ্রিক ঘটনা কিনা তা নিশ্চিত নয়। পুলিশ ঘটনার তদন্ত করছে।
