‘বড় বাপের পোলায় খায়’
ঐতিহ্য নাকি রসনার হুজুগ
রাজধানীর চকবাজারে শুক্রবার বড় বাপের পোলায় খায়সহ জনপ্রিয় ইফতারসামগ্রী বিক্রি হচ্ছে -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
রমজান এলেই পুরান ঢাকার প্রাণকেন্দ্র চকবাজার রূপ নেয় এক অনন্য খাদ্যসংস্কৃতির মিলনমেলায়। শাহী মসজিদের সামনের সড়কে বিকাল গড়াতেই জমে ওঠে ইফতারবাজার। হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে চারপাশ। সেই কোলাহলের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি কৌতূহল জাগায় ‘বড় বাপের পোলায় খায়’-১৫ পদের খাবার আর ১৬ রকম মসলার মিশেলে তৈরি এই ইফতারকে ঘিরে যেমন আছে চারশ বছরের কিংবদন্তি, তেমনি আছে মান ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে বিতর্ক।
শুক্রবার দুপুর থেকে সরেজমিন দেখা যায়, বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেকে এসেছেন এই ইফতার কিনতে। দোকান ও মানভেদে কেজিপ্রতি ৮০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে এই মিশ্র খাবার।
জানা গেছে, ১৬৭৬ সালে মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান চকবাজার এলাকার বাসিন্দাদের জন্য নির্মাণ করেন ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ। পরে ১৭০২ সালে ঢাকার দেওয়ান মুর্শিদ কুলি খাঁ চকবাজারকে আধুনিক বাজারে রূপান্তর করেন। মসজিদের সামনে একটি কূপকে কেন্দ্র করে চেয়ার-টেবিল বিছিয়ে ইফতারসামগ্রী বিক্রির প্রচলন শুরু হয়। নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইয়ে উল্লেখ রয়েছে, ১৮৫৭ সালের আগেই চকবাজার জমজমাট হয়ে ওঠে। রোজার সময় এখানে মোগলাই খাবার ও রকমারি ইফতারি বিক্রি হতো। বিশ শতকের প্রথমদিকেও ঢাকায় ইফতারির বাজার বলতে বোঝাত শুধুই চকবাজারকে।
আরব নিউজের সূত্রমতে, প্রায় চার শতাব্দী আগে বড় বাড়ি মসজিদের শ্রমিকরা ‘বড় বাপের পোলায় খায়’-এর মতো মিশ্র ইফতারি তৈরি করেছিলেন। অন্যদিকে স্থানীয় প্রবীণদের অনেকে বলেন, কামাল ব্যাপারী নামের এক বিক্রেতা প্রথম এটি বানান। আবার কেউ কেউ দাতা মোহাম্মদ কামাল মাহমুদ ওরফে কামেল মিয়ার নাম উল্লেখ করেন। তবে কোনোটিরই দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
‘বড় বাপের পোলায় খায়’-এর আক্ষরিক অর্থ-ধনী বাবার ছেলে খায়। ধারণা করা হয়, একসময় এতে ব্যবহৃত হতো ব্যয়বহুল উপকরণ, যা সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে ছিল। তাই এই নামের প্রচলন।
ছড়ার মাধ্যমে বিক্রি-‘বড় বাপের পোলায় খায়, ঠোঙা ভইরা লইয়া যায়’-এটি আধুনিক মার্কেটিংয়েরও এক অনন্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে। বিক্রেতাদের মতে, ডিম, গরুর মগজ, আলু, ঘি, কাঁচা ও শুকনো মরিচ, গরুর কলিজা, মুরগির মাংসের কুচি, মুরগির গিলা-কলিজা, সুতি কাবাব, মাংসের কিমা, চিড়া, ডাবলি, বুটের ডাল, মিষ্টিকুমড়াসহ ১৫ পদের খাবার আইটেমের সঙ্গে ১৬ ধরনের মসলা মিশিয়ে মোট ৩১ পদের মিশ্রণ তৈরি হয়। বড় গামলায় দুই হাতে মেখে ঠোঙায় ভরে বিক্রি করা হয়।
চকবাজারের দুটি দোকানে কথা হয় সালেকিন ও মাহমুদের সঙ্গে। তারা জানান, তাদের পরিবার চার পুরুষ ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের দাবি, এটা তাদের ঐতিহ্য।
৫৫ বছর বয়সি মোহাম্মদ নাজির হোসেন বলেন, আমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে এখানকার ইফতারি কিনতে আসি। প্রথমে বাবা আমাকে সঙ্গে নিয়ে আসতেন। তখন চক সার্কুলার রোডের শাহী মসজিদের অপর পাশে সালেহীনের দোকান থেকেই আমরা ইফতার কিনতাম। আগের সময়গুলোতে মসলা ছিল প্রচুর, স্বাদের ভিন্ন মাত্রা ছিল। এখন অনেক মসলাই দেওয়া হয় না। রংও বদলে গেছে-সাদা ছিল, এখন সাদাকালো ও খয়েরি। আগে দেশি মুরগি ব্যবহার হতো, এখন ফার্মের।
মোহাম্মদ নাজির হোসেন আরও বলেন, চকবাজারে এলে শুধু দেখেই নয়, শুনেও ইফতারি কিনতে হয়। অনেক সময় স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে তৈরি করা হয় না। একই তেল বারবার ব্যবহার করা হয়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ভেজাল বা মেয়াদোত্তীর্ণ জিনিসপত্রও মেশানো হয়। এই কারণে কখনো কখনো ঐতিহ্যবাহী ইফতারি খেয়ে পেট খারাপ বা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা হতে পারে।
লালবাগের বাসিন্দা রেজাউল করিম সুমন বলেন, আমরা অনেক আগে থেকেই খেয়ে অভ্যস্ত। এখন আগের মতো স্বাদ লাগে না। যারা আগে কখনো খায়নি, তাদের কাছে এটি নতুন লাগতে পারে, কিন্তু খুব মজার কিছু নয়। মানুষ আসলে এখানে হুজুগে চলে।
নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী নোহেল চৌধুরী বলেন, প্রতিবছর একবার হলেও এখানে ইফতারি কিনতে আসি। দাম বেশি, কিন্তু ঐতিহ্যের টান আছে।
কুমিল্লা থেকে চকবাজারের ইফতারি কিনতে এসেছেন অ্যাডভোকেট আল রেজা খান। তিনি বলেন, ঢাকায় আমার আত্মীয়স্বজন থাকে, আমি কুমিল্লায় বসবাস করি। তবে প্রত্যেক বছর রমজানে একবার হলেও চকবাজারে এসে ইফতারি কিনি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বারডেম হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. ফারিয়া ফয়েজ বলেন, বড় বাপের পোলায় খায়-এর মতো ইফতারি খোলা পরিবেশে বিক্রি হলেও সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। একই তেল বারবার গরম করলে তাতে থাকা কার্বোহাইড্রেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা হজমে সমস্যা বা স্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া ডিম, দুধ, চিড়া, মাংস ও স্পাইসি ফুড একসঙ্গে মেশানোয় পেট ফাঁপা, অ্যাসিডিটি বা অন্যান্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও মসলার সংমিশ্রণ শিশু, বৃদ্ধ এবং সংবেদনশীল ব্যক্তিদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তাই স্বাস্থ্যসম্মত প্রস্তুতি ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। স্বাদ ও ঐতিহ্য উপভোগের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকেও সর্বদা অগ্রাধিকার দিতে হবে।

