চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড
বড় সাজ্জাদের দুই অনুসারীর নিয়ন্ত্রণে
বিদেশে বসে প্রযুক্তির সাহায্যে নির্দেশনা
আহমেদ মুসা, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
চট্টগ্রামে আলোচিত সন্ত্রাসীরা এখনো অধরা। বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ প্রযুক্তির সহায়তায় তার বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার অনুসারী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন, মোহাম্মাদ রায়হান এখন চট্টগ্রামের অপরাধ জগতের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। আধিপত্য বিস্তার ঘিরে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যেও ঘটছে খুনাখুনি। টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা দাবি, বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, অপহরণ বাণিজ্য, কন্টাক্ট কিলিংসহ নানা অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় তাদের তৎপরতায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।
সাজ্জাদ আলী খানের শিষ্য ছোট সাজ্জাদ, ডেভিড ইমন ও রায়হানের অপকর্ম বায়েজিদ ও পাঁচলাইশ এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখনো পুরো নগরীতে ছড়িয়ে পড়েছে। ছোট সাজ্জাদ ঢাকা থেকে গ্রেফতার হওয়ার পর বর্তমানে বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ডেভিড ইমন ও রায়হান আলমের হাতে। তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সর্বশেষ সোমবার নগরীর চন্দনপুরা এক্সেস রোডে একটি ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা ও লুটপাট চালায় ডেভিড ইমনের বাহিনী। ডেভিড ইমন ফোন করে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছে ২ কোটি টাকা এককালীন চাঁদা এবং প্রতি মাসে ১০ লাখ টাকা করে দাবি করেছিলেন। দুদিন সময় বেঁধে দেওয়ার পর দাবিকৃত চাঁদা না পাওয়ায় তার লোকজন ওই প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ৩৫ লাখ টাকা লুট করে। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে। পুলিশ আটজনকে গ্রেফতার করলেও ইমনের খোঁজ পায়নি। তাকে গ্রেফতারে ফটিকছড়িতে সাঁড়াশি অভিযান ব্যর্থ হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে বড় সাজ্জাদ বাহিনীর পরিচালনা করতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তার সঙ্গে ছিলেন মোবারক হোসেন ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান। গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকার একটি শপিংমল থেকে ছোট সাজ্জাদকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এরপর থেকে কারাগারেই আছেন ছোট সাজ্জাদ। তার বিরুদ্ধে ১০টি হত্যাসহ ১৯টি মামলা রয়েছে। ছোট সাজ্জাদকে পুলিশ গ্রেফতার করতে পারলেও অধরা তার সহযোগীরা। উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি তার বাহিনীর কাছে থাকা ভারী অস্ত্রও। ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর বাহিনীর হাল ধরেন রায়হান। তার বিরুদ্ধে খুনসহ বিভিন্ন অভিযোগে ২৪টি মামলা রয়েছে। বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী মোবারক হোসেন ইমনের বিরুদ্ধে বাকলিয়ায় জোড়া খুনসহ অন্তত ৮টি মামলা রয়েছে। সূত্র জানায়, বর্তমানে চট্টগ্রামের আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন মূলত মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমন ও মোহাম্মদ রায়হান। তাদের রয়েছে মাঝারি মানের ২০-৩০ জনের সন্ত্রাসী। প্রত্যেকে আলাদা গ্রুপ করে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের বেশির ভাগই আবার কিশোর গ্যাং হিসাবে পরিচিত। এর মধ্যে খোরশেদ আলম, ভাতিজা মোহাম্মদ, নাজিম উদ্দিন, ববি আলম, কামাল, হাসান, নুরুল হক, বোরহান, মুবিন, কাদের, তপু, আজম, মনির, তুষার, তুহিন, সোহেল, ছালেক ও এরশাদের নাম পাওয়া গেছে।
দলের মাঝারি মানের সন্ত্রাসীরা মাঠপর্যায়ে বড় ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিদের তথ্য সংগ্রহ করে দেশের বাইরে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী বা বড় সাজ্জাদের কাছে পাঠায়। এরপর বড় সাজ্জাদ ফোন করে অথবা ডেভিড ইমনকে দিয়ে ফোন করিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করেন। হুমকি-ধমকিতে কাজ না হলে এলাকাভিত্তিক সন্ত্রাসী বা কিশোর গ্যাং পাঠিয়ে ভাঙচুর বা হামলা করে।
তাদের যত অপকর্ম : ১৩ জুন এ সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে খুন হন রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরী। রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। এ হত্যার ঘটনায় বড় সাজ্জাদের সহযোগী রায়হানসহ ১১ জনের নামে মামলা করা হয়। গত বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রামের বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন ও একই বছরের ২৩ মে রাতে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যা মামলাসহ অন্তত সাতটি মামলার আসামি তিনি। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট আনিস ও মোহাম্মদ হাসান নামে দুজনকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডে তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে মনে করা হয়।
দুই দফায় চকবাজার থানার চন্দনপুরা এলাকায় স্মার্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের বাসা লক্ষ্য করে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। প্রথম দফায় ২ জানুয়ারি বাসাটি লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এরপর ২৮ ফেব্রুয়ারি মুহুর্মুহু গুলি করা হয়। ১০ কোটি টাকা চাঁদার দাবিতে পুলিশের পাঁচ সদস্য পাহারারত অবস্থায় ওই ভবন লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। বড় সাজ্জাদের অনুসারীরা এ ঘটনায় জড়িত বলে পুলিশ জানিয়েছে। সিএমপির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশীদ যুগান্তরকে বলেন, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করতে বহুমাত্রিক অভিযান চলছে।
