Logo
Logo
×

সম্পাদকীয়

দুর্নীতির সূচকে অবনতি

রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি

Icon

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতির সূচকে অবনতি

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণাসূচক (সিপিআই) বাংলাদেশের জন্য এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে। ১৮২টি দেশের মধ্যে দুর্নীতির ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৫০তম এবং অধঃক্রম অনুযায়ী ১৩তম-যা আগের বছরের তুলনায় আরও এক ধাপ অবনতি। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে যেখানে জন-আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ার, সেখানে দুর্নীতির এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি নাগরিক সমাজকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে মাত্র ২৪। এটি বৈশ্বিক গড় ৪২-এর চেয়ে অনেক নিচে। এ পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা দুর্নীতির এক প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির বহিঃপ্রকাশ। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক তথ্য হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে যে সংস্কার ও স্বচ্ছতার আশা করা হয়েছিল, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে। প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, বিগত দেড় বছরে সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমলাতন্ত্র এবং রাজনৈতিক অপশক্তির প্রভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধক আইনি কাঠামো তৈরি তো দূরে থাক, উলটো দুর্নীতি দমনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার প্রস্তাব অবহেলিত হয়েছে।

জুলাই আন্দোলনের মূল ভিত্তিই ছিল ‘চোরতন্ত্র’ বা ক্লিপটোক্রেসির পতন ঘটানো। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা বলছে, দুর্নীতি কমেনি বরং কেবল ‘হাতবদল’ হয়েছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণে গুণগত পরিবর্তনের পরিবর্তে দখলদারি, চাঁদাবাজি, মামলাবাজি ও দলবাজির পুরোনো মহড়া দেখা যাচ্ছে। এমনকি রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা আপত্তি প্রদান এটিই প্রমাণ করে যে, তারা জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে মোটেও আগ্রহী নয়। অর্থ পাচারের বিষয়টিও সমান উদ্বেগজনক। সিঙ্গাপুর, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মতো দেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। একদিকে দেশে ঘুস, তহবিল তছরুপ এবং স্বজনপ্রীতি চলছে, অন্যদিকে অর্থ পাচার হওয়া দেশগুলোও যেন এই অনৈতিকতায় পরোক্ষ সহযোগিতা দিচ্ছে।

দুর্নীতির এই মরণব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতির বাইরে বেরিয়ে আসতে হবে। টিআইবি যে সুপারিশগুলো করেছে-রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দুদককে স্বাধীন করা এবং গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা-সেগুলো কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। রাজনৈতিক দলগুলোকে ‘আয়নায় নিজেদের চেহারা’ দেখতে হবে এবং ক্ষমতা লিপ্সার চেয়ে রাষ্ট্রের স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমরা একটি বড় সুযোগ হারিয়েছি। গণ-অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের দুর্বলতায় দুর্নীতি দমনের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। এখনই সময় নতুন করে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের। অন্যথায় দুর্নীতির দুষ্টচক্র আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দেবে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম