প্রতিশ্রুতির সাংবিধানিক অভিযাত্রা
শাসন কাঠামোয় পরিবর্তনের পালা
প্রকাশ: ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’-এর জয় দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা করেছে। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ‘জুলাই সনদ’ অনুমোদিত হওয়ায় শাসন কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের যে অঙ্গীকার করা হয়েছিল, স্বাভাবিকভাবেই তা এখন সাংবিধানিক ভিত্তি পেতে যাচ্ছে। প্রস্তাবিত এই পরিবর্তনের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা প্রবর্তন এবং উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাষ্ট্রপরিচালনায় বিশেষজ্ঞ ও বিভিন্ন পেশাজীবীর অংশগ্রহণের পথ প্রশস্ত করবে। ওদিকে সংসদ-সদস্যপদ হারানো বা ৭০ অনুচ্ছেদের কঠোরতা শিথিল করার মাধ্যমে সংসদ-সদস্যদের বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। বলা বাহুল্য, এটি আইনসভাকে ‘রাবার স্ট্যাম্প’ হওয়ার অভিশাপ থেকে মুক্তি দেবে। এছাড়া বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগের বিধান সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রকৃত অর্থেই প্রাণবন্ত করবে।
নির্বাহী বিভাগের একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাসে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা এবং জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলের সম্মতির প্রয়োজনীয়তা একনায়কতন্ত্র রোধে যে রক্ষাকবচ হিসাবে কাজ করবে, তা বলাই বাহুল্য। এছাড়া সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ কমিটি গঠন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে শক্তিশালী করার প্রস্তাবগুলো রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড পুনর্গঠনে সহায়ক হবে। মৌলিক অধিকারে ইন্টারনেট ও তথ্য সুরক্ষার অন্তর্ভুক্তি এবং জাতীয় পরিচয় হিসাবে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় গ্রহণ করার সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। নতুন এই সাংবিধানিক কাঠামোতে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিতের পাশাপাশি বিশেষায়িত উচ্চকক্ষে নারীর কার্যকর প্রতিনিধিত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে একটি আধুনিক ও দুর্নীতিমুক্ত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়তে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগ নীতিতে পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছে, যা ইতিবাচক।
তবে মুদ্রার উলটো পিঠও আমাদের বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে যে জটিল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তা রাজনৈতিক সংকটকালে কতটুকু দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ থাকে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হলে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের পদ্ধতিটি দীর্ঘসূত্রতার জন্ম দিতে পারে। আবার দ্বি-কক্ষীয় সংসদে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে ক্ষমতার সংঘাত বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থার ঝুঁকি রয়েছে। অবশ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও সেটাকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবেই দেখা উচিত, কারণ বহুমতের ভিত্তিতে সমাধান খোঁজা দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। সেক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা তৈরির ঝুঁকি নিরসনে প্রয়োজন হবে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামোর।
আমরা মনে করি, এই গণভোট জনগণের আস্থার প্রতিফলন এবং রাষ্ট্র সংস্কারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে কাগজের এই সংস্কার তখনই সফল হবে, যখন এর প্রয়োগে রাজনৈতিক দলগুলো সততা ও সহনশীলতার পরিচয় দেবে। মনে রাখতে হবে, ‘হ্যাঁ’-কে জয়ী করার মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ সংস্কারের প্রতি যে আস্থা প্রকাশ করেছে, তার মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর দায়বদ্ধতা এখন আগের চেয়ে বহুগুণ বেশি। সার্বিকভাবে একটি বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক ও মানবিক মর্যাদার বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই সাংবিধানিক পরিবর্তন মূল ভিত্তি হিসাবে কাজ করবে, এটাই প্রত্যাশা।
