সালাম মুর্শেদীর ৪ কোটি টাকা আত্মসাৎ!
‘প্রতারণা’র টাকা ফেরত চেয়ে স্ত্রীর চিঠি
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
স্বামীকে আয়করের খক্ষ থেকে বাঁচাতে মোটা অঙ্কের ঘুস দিয়েছিলেন সাবেক সংসদ-সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদীর স্ত্রী সারমিন সালাম। প্রতারণার শিকার হয়ে এখন সেই টাকা আয়কর হিসাবে সমন্বয় করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছেন তিনি। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা থাকায় ইতোমধ্যে এনবিআরের দুই কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর তৎকালীন রাঘববোয়াল সংসদ-সদস্য ও ব্যবসায়ীদের কর ফাঁকির অনুসন্ধান শুরু করে এনবিআরের দুটি গোয়েন্দা বিভাগ। এগুলো হচ্ছে-আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)। আয়কর গোয়েন্দারা খুলনা-৪ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য ও সাবেক ফুটবলার আব্দুস সালাম মুর্শেদীর আয়কর ফাঁকি তদন্ত করে। প্রাথমিক তদন্তে আয়কর গোয়েন্দা ২৩ কোটি টাকা কর ফাঁকির প্রমাণ পায়। দায় স্বীকার করে দুই দফায় সালাম মুর্শেদীর পক্ষে সাড়ে ৪ কোটি টাকা আয়কর ‘এ’ চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, আব্দুস সালাম মুর্শেদীর রিটার্ন পর্যালোচনা করে আয়কর গোয়েন্দা প্রায় ১৩ কোটি টাকা কর ফাঁকি উদঘাটন করে। আইন অনুযায়ী এর সঙ্গে আরও ১০ কোটি টাকা সুদ-জরিমানা আরোপ করা হয়। সব মিলিয়ে সালাম মুর্শেদীর কর ফাঁকি দাঁড়ায় ২৩ কোটি ৫ লাখ টাকা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ২৭ মে প্রথম দফায় দেড় কোটি এবং ৩০ জুন ৩ কোটি (মোট সাড়ে ৪ কোটি) টাকা ‘এ’ চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে জমা দেন তার স্ত্রী। বাকি ৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা এবং সুদ-জরিমানার ১০ কোটি টাকা পরে জমা দেওয়ার অঙ্গীকার করে জব্দ ব্যাংক হিসাব অবমুক্তের আবেদন জানান তিনি।
এর পরপরই ঘটনার সূত্রপাত। সালাম মুর্শেদীর স্ত্রী সাহায্যের জন্য পূর্বপরিচিত অজয় সরকারকে কর ফাঁকির মামলার বিষয়টি জানান। অজয় জানায়, তার সঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যানের খুবই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের পরিচয় আছে। যিনি জরিমানার টাকা মওকুফ করিয়ে শুধু মূল আয়কর পরিশোধ করে মামলাটি নিষ্পত্তি করে দেবেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২২ জুলাই অজয় সরকার ও তার সহযোগী আব্দুল হামিদ, এনবিআর চেয়ারম্যানের কথিত আত্মীয় জাহাঙ্গীর আলম, সালাম মুর্শেদীর অফিসের হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা আব্দুল আউয়ালকে নিয়ে যুগ্ম কর কমিশনার প্রণব সরকারের (বর্তমানে কর অঞ্চল-১৭তে যুগ্ম কমিশনার হিসাবে কর্মরত) সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে জাহাঙ্গীর আলমের ভাই জামশেদ আলী এবং প্রণব সরকারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু জিয়ারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার একপর্যায়ে প্রণব সরকার তৎকালীন বৃহৎ করদাতা ইউনিটে (এলটিইউ-আয়কর) উজ্জ্বল সরকারের (বর্তমানে কর অঞ্চল-২২ এ কর্মরত) সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং সব কাজ করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন।
সারমিন সালাম এনবিআরে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেন, আলোচনা মোতাবেক জাহাঙ্গীর আলম ও জিয়ারুল ইসলাম জানায়, মূল আয়কর প্রথমে পরিশোধ করলে কমিশনার সব জরিমানা মওকুফ করে দেবেন। এর বন্দোবস্ত তারা করেছেন এবং তদবির করতে তাদের সুবিধা হবে। তাদের কথা ও আশ্বাসের ওপর বিশ্বাস করে মূল আয়করের টাকা জমা দিতে সম্মত হই। সে মোতাবেক প্রিমিয়ার ব্যাংকের পান্থপথ শাখায় জমা দিতে অজয় সরকার, আব্দুল হামিদ, জাহাঙ্গীর আলম ও জিয়ারুল ইসলাম ২৮ জুলাই ২ কোটি টাকা নিয়ে যায়। ওই টাকা সরকারি কোষাগারে জমা না দিয়ে তারা আরও আড়াই কোটি টাকার জন্য চাপ দেয়। টাকা না দিলে ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ, সম্পত্তি ক্রোকসহ বিভিন্ন ভয়ভীতি প্রদর্শন করে।
ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দুর্দশার কথা তুলে ধরে চিঠিতে সারমিন সালাম উল্লেখ করেন, স্বামী কারাগারে থাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছে, পারিবারিক জীবনও দুর্বিষহ। উপায় না দেখে দিশেহারা হয়ে ধারকর্জ করে এবার ২ কোটি ১০ লাখ টাকা তাদের দেওয়া হয়। উল্লিখিত ব্যক্তিরা ২০২৫ সালের ৭ আগস্ট প্রিমিয়ার ব্যাংকের পান্থপথ শাখায় নগদ টাকা ‘এ’ চালানের মাধ্যমে জমা দেবে বলে নিয়ে যায়। এ সময় জাহাঙ্গীর আলম একটি ব্যাংক চেক এবং এনআইডি কার্ডের একটি কপি দেয়।
পরে টাকা জমার চালানের কপি চাইলে অজয় সরকার জানায়, জাহাঙ্গীর আলম তার সব মোবাইল ফোন বন্ধ করে আত্মগোপন করেছে। এরপর থেকে জাহাঙ্গীর আলম, অজয় সরকার, প্রণব সরকার ও জিয়ারুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেও বিষয়টি সমাধান করা সম্ভব হয়নি। উপায় না পেয়ে জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের ৪ কোটি ১০ লাখ টাকার চেকটি নগদায়নের জন্য ১৬ সেপ্টেম্বর প্রিমিয়ার ব্যাংকের পান্থপথ শাখায় নেওয়া হলে তা প্রত্যাখ্যাত (ডিজঅনার) হয়। তাদের কাছ থেকে ৪ কোটি ১০ লাখ টাকা আদায় এবং তা ‘এ’ চালানের মাধ্যমে বকেয়া করের বিপরীতে সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান সারমিন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাহাঙ্গীর আলমের বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার ইন্দ্রনগর গ্রামে, বর্তমানে খুলনায় বসবাস করেন। সোনাডাঙ্গায় ব্লু অর্কিড নামে তার একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্ট আছে। মাঝে মধ্যে সেখানে যান। যুগ্ম কর কমিশনারের বন্ধু জিয়ারুল ইসলামের বাড়িও সাতক্ষীরা জেলায়।
ব্লু অর্কিড হোটেলের ম্যানেজারের কাছে জাহাঙ্গীরের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ৮-১০ দিন আগে রেস্টুরেন্টে এসেছিলেন। কাজের প্রয়োজনে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হয়।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য : সালাম মুর্শেদীর স্ত্রীর হয়ে অভিযোগের বিষয়টি দেখভাল করছেন এনভয় গ্রুপের স্বতন্ত্র উপদেষ্টা আব্দুল মাজেদ। যুগান্তরকে তিনি বলেন, আয়কর কর্মকর্তার যোগসাজশে অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার বিস্তারিত আয়কর গোয়েন্দাকে চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়। এখনো কোনো জবাব পাইনি। আশা করছি, এ বিষয়ে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেবে এনবিআর। তিনি আরও বলেন, অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে প্রতারক চক্র যেন এভাবে প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য অভিযোগ করেছি।
সেই দুই কর্মকর্তার বক্তব্য : প্রতারক জিয়ারুলের সঙ্গে সখ্যের বিষয় স্বীকার করে যুগ্ম কর কমিশনার প্রণব সরকার যুগান্তরকে বলেন, জিয়ারুল ইসলাম কলেজের বন্ধু। আগের দপ্তরে কর্মরত অবস্থায় কয়েকজন ব্যক্তিকে নিয়ে অফিসে এসেছিলেন সালাম মুর্শেদীর কর ফাঁকির ব্যাপারে পরামর্শের জন্য। আমি যেহেতু সংশ্লিষ্ট অফিসে কর্মরত নই, সেহেতু ওই অফিসে যোগাযোগ করতে বলি। জিয়ারুলের আরেক বন্ধু এলটিইউ-আয়করে কর্মরত ছিল বিধায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলি। এরপর এ বিষয়ে কে কার সঙ্গে কথা বলেছে, কী করেছে, আমি তার কিছুই জানি না। কয়েকদিন আগে আয়কর গোয়েন্দা এ বিষয়ে আমার বক্তব্য জানতে চাইলে প্রতারণার বিষয়টি জানতে পারি। জিয়ারুলের সঙ্গে যোগাযোগ আছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রতারণার কথা জানার পর ওর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছি।
যুগ্ম কমিশনার উজ্জ্বল সরকার যুগান্তরকে বলেন, সালাম মুর্শেদীর স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আয়কর গোয়েন্দা বক্তব্য শুনতে আমাকে ডেকেছিল, আমি আমার বক্তব্য সেখানে দিয়েছি।
চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে আয়কর গোয়েন্দার কমিশনার আবদুর রকিব যুগান্তরকে বলেন, চিঠিতে উল্লেখিত অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। প্রতারণার সঙ্গে কর কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। তৃতীয়পক্ষ এতে জড়িত।

