সংসদ-সদস্য ও নতুন মন্ত্রিসভার শপথ কাল
আসছেন ভারতের স্পিকার ও সার্কভুক্ত দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা * অনুষ্ঠান হচ্ছে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের শপথ গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা। রোববার তোলা -যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য ও নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ কাল। সাধারণত বঙ্গভবনের দরবার হলে অনুষ্ঠিত হয় মন্ত্রিসভার শপথ। আর সংসদ-সদস্যরা শপথ নেন জাতীয় সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে। তবে প্রচলিত এই রীতি ভেঙে প্রথমবার মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান হচ্ছে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায়। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিকাল ৪টায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন। এর আগে সকাল ১০টায় একই জায়গায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সংসদ-সদস্যরা শপথ নেবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন তাদের শপথ পড়াবেন।
প্রধান উপদেষ্টার মুখ্যসচিব ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব এম সিরাজউদ্দিন মিয়া শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ৩৮ থেকে ৪২ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানান, সকালে সংসদ-সদস্যদের এবং বিকালে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণের আয়োজন করা হয়েছে দক্ষিণ প্লাজায়। অন্তর্বর্তী সরকার, সংসদ সচিবালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা এই আয়োজন সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে কাজ করে যাচ্ছে। রোববার অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, শপথ অনুষ্ঠানে যোগদানের জন্য পররাষ্ট্র উপদেষ্টার দপ্তর থেকে সার্কভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানায়নি। প্রথা ভেঙে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় শপথ আয়োজনের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, এটা বিএনপির পছন্দনীয় স্থান। একাধিক কারণে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা সরকারের কাছেও পছন্দের জায়গা। নবগঠিত সংসদ অন্যান্য সংসদের মতো নয়। এটি ব্যতিক্রমধর্মী একটি সংসদ। অনেক আত্মত্যাগ, রক্তপাত, বেদনাদায়ক ঘটনা ও রক্তস্নাত গণ-অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে পাওয়া এ সংসদ। এই সংসদ প্রাঙ্গণে অনেক ঐতিহাসিক স্মৃতি রয়েছে। জুলাই ঘোষণা ও জুলাই সনদ ঘোষণা-এ দুটি বিষয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা থেকে হয়েছে। এটা আমাদের অনেক আবেগের জায়গা। এখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আমাদের সবার প্রিয় শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদির জানাজাও এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এটি অনেক স্মৃতিবিজড়িত স্থান। সবকিছু বিবেচনা করে বিএনপি প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথের জন্য এ স্থানটি পছন্দ করেছে এবং সরকার সে অনুযায়ী আয়োজন করেছে।
এদিকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও সরকারি পরিবহণ পুল মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে। কমবেশি এক হাজার দেশি-বিদেশি অতিথিকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের আমন্ত্রণ জানানো হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচিত সব সংসদ-সদস্যের ফোন নম্বর নির্বাচন কমিশন থেকে সংগ্রহ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। জানা যায়, নতুন মন্ত্রীদের জন্য গাড়ি, গাড়িতে ব্যবহারের জন্য মনোগ্রাম, গাড়িচালক ও সিকিউরিটি টিম বাছাই করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে শপথের জন্য নতুন ফোল্ডার।
জানা যায়, শপথ অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, প্রধান বিচারপতি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, সিনিয়র সাংবাদিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, সরকারের সিনিয়র সচিব ও সচিব, তিন বাহিনীর প্রধান, বিদেশি রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও মিশনপ্রধান এবং সিনিয়র সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের নামের তালিকা পাওয়া গেলে সোমবার সকাল থেকে আমন্ত্রণ জানানো হবে তাদের শপথ নেওয়ার জন্য। এর মধ্যে যারা গাড়ির সাপোর্ট চাইবেন, তাদের গাড়ি সরবরাহ করা হবে। তবে শপথ নিয়ে বের হওয়ার সময় তারা সিকিউরিটি ফোর্স, ফ্ল্যাগসহ গাড়িতে বাসায় ফিরবেন। কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিসভার আকার বেশ বড় হবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ বেশিসংখ্যক গাড়ি প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। সর্বোচ্চ ৫০টি গাড়ি প্রস্তুত করতে বলা হয়েছে। তবে একসঙ্গে না বাড়িয়ে পর্যায়ক্রমেও মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা বাড়াতে পারবে নতুন সরকার। শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা দেখার জন্য আরও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে বলে জানান কর্মকর্তারা।
নির্বাচিতরা দুটি শপথ নেবেন : জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে বেশির ভাগ ভোটার সম্মতি দেওয়ায় নির্বাচিত সংসদ-সদস্যদের দুটি শপথ নিতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন সংবিধান সংস্কার আদেশ ২০২৫-এ সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের দ্বারাই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে এবং জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যরা দুটি শপথ গ্রহণ করবেন। একটি হচ্ছে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসাবে এবং আরেকটি হচ্ছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে।
ভারতের স্পিকারসহ আসছেন বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা : শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বাংলাদেশে আসছেন ভারতসহ বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা। শপথ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করবেন দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা এবং পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি। রোববার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সরকারের শপথ অনুষ্ঠানে স্পিকারের অংশগ্রহণ ভারত ও দেশটির জনগণের মধ্যে গভীর ও স্থায়ী বন্ধুত্বের প্রতি জোর দেয়। এর মাধ্যমে আমাদের দুই দেশকে সম্পর্কের দৃঢ়তায় আবদ্ধ করে। শপথ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি ভারতের দৃঢ় অঙ্গীকারকে পুনর্ব্যক্ত করে।’ এতে আরও বলা হয়, ভারত ও বাংলাদেশ ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার দ্বারা ঐক্যবদ্ধ। প্রতিবেশী দেশ হিসাবে ভারত নির্বাচিত সরকারের উত্তরণে স্বাগত জানায়। এদিকে এনডিটিভি জানিয়েছে, আমন্ত্রণ পেলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় আসবেন না। কারণ, আগেই ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে তার বৈঠকের শিডিউল রয়েছে। ১৬ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ভারতের দিল্লি ও মুম্বাইয়ে ইন্ডিয়া-এআই ইমপ্যাক্ট সামিট অনুষ্ঠিত হবে। এই সম্মেলনে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা, নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী ডিক শফ, সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহামেদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ ২০টি দেশের শীর্ষ নেতারা অংশ নেবেন। এনডিটিভি আরও জানায়, বাংলাদেশের নতুন সরকারের এ শপথ অনুষ্ঠান ভূরাজনীতির দিক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশের নতুন নেতা তারেক রহমান ভারত, পাকিস্তান, চীনসহ সব দেশের সঙ্গে সমান সম্পর্ক বজায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। শুক্রবার মোদির সঙ্গে তারেক রহমান কথা বলেন।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ভুটান, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের এ শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে কারা আসছেন সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
