বৃষ্টি উপেক্ষা করে মানিক মিয়ায় মানুষের ঢল
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ০৬ আগস্ট ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অসংখ্য তরুণের বুকের তাজা রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয় প্রিয় স্বদেশ। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের কবল থেকে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ৩৬ দিনের রক্তাক্ত আন্দোলন হয় গত বছর। স্বৈরাচারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে কারফিউ ভেঙে ছাত্রদের এক দফার ডাকে রাজপথে নেমে আসে সর্বস্তরের জনতা। গণরোষের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তথা ‘৩৬ জুলাই’ পালিয়ে যায় স্বৈরাচার। মঙ্গলবার সেই জুলাই ছাত্র-গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপন করেছে সর্বস্তরের ছাত্র-জনতা।
দিনটি উপলক্ষ্যে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়। শ্রাবণের বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাজারো মানুষের ঢল নামে। সৃষ্টি হয় ভিন্ন এক পরিবেশের। হাতে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে ও মাথায় পতাকা বেঁধে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেম মূর্ত করে তোলে সর্বস্তরের জনতা। স্বৈরাচার সরকারের পতনের বর্ষপূর্তির খুশি উদযাপন নিজ চোখে দেখতেই সমবেত হন তারা। সেখানে দিনভর গান, কনসার্ট, ড্রোন শোসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জমকালো আয়োজনে চলে উদযাপন।
সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর শিল্পীদের সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে দুপুর ১২টায় শুরু হয় দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠান। তারা একে একে পরিবেশন করেন ‘এই দেশ আমার বাংলাদেশ’, ‘আয় তারুণ্য আয়’, ‘জীবনের গল্প’, ‘ওমা আর কেঁদো না’, ‘যাঁদের জন্য পেলাম আবার নতুন বাংলাদেশ’, ‘জারিগান’সহ ইসলামিক সংগীত। এরপর ‘কলরব শিল্পীগোষ্ঠী’ পরিবেশন করে ‘তোমার কুদরতী পায়ে’, ‘দে দে পাল তুলে দে’, ‘ধন ধান্যে পুষ্পভরা’, ‘ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি’ ও ‘দিল্লি না ঢাকা’। একক সংগীতপর্বে নাহিদ পরিবেশন করেন ‘পলাশীর প্রান্তর’ ও ’৩৬ জুলাই’সহ দুটি গান। এরপর ‘নোঙর তোল তোল’, ‘তুমি প্রিয় কবিতা’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘চল চল’ ও ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ গানগুলো পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী তাশফি। গানের ফাঁকে ফাঁকে স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলে ছাত্র-জনতা।
‘ফ্যাসিবাদের পলায়নের ক্ষণ’ উদযাপন : দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে একসঙ্গে আকাশে উড়ানো হয় ‘হেলিকপ্টারের আদলে’ শতাধিক বেলুন। সঙ্গে হাজারো মানুষের কণ্ঠে স্লোগান ওঠে-‘পালাইছে রে পালাইছে, শেখ হাসিনা পালাইছে’। এভাবেই মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বেলুন উড়িয়ে, স্লোগানের ধ্বনিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলায়ন মুহূর্তটি উদযাপন করা হয়।
এরপর সংগীত পরিবেশন করে ‘চিটাগাং হিপহপ হুড’। তারা গেয়ে শোনায় ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘আমরা আসছি ঢাকা কাঁপাইতে’সহ কয়েকটি গান। র্যাপার সেজান গেয়ে শোনান ‘কথা ক’, ‘হুদাই হুতাশে’, ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’সহ কয়েকটি র্যাপসংগীত। ব্যান্ডদল শূন্য পরিবেশন করে ‘শত আশাদ’, ‘বেহুলা’, ‘রাজাহীন রাজ্য’ ও ‘শোন মহাজন’সহ কয়েকটি গান।
এরপর মঞ্চে উঠেন কণ্ঠশিল্পী ইথুন বাবু ও মৌসুমি। দলীয়ভাবে তারা পরিবেশন করেন ‘আমাদের বাংলাদেশ’, পলাশ গেয়ে শোনান ‘মা’, মৌসুমি গেয়ে শোনান ‘দেশটা তোমার বাপের নাকি’, ‘এখনো আমরা জেগে আছি’ ইত্যাদি। এরপর সংগীত পরিবেশন করেন সায়ান, ব্যান্ডদল সোলস, ওয়ারফেজ, বেসিক গিটার লার্নিং স্কুল, ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ব্যান্ডদল এফ মাইনর, কণ্ঠশিল্পী পারশা মাহজাবিন, কণ্ঠশিল্পী এলিটা করিম। বিকালে পাঠ করা হয় ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র।
ড্রোন ড্রামা শো ‘ডু ইউ মিস মি’ : সবশেষে ছিল ড্রোন ড্রামা শো ‘ডু ইউ মিস মি’। ড্রামাটি লিখেছে ‘দ্য অ্যানোনিমাস’। বাংলাদেশ সরকার এবং চীন সরকার কর্তৃক যৌথভাবে এই ‘ড্রোন শো’-তে প্রায় ২০০০ ড্রোন উড্ডয়নের মাধ্যমে জুলাইয়ের গল্প তুলে ধরা হয়। জুলাইয়ে ঢাকাসহ সারা দেশের ছাত্র-জনতা স্রোতের মতো বেরিয়ে এসে আন্দোলনে নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটায় এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। সেই জীবন্ত মুহূর্ত ও স্লোগান এবং গ্রাফিতিসমূহ প্রদর্শন করা হয় ড্রোন শোয়ের মাধ্যমে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিকে পুনর্জাগরণে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাসব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসাবে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সহযোগিতায় এই আয়োজনের ব্যবস্থাপনায় ছিল শিল্পকলা একাডেমি। অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় ছিলেন জুলহাজ্জ জুবায়ের ও সারা আলম।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনটি দেশে সরকারি ছুটি ছিল। ঢাকার বাইরে সারা দেশের জেলা-উপজেলাগুলোতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তিতে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশন ও দূতাবাসও দিনটি উপলক্ষ্যে দিনভর নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের মূল আয়োজন ছাড়াও রাজধানীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন : জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আহতদের সুস্থতা কামনা করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। মঙ্গলবার কমিশনের সভাকক্ষে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে অংশগ্রহণকারীরা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরেন এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জনগণের সচেতনতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন কমিশনের সচিব সেবাষ্টিন রেমা। উপস্থিত ছিলেন কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) (জেলা জজ) বেগম মেহেরুন্নেসা এবং পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) কাজী আরফান আশিক।
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ : নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে রাজধানীর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস-২০২৫ উদযাপিত হয়েছে। বেলা ১১টায় রাজধানীর মতিঝিল ক্যাম্পাসে এ উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির সভাপতি সাবেক স্বরাষ্ট্র সচিব এস এম জহরুল ইসলাম। সভাপতিত্ব করেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ লায়লা আক্তার।
