শেষ সূর্যাস্ত বিশ্বকাপের
মোজাম্মেল হক চঞ্চল
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
এক মাস ধরে পৃথিবীর ক্যালেন্ডার অন্য নিয়মে চলেছে। রাতে ফুটবল। ঘুম নেই। সকালে আগের রাতের গোল নিয়ে আলোচনা। অফিসে, চায়ের দোকানে, বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডরে, বাজারে, ক্যাফেতে একই গল্প। বিশ্বকাপ।
এরপর আসে শেষ রাত। যে আলো এক মাস পৃথিবীকে জাগিয়ে রেখেছিল, সেই আলো নিভে যাওয়ার সময় হয়ে যায়। স্টেডিয়ামের আকাশে শেষবারের মতো আতশবাজি ফুটবে। শেষবারের মতো বাজবে বিশ্বকাপের সংগীত। তারপর সব শেষ।
একটি দেশ হাসবে। আরেকটি নীরবে ফিরে যাবে। এক দলের স্বপ্নের শেষ ধাপ। অন্য দলের ইতিহাস ছোঁয়ার অপেক্ষা। কোচ কথা বলছেন। কেউ মাথা নিচু করে শুনছেন। কেউ চোখ বন্ধ করে। কেউ বুকের ওপর হাত রেখে জাতীয় সংগীতের প্রথম লাইন গেয়ে নিচ্ছেন।
তারপর দরজা খুলে যায়। বাইরে অপেক্ষা কোটি মানুষের। ৯০ মিনিট পর স্বপ্নের ভাগ্য লেখা হবে। গ্যালারিতে বাবা ছেলেকে কাঁধে বসিয়েছেন। শিশু কিছুই বোঝে না। শুধু জানে জিততে হবে। হাজার মাইল দূরে মা টেলিভিশনের সামনে বসে আছেন। মাঠে তার ছেলে দেশের জার্সি পরে খেলছে। প্রতিটি ট্যাকলে তার বুক কেঁপে ওঠে। কোনো বৃদ্ধ হয়তো জীবনের শেষ বিশ্বকাপ দেখছেন। কোনো প্রবাসী ছোট্ট পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে। কোনো হাসপাতালে রোগীর পাশে মোবাইল ফোনে চলছে ফাইনাল।
বিশ্বকাপ শুধু মাঠে হয় না। ঘরে ঘরে খেলা হয়। শেষ রাতে গোলের মূল্য অন্য রকম। একটি মুহূর্ত একটি দেশের ইতিহাস বদলে দেয়। আবার একজন ফুটবলারের সারা জীবনের বোঝা হয়ে থাকে। শেষ বাঁশি বাজতে আর কয়েক মিনিট বাকি। সময় ধীরে চলে। গ্যালারিতে কেউ প্রার্থনা করছেন। কেউ চোখ বন্ধ করেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ কয়েক মিনিট তখন শুরু হয়। এরপর রেফারির বাঁশি। একটি দল দৌড়ে যায়। আরেকটি দল স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এই দৃশ্য পৃথিবী প্রতি চার বছর পরপর দেখে।
যারা জেতে, তারা বিশ্বাস করতে পারে না সত্যিই জিতেছে। কেউ হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। কেউ আকাশের দিকে তাকায়। কেউ কাঁদতে কাঁদতে সতীর্থকে জড়িয়ে ধরে। কেউ দুই হাতে মুখ ঢেকে রাখে। আনন্দের ভাষা থাকে না। যারা হারে, তাদের কান্নাও নীরব।
কেউ মেডেল নিতে যেতে চান না। কেউ ট্রফির দিকে তাকাতেও পারেন না। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে কাপ তাদের স্বপ্ন ছিল, সেটি তখন সবচেয়ে দূরে। ফুটবল নিষ্ঠুর। দুই ঘণ্টার ব্যবধানে কেউ নায়ক হয়। কেউ নিঃস্ব।
