একটি ডেটাভিত্তিক বিশ্লেষণ
বিশ্বকাপ জিতবে কে?
শেষ পর্যন্ত মাঠের খেলাই নির্ধারণ করবে কে হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন
শরীফুল ইসলাম, জাককানইবি
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচ যেন একেকটি নতুন গল্প। যেখানে পরিসংখ্যান, অতীত রেকর্ড কিংবা ফেভারিটের তকমা-মুহূর্তে সব অর্থহীন হয়ে যায়। একটি ঘটনাই পালটে দিতে পারে পুরো টুর্নামেন্টের গতিপথ। তবুও আধুনিক পরিসংখ্যান, ডেটা সায়েন্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সম্ভাব্য ফল বিশ্লেষণের চেষ্টা দিন দিন বাড়ছে। সেই ধারাবাহিকতায় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী অনুপ তালুকদারের তৈরি ডেটাভিত্তিক বিশ্বকাপ পূর্বাভাস আলোচনায় এসেছে।
গত ১১ জুন তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ প্রেডিকশন’ শিরোনামে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। সেখানে সম্ভাব্য সেরা চার দল হিসাবে যেসব দেশের নাম উঠে আসে, তারাই সেমিফাইনালে জায়গা করে নেয়। সম্ভাব্য ফাইনালিস্ট হিসাবে স্পেন ও আর্জেন্টিনার লড়াইয়ের পূর্বাভাসও দেওয়া হয়, যা পরে সত্যি হয়। বিশ্লেষণে স্পেনকে শিরোপার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসাবে দেখানো হয়। ওরা ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে।
অনুপের তৈরি প্রেডিকশন সিস্টেমে দুটি আলাদা মডেল ব্যবহার করা হয়েছে। প্রথমটি ‘রিয়েলিস্টিক মডেল’, যেখানে ইএলও (ELO) রেটিং, বেটিং মার্কেটের অডস, সাম্প্র্রতিক পারফরম্যান্স এবং পোয়াসঁ (Poisson) ভিত্তিক মন্টে কার্লো (Monte Carlo) সিমুলেশন একত্রে ব্যবহার করা হয়েছে। দ্বিতীয়টি মেশিন লার্নিংভিত্তিক র্যান্ডম ফরেস্ট (Random Forest) ক্লাসিফায়ার, যা অতীতের ম্যাচের তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ফল নির্ধারণ করেছে।
এই বিশ্লেষণ তৈরিতে ৪৯ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচের ফল, ৪৭ হাজারের বেশি গোলদাতার তথ্য, ৬৭৫ পেনালটি শুটআউটের রেকর্ড, বিভিন্ন দলের ইএলও রেটিং, বেটিং অডস, সাম্প্রতিক ফর্ম, আক্রমণ ও রক্ষণভাগের কার্যকারিতা এবং পেনালটি পারফরম্যান্সের তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর পুরো বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট ১০ হাজারবার কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে চালিয়ে প্রতিটি দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা, ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনা, নকআউট পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং ‘কনফিডেন্স ইন্টারভ্যাল’ নির্ণয় করা হয়।
রিয়েলিস্টিক মডেলের ফলাফলে স্পেনের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা ছিল ২২ দশমিক ৮৬ শতাংশ, যা সর্বোচ্চ। এরপর আর্জেন্টিনা (১৪.৬১ শতাংশ), ফ্রান্স (১৩.০৬ শতাংশ), ইংল্যান্ড (৭.৯৭ শতাংশ), পর্তুগাল (৭.৪৯ শতাংশ), ব্রাজিল (৬.৯৩ শতাংশ) এবং জার্মানি (৪.৭২ শতাংশ)। এই তালিকার শীর্ষ চার দলই শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে ওঠে এবং স্পেন ও আর্জেন্টিনা ফাইনালে জায়গা করে নেয়।
বর্তমানে অনুপ তালুকদার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি অনুষদের অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড অ্যাপ্লাইড স্ট্যাটিস্টিক্স বিভাগে মাস্টার্স করছেন। এই গবেষণার পেছনের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘পরিসংখ্যানের প্রতি আগ্রহ এবং ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা থেকেই এমন একটি মডেল তৈরির চিন্তা আসে। প্রায় দেড় মাস ধরে ৪৯ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ৪৭ হাজারের বেশি গোলদাতার তথ্য এবং শয়ে শয়ে পেনালটি শুটআউটের রেকর্ড সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রেটিং, বেটিং অডস এবং পোয়াসঁ ডিস্ট্রিবিউশনকে কোডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয় করে ১০ হাজারবার পুরো টুর্নামেন্ট সিমুলেট করা ছিল সবচেয়ে কঠিন ও সময়সাপেক্ষ কাজ।’ তিনি বলেন, ‘ফুটবল এমন একটি খেলা যেখানে একটি ইনজুরি, লাল কার্ড, পেনালটি মিস বা কৌশলগত পরিবর্তন মুহূর্তে ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারে। তাই এই বিশ্লেষণকে
নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি সম্ভাব্যতার ভিত্তিতে তৈরি একটি বৈজ্ঞানিক মডেল।’ তবে তার বিশ্বাস, ‘টুর্নামেন্টের সামগ্রিক প্রবণতা এবং সম্ভাব্য ফেভারিট দলগুলো চিহ্নিত করতে এই মডেল কার্যকর। শেষ পর্যন্ত মাঠের খেলাই নির্ধারণ করবে কে হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।’
পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘অনুপ আমাদের বিভাগের একজন মেধাবী সাবেক শিক্ষার্থী। বিশ্বকাপের মতো বড় টুর্নামেন্ট নিয়ে ডেটা ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এমন বিশ্লেষণ করা সত্যিই প্রশংসনীয়। একটি অনিশ্চয়তাপূর্ণ টুর্নামেন্টে হাজারো তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ফল উপস্থাপন করা সহজ বিষয় নয়। এটি দেখিয়েছে, সঠিকভাবে পরিসংখ্যান, ডেটা সায়েন্স ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করলে বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যারও কার্যকর বিশ্লেষণ করা সম্ভব।’
