Logo
Logo
×
   

ইসলাম ও জীবন

হালাল খাদ্য

বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

Icon

ওসমান গনি

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন দিগন্ত

হালাল শব্দটি ইসলামি শরিয়তে এমন খাদ্য ও পণ্যের জন্য ব্যবহৃত হয়, যা মহান আল্লাহতায়ালা বৈধ করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন ‘হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র আছে, তা থেকে আহার কর’। এ নির্দেশনা শুধু খাদ্যাভ্যাসের নয়; বরং এটি মানুষের জীবনব্যবস্থা, নৈতিকতা ও পবিত্রতার এক সার্বিক দিকনির্দেশনা।

একসময় হালাল ধারণাটি শুধ মুসলিম সমাজের ধর্মীয় অনুশাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এটি নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, স্বচ্ছতা এবং গুণগত মানের এক আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। হালাল খাদ্য বলতে এমন সব খাদ্যকে বোঝায়, যা শরিয়তসম্মত, হারাম উপাদানমুক্ত এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

বর্তমানে হালাল খাদ্যের চাহিদা মুসলিম সমাজের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত হয়েছে। অমুসলিম ভোক্তারাও হালাল খাদ্যকে ‘নিরাপদ ও নৈতিক খাদ্য’ হিসাবে গ্রহণ করছে। বিশেষ করে অর্গানিক, এথিক্যাল ও ক্রুয়েলটি-ফ্রি খাদ্যের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ায় হালাল খাদ্যের গ্রহণযোগ্যতা বহুগুণে বেড়েছে।

বৈশ্বিক বাজারে হালাল খাদ্য এখন এক বিশাল অর্থনৈতিক খাতে রূপ নিয়েছে। বর্তমানে এর বাজারমূল্য ৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি এবং প্রতিবছর প্রায় ১২.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে এ বাজার ১০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করবে। গবেষণাভেদে এ বাজারের পরিধি ভিন্ন হতে পারে-কেউ শুধু মাংস ও পোলট্রি অন্তর্ভুক্ত করে, আবার কেউ দুধজাত পণ্য, বেকারি, প্রসেসড ফুড, স্ন্যাকস, ভেজিটেবল অয়েলসহ বিস্তৃত খাদ্যশ্রেণিকে এতে অন্তর্ভুক্ত করে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো-সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান ও বাহরাইন-হালাল খাদ্যের অন্যতম বৃহৎ ও স্থিতিশীল বাজার। উন্নত জীবনযাত্রার কারণে এসব দেশের মানুষ মানসম্মত ও নিরাপদ খাদ্যের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ব্রুনাই হালাল শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠী এ বাজারকে আরও বিস্তৃত করেছে।

পাশাপাশি ইউরোপ ও আমেরিকায়ও হালাল খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে সুপারশপ ও খাদ্যশিল্পে হালাল পণ্যের আলাদা সেকশন চালু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায়ও হালাল খাদ্য এখন শুধু মুসলিমদের জন্য নয়; বরং স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের একটি পছন্দে পরিণত হয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মতো দেশেও মুসলিম পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কারণে হালাল খাদ্যের প্রসার ঘটছে।

তবে বিস্ময়কর হলেও সত্য-বৈশ্বিক হালাল খাদ্য বাজারে অমুসলিম দেশগুলোই নেতৃত্ব দিচ্ছে। ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও থাইল্যান্ড হালাল খাদ্য রপ্তানিতে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ব্রাজিল বিশ্বের বৃহত্তম হালাল মাংস রপ্তানিকারক দেশ। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড উন্নত পশুপালন ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। এসব দেশ হালাল সার্টিফিকেশনকে শুধু ধর্মীয় প্রয়োজন নয়, বরং একটি বাণিজ্যিক মানদণ্ড হিসাবে গ্রহণ করেছে।

অন্যদিকে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এ খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। যদিও ২০০৭ সাল থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন হালাল সার্টিফিকেশন প্রদান করছে এবং শতাধিক প্রতিষ্ঠান এ সনদ গ্রহণ করেছে, তবুও সমন্বয়ের অভাব ও পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে এ খাত পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে বিএসটিআই হালাল সার্টিফিকেশন প্রদান শুরু করায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ যদি একটি কেন্দ্রীয় হালাল সার্টিফিকেশন বোর্ড গঠন করতে পারে, হালাল ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠা করে এবং দক্ষ জনবল তৈরি করে-তবে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করা সম্ভব।

সবশেষে বলা যায়, হালাল খাদ্য শুধু একটি ধর্মীয় বিধান নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা পবিত্রতা, ন্যায় ও মানবকল্যাণের শিক্ষা দেয়। আজকের বিশ্বে এটি আস্থা, নিরাপত্তা ও গুণগত মানের প্রতীক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। হালাল ইন্ডাস্ট্রির প্রসার শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নই নয়; বরং একটি নৈতিক ও কল্যাণমুখী বিশ্ব গঠনের সম্ভাবনাও বহন করে।

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম

We use cookies to improve your browsing experience. By using the site, you agree to our Privacy Policy .